Crafting Ideas Into Impactful Content

পাহাড় ও নদীর বাঁকে, এক রাতের জন্যে

অনেককাল আগের কথা। পাহাড়ি এক নদীর পাড়ের জনপদে থাকতো এক পাহাড়ি জনগোষ্ঠী। সেখানকার এক পরিবারে ছিল দুই ভাই। একজনের নাম সুখ আর অপরজন দুখ। খরস্রোতা পাহাড়ি নদী প্রতিবছর ১-২ জন মানুষ টেনে নিয়ে যায়, এমনই কুসংস্কারে আচ্ছন্ন ছিল নদী তীরবর্তী সেই পাহাড়ি জনপদ। তবুও এই দুই ভাইয়ের খরস্রোতা নদীর পাশে এসে না খেলতে পারলে সারাদিনের আনন্দটাই হয়ে যেতো মাটি। 

দুই দিকে বিশাল দুই পাহাড়, মাঝে বয়ে চলছে শান্ত নদী, মাঝে মাঝে মেঘ নেমে আসে পাহাড়ের কোলে, বিশাল বড় বড় গাছ আড়াল করে সূর্যকে, কুলকুল শব্দে পানি ছুটে চলে এক অজানা গন্তব্যে। এমন দৃশ্য দেখেই দুই ভাইয়ের দিন কেটে যেতো। কখনো নদীর পাড়ে নেমে হাত-মুখ বা গোসলও সেড়ে নিতো, যদিও জনপদের মুরুব্বিদের তরফ থেকে তা একেবারেই নিষিদ্ধ ছিল।  

একদিন ঝুম বৃষ্টির শেষে অজানা এক রাগে ফুলে ফেপে ওঠে সেই পাহাড়ি নদী। বিশাল বিশাল পাথর, গাছ বা সামনে থাকা যেকোনো কিছু ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল নদী। নিষেধ সত্ত্বেও নদীর পাড়ে বিশাল এক পাথরের উপর বসতে গিয়ে সুখ পা পিছলে পড়ে যায় নদীতে। বিশাল এক ঢেউ এসে যেন গিলে নেয় সুখকে। নিজের প্রাণপ্রিয় ভাইকে বাঁচাতে নদীতে ঝাপ দেয় দুখ। 

দুই পাশে পাহাড় আর মাঝে বয়ে চলা মাতামুহুরি। Image Source © Wazedur Rahman Wazed

প্রবল স্রোতের কবলে পড়ে নদীর দুইপাশে চলে যায় দুখ আর সুখ। চিরতরের জন্য হারিয়ে যায় দুই ভাই। আর এভাবেই নদীর এক পাশের পাহাড়টির নাম হয় দুখ পাহাড় আর অন্য পাশেরটি সুখপাহাড়। আর যে নদীকে ঘিরে এই গল্প তার নাম মাতামুহুরি। জনশ্রুতি আছে, একক কোনো ঝরনা হতে সৃষ্ট নয় এই নদী। বরং মাতৃস্তন সদৃশ বিভিন্ন পর্বতের গা বেয়ে চুইয়ে চুইয়ে আসা পানি থেকে সৃষ্ট বলে এর নাম মাতামুহুরি। 

এছাড়াও, স্থানীয় ভাষায় দুইখ্যের পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে যাওয়া ঝরনা দেখে স্থানীয়রা বিশ্বাস করেন যে হয়তো কোনো এক অজানা কষ্টে পাহাড়টি কান্না করছে। তাই পাহাড়ি কান্না থেকে দুইখ্যের কান্না নামটি এসেছে। আবার সুইখ্যের পাহাড়ের চারপাশের মেঘের সমুদ্র আর মন জুড়ানো অসম্ভব প্রাকৃতিক দৃশ্য মনে সুখের অনুভূতি দেয় বলে নামটি এসেছে বলেও অনেকে বলে থাকেন। 

কিন্তু সেসব তো ইতিহাস। যা জেনেছি দুখ পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত ওয়াইল্ডউড রিসোর্ট নামক একটি রিসোর্টে এক রাত থাকার অভিজ্ঞতা নিতে গিয়ে। আর সেই ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে গিয়েই বান্দরবানের লামার চাম্পাতলি বাজারে লোককাহিনী উঠে এলো আমার লেখনীতে। ঢাকার যান্ত্রিক জীবন থেকে প্রশান্তিময় একটি রাতের জন্য পাহাড়ে যাওয়া ছাড়া দ্বিতীয় কোনো ভালো অপশন আছে বলে জানা নেই আমার।

পাহাড়ের চূড়ায় এমনই এক ঝুমঘরে ছিলাম আমরা। Image Source © Wazedur Rahman Wazed

এখানে দিন শুরু হয় মোরগের ডাকে, দুপুর হয় মাথার উপরের প্রখর রোদে, বিকাল নামে স্নিগ্ধ বাতাস হয়ে, সন্ধ্যা নামে গোধূলিবেলার আলো গাঁয়ে মেখে আর রাত নামে হাজার বছরের প্রাচীন তারা ও নক্ষত্রের মেলা বসিয়ে। যেখানে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকে কান পাতা হয় দায়, যেখানে পিনপতন নীরবতায় অদ্ভুত এক শান্তি কাজ করে, যেখানে জীবনের সকল ব্যস্ততা হারিয়ে যায় এক নিমেষে আর জীবনের মানে খুঁজে পাওয়া যায় আকাশপানে চেয়ে। 

তাই দ্বিতীয় কোনো চিন্তা না করেই অফিসের কয়েকজন সহকর্মীকে রওয়ানা হই বান্দরবানের দিকে। অনেক যাচাই-বাছাই শেষে আমাদের গন্তব্য নির্ধারণ হয় ওয়াইল্ডউড রিসোর্টে। যেহেতু মাতামুহুরি নদীর কোল ঘেষে থাকা পাহাড়ের চূড়ায় এর অবস্থান, তাই এক হিসেবে পাহাড়, পাহাড়ি নদী আর সেসবের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য একসাথে গ্রহণ করার চরম এক সুযোগ এনে দেয় আমাদের জন্য। 

বৃহস্পতিবার অফিস শেষে রাতের বাসে রওয়ানা দেই সবাই কক্সবাজারের চকরিয়ার উদ্দেশ্যে। শুক্রবার রাত হওয়া সত্ত্বেও তুলনামূলক ট্র্যাফিক জ্যাম কম ছিল রাস্তায় তারপরও বাসের কিছু যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে আমাদের নির্ধারিত সময় থেকেও অতিরিক্ত দুই ঘণ্টা ব্যয় হয় চকরিয়া পৌঁছাতে। নেমে নাস্তা সেড়ে লামার চাম্পাতলি বাজার পর্যন্ত একটা চান্দের গাড়ি রিজার্ভ করে নেই আমরা সবাই মিলে। আমরা ৭ জন ছিলাম তাই চান্দের গাড়ি আমাদের জন্য বেশ সাশ্রয়ী ও উপভোগ্য একটি বাহন মনে হয়েছে। 

এরিমধ্যে শুরু হয় গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি। পাহাড়ে বৃষ্টি নামলে প্রকৃতি যেন সুযোগ পায় সবুজের মেলা বসাতে। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে আমরা উপভোগ করতে থাকি চারপাশের পাহাড়ি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। পথিমধ্যে ইয়াংছা বাজার আর্মি ক্যাম্পে প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস দিয়ে পুনরায় শুরু হয় আমাদের যাত্রা। প্রায় ৩০-৪০ মিনিট যাত্রা করে আমাদের নামিয়ে দেওয়া হয় চাম্পাতলি বৌদ্ধ বিহারের সামনে। এখান থেকে পায়ে হেঁটে যেতে হবে রিসোর্টে। 

ওয়াইল্ডউড রিসোর্টে ওঠার পাহাড়ি রাস্তা। Image Source © Wazedur Rahman Wazed

গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি আর পানির ছোঁয়ায় নতুন প্রাণ পাওয়া সবুজ প্রকৃতি হাঁটার পুরোটা সময় আমাদের মুগ্ধ করে রেখেছিল। রিসোর্ট থেকে আমাদের গ্রহণ করার জন্য পাঠানো হয়েছিল উখসিয়াং দাদাকে। উনাকে সাথে নিয়ে উপরে উঠতে থাকি আমরা। প্রথমত, যান্ত্রিক জীবনে অভ্যস্ত আমাদের অল্পটুকু রাস্তা উঠতেও আমাদের করতে হচ্ছিলো দারুণ কষ্ট। দ্বিতীয়ত গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পড়ায় মাটির রাস্তা পিচ্ছিল হয়ে ছিল, যা আমাদের দলের কয়েকজনের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। 

২০-২৫ মিনিট ট্র্যাকিং করে উঠে যাই আমরা পাহাড়ের চূড়ায় ওয়াইল্ডউড রিসোর্টে। রুমের চাবি নিয়েই চলে যাই ফ্রেশ হতে। ঘড়িতে তখন সময়  ১২টা অতিক্রম করেছে। ঝুমঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে মাতামুহুরি নদী ও পাহাড়ের মেলবন্ধনে থাকা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দুই চোখ ভরে দেখে নেই আগে। দুপুরের খাবারের জন্য অপেক্ষা না করে তখনই নৌকা ঠিক করে আমরা রওয়ানা দেই ঝর্ণা, ঝিরিপথ, আদিবাসী গ্রাম ও সাদাপাহাড় দেখার উদ্দেশ্যে। 

দুই পাশে পাহাড় আর মাঝে মাতামুহুরি-এমনই সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে আমরা পৌঁছে নাই ক্যায়াংপ্র্যাং ইকো রিসোর্টের কাছে। এই জায়গাটাতে নদীর একটা বাঁক আছে আর ঝর্নার পানি ঝিরিপথ হয়ে নদীতে এসে মিশেছে। এবার এখান থেকে হাঁটার পালা। প্রায় ৩০-৪০ মিনিট ঝিরিপথ ধরে হেঁটে আমরা পৌঁছে যাই আমাদের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে। যদিও এর থেকে কম সময়ে যাওয়া সম্ভব কিন্তু আগের রাতে পাহাড়ধসের কারণে বেশ কিছু পথ একটু কঠিন ছিল যেহেতু নতুন রাস্তা খুঁজে যেতে হচ্ছিলো। এক্ষেত্রে সাহায্য করছিলেন নৌকার মাঝি ও গাইড রাজিব ভাই। 

হাপমারা ঝর্ণা। Image Source © Wazedur Rahman Wazed

ঝিরিপথ ধরে হেঁটে এসে যেখানে পথ শেষ সেখানেই দুটি ঝর্না আছে। একটি হাতের বামে ও অন্যটি বরাবর সোজা। বাম পাশেরটিকে ক্যায়াংপ্র্যাং ঝর্না বলা হয়ে থাকে। আর আমরা যেটি দেখতে এসেছি সেটা বরাবর সামনে, নাম হাপমারা ঝর্না, যদিও অনেকেই এটিকে আবার সাপমারা ঝর্নাও বলে থাকে। আসল নামের দ্বিধাদ্বন্দ্বে না গিয়ে আমরা ক্লান্তি দূর করতে নেমে যাই ঝর্নার সামনের প্রাকৃতিক সুইমিং পুলে। কী ঠাণ্ডা পানি, কী শীতল অনুভূতি! একনিমেষেই যেন শরীরের সমস্ত ক্লান্তি দূর করে দিয়েছে। 

যেহেতু সন্ধ্যার আগে রিসোর্টে ফিরতে চেয়েছি আমরা তাই আর দেরি না করে উঠে রওয়ানা দেই নৌকার উদ্দেশ্যে। ফেরার সময় গাইডের অপেক্ষা না করেই হাঁটা দেই যেহেতু একেবারেই সহজ ছিল ট্রেইলটা। ২০ মিনিটের মধ্যেই আমরা চলে আসি নৌকার একেবারে কাছাকাছি। কিন্তু বিপত্তি বাধে এখানেই। কথা বলার তালে হঠাৎ করেই পা ঢুকে যায় চোরাবালিতে। কোনোমতে উঠে দেখি আমরা যেখানটায় দাঁড়িয়ে এর চারপাশের পুরোটাই এমন। কোথাও শক্ত বালি নেই, এরিমধ্যে ঝিরির পানির দিকে লক্ষ্য করে দেখি পানির প্রবাহ ধীরে ধীরে বাড়ছে। হয় কোথাও বৃষ্টি হয়েছে নয়তো জোয়ারের পানি নদী টানছে। 

আসার সময় কি এই পথেই এসেছি কিনা! দুইজন দাঁড়িয়ে এমন চিন্তা করতে গিয়ে ডান পায়ের রান অবধি এক নিমেষেই ঢুবে যায় চোরাবালিতে। বালির প্রচণ্ড প্রেশারে আমার পায়ের হাড়গোড় ভাঙার উপক্রম। তবুও মাথা ঠাণ্ডা রেখে কলিগের সহায়তায় উঠে আসি এবং একটু শক্ত বালিতে দাঁড়িয়ে বুঝার চেষ্টা করি যে আমাদের পথ ভুল হয়েছে কোথায়? রাস্তা ভুল করিনি এটা নিশ্চিত আছি কিন্তু কোনো এক পথ দিয়ে না গিয়ে ভিন্ন পথে চলে এসেছি। চোখের সামনেই ছিল সেই রাস্তা কিন্তু তাও দেখছিলাম না যেন। 

মিনঝিড়ি পাড়ার অলস সন্ধ্যা। Image Source © Al Shahriar Emon

যাওয়ার সময় মোবাইল ফোনে ভিডিও করেছিলাম। বের করে দেখার পর দেখি আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি সেটার পাশেই উপর দিয়ে যাওয়ার রাস্তা। আমরা ভুলে নিচে দিয়ে চলে এসেছি। সেখান দিয়েই উঠে যাই এবং আমাদের হাতের লাঠি বাঁকা করে গেঁথে আসি অন্যদের সতর্কতার জন্যে। কিন্তু প্রচণ্ড বালির চাপে আমার পায়ের অবস্থা তখন খুব খারাপ। তাও আস্তেধীরে হেঁটে চলে যাই নৌকার কাছে। এবং উঠে পড়ি পরের গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। 

নৌকায় ১০ মিনিট যাত্রা করে আমরা চলে আসি আদিবাসী গ্রাম মিনঝিড়ি পাড়ায়। এখানকার দোকানে বসে পাহাড়ি মুন্ডি আর বিন্নি চালের পাটিসাপটা পিঠা দিয়ে পেট পূজা করি আমরা। তারপর পুনরায় নৌকায় চড়ে ৫-৭ মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে যাই সাদাপাহাড়ের কাছে। যদিও এই জায়গাটা অনেকেই চেনে হোয়াইটপিক রিসোর্টের কল্যাণে। একদিকে সাদাপাহাড় আর অন্যদিকে বিস্তীর্ন সবুজের ভূমি আর এই দুইয়ের মাঝে পিনপতন নিস্তব্ধতা – আসলে সাদাপাহাড়ের এই জায়গাটার সৌন্দর্য এককথায় এমনই। 

৬টার মধ্যে আমরা ফিরে আসি রিসোর্টে। ফ্রেশ হয়ে দুপুরের খাবার খেতে যাবো কিন্তু তখন চলে যায় বিদ্যুৎ। এরমধ্যে দলের সবাই ছিল ক্লান্ত তাই যেকোনো কাজ করতেও আমাদের সময় লাগছিল একটু বেশি। ১ ঘণ্টা সময় ব্যয় করে সন্ধ্যা  ৭টায় দুপুরের খাবার খেতে যাই আমরা।

সাদাপাহাড়ের ক্লান্ত গৌধুলি। Image Source © Wazedur Rahman Wazed

খাবারের পদে ছিল সাদা ভাত, আলু ভর্তা, সেদ্ধ ডিম, সবজি, মুরগির মাংসের তরকারি ও ডাল। স্বাদের ব্যাপারে ভালোমন্দের বিচারে যাবো না কারণ প্রচণ্ড ক্ষুধায় তখন সবকিছুই অমৃত লাগছিল আমাদের। খেতে বসামাত্রই শুরু হয় প্রচণ্ড বৃষ্টি। বাতাসের তীব্রতায় আমরা সবাই ভিজে যাচ্ছিলাম কিন্তু ক্ষুধায় একবিন্দুও নড়তে ইচ্ছে করছিল না কারোরই। তাই ঐ অবস্থায়ই খাওয়াদাওয়া শেষ করি আমরা। বৃষ্টি তখনও পড়ছে তাই দুধ চায়ের কথা বলে আমরা চলে যাই ওয়াচটাওয়ারের মতো থাকা মাচাংয়ের সবচেয়ে উঁচু পাটাতনে। 

চারদিকে নিঝুম অন্ধকার, প্রবল বাতাস বইছে, সামান্য নড়াচড়াতেও পাঠাতনের কাঠ ক্যাচক্যাচ শব্দ করছে, দূরে লামা বাজারের ঝলমলে আলো যান্ত্রিক জীবনের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে, বৃষ্টির ছাটে শীতল আর প্রশান্তময় এক অনুভূতি অদ্ভুত এক আবেশে শরীরকে জড়িয়ে রেখেছে, ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে সারাদিনের ক্লান্তি দূর হচ্ছে আর পাহাড়ের চূড়ায় আমরা কয়েকজন কখনো অন্যের গল্প শুনছি, নিজেরা হাসছি কিংবা চুপ করে নিজেকে খোঁজার ও বুঝার চেষ্টা করছি। 

শেষ কবে এমন সন্ধ্যা কাটিয়েছি মনে পড়ছিল না কারোরই। বৃষ্টির ভাব কিছুটা কমে এলে নেমে চলে যাই আমাদের ঝুম ঘরে। বিশাল ঘরকে জনশূন্য রেখে আমরা বৃষ্টি শেষে পরিষ্কার আকাশের নীচে বসি বারান্দায়। রাতভর চলে আমাদের অনন্ত আড্ডা আর খোশগল্প। মাঝে চলে রাতের খাবারের বিরতি। খাবারের পদ ছিল দুটো পরোটা, একটা বড় সাইজের মুরগির বারবিকিউ আর শস। কিচ্ছুক্ষণ পর পর অন্ধকারে নদীর বুকে মেঘের নেমে আসা লক্ষ্য করছিলাম আমরা। পুনরায় গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি শুরু হওয়ার আগেই আমরা রুমে গিয়ে ঘুম দেই সবাই। 

সকালবেলার নাস্তায় ছিল ভুনা খিচুড়ি আর ঝিমের ঝোল। Image Source © Al Shahriar Emon

সকালে উঠে বারান্দায় এসে বৃষ্টি শেষে নির্মল চারপাশ দেখে মন জুড়িয়ে যায় সবার। সকালের নাস্তার জন্য রিসোর্ট থেকে ডাকা হয় আমাদের। আইটেম হিসেবে ছিল ভুনা খিচুড়ি ও ডিমের ঝোল আর সাথে দুধ চা। এর আগেরদিন রিসোর্টে উঠলেও চারপাশটা তেমন ঘুরে দেখা হয়নি। তাই নাস্তা শেষে রিসোর্ট ভালোভাবে ঘুরে দেখে ও ছবি তুলে ঢাকায় ফেরার সিদ্ধান্ত নেই আমরা। পাহাড়ের চূড়ায় হওয়া সত্ত্বেও এই রিসোর্টে রয়েছে একটি সুইমিং পুল। এছাড়া, কাপল কটেজ, ট্রি হাউজ ও পড হাউজও আছে এই রিসোর্টে। 

এই রিসোর্টের সবচেয়ে সুন্দর জায়গা হচ্ছে ভিউপয়েন্ট মাচাং। যেখানে দাঁড়িয়ে নিচে তাকালে চোখে পড়বে শান্তশিষ্টভাবে বয়ে চলা মাতামুহুরি নদী। পাশেই পাহাড়ের সারি। নদীর বাঁক থেকে উঁকি দিচ্ছে আরেক পাহাড়। মেঘ আর রোদের পালাক্রমে লুকোচুরি তৈরি করেছে আলো আর ছায়ার অদ্ভুত এক প্রাকৃতিক খেলা। মাঝে মধ্যে নদীর পানি ভেঙে ছুটে যাচ্ছে ইঞ্জিনচালিত নৌকা। মাথার উপর চড়া রোদ কিন্তু মিষ্টি বাতাসের রেশ শরীরে এক অদ্ভত শান্তি দিচ্ছে। সফেদ সাদা শুভ্র মেঘ বিক্ষিপ্ত তুলোর মতো ভেসে বেড়াচ্ছে চকচকে নীল আকাশে।    

প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখায় ছেদ পড়ে রিসোর্টের লোকজনের ফোনে। নির্ধারিত সময় পেরিয়েও দুই ঘণ্টা অতিবাহিত হয়েছে, এবার আমাদের রিসোর্টের রুম ছেড়ে দেওয়ার পালা। তবে শেষ করার আগে রিসোর্ট সম্পর্কে কিছু তথ্য দেই। আমরা ছিলাম প্রিমিয়াম ঝুমঘরে, যেটাতে এটাচড বাথরুম রয়েছে।   

ওয়াইল্ডউড রিসোর্টের ভিউপয়েন্ট মাচাং। Image Source © Al Shahriar Emon

৭ জন থাকা যায় প্রিমিয়াম ঝুমঘরে। এই রুমের এক রাতের ভাড়া ৩৫০০/- টাকা। আর তিন বেলার খাবারের জন্য জনপ্রতি ৮০০/- টাকা করে দিতে হয়েছিল। বিদ্যুৎ যায় ঘনঘন তাই পাওয়ারব্যাংক সাথে রাখা ভালো। নিরাপত্তা ভালো। তবে গাছগাছালি অত্যন্ত ঘন হওয়ায় বাইরে প্রচণ্ড মশার উৎপাত। আর সার্ভিস বলতে উনাদের ডাকলেই পাওয়া যায়।

ব্যাকপ্যাক গুছিয়ে সবাই বের হয়ে যাই। পাতার ফাঁক গলে নেমে আসা রোদের তীব্রতায় পাহাড় থেকে নামতে শুরু করি আমরা। যেন একপশলা শান্তি পেছনে ফেলে কংক্রিটের জঙ্গলে ফিরে যাচ্ছি যন্ত্রমানবের দায়িত্ব পালন করতে। এভাবেই পাহাড় ও নদীর বাঁকে, এক রাতের জন্যে আমার শান্তি ফুরোয় এক নিমিষে।  

Feature Image: Wazedur Rahman Wazed
Share this
Facebook
Twitter
LinkedIn

Related Posts

Blogs

পাহাড় ও নদীর বাঁকে, এক রাতের জন্যে

এখানে দিন শুরু হয় মোরগের ডাকে, দুপুর হয় মাথার উপরের প্রখর রোদে, বিকাল নামে স্নিগ্ধ বাতাস হয়ে, সন্ধ্যা নামে গোধূলিবেলার আলো গাঁয়ে মেখে আর রাত নামে হাজার বছরের প্রাচীন তারা ও নক্ষত্রের মেলা বসিয়ে।

Book Review

কাফকা অন দ্য শোর: অস্তিত্ব, স্মৃতি ও একাকীত্বের গল্প

কাফকা অন দ্য শোর বইটিকে মুরাকামি সেরা কাজগুলোর একটি বলা হয়ে থাকে। মূলত প্রাচীনকাল থেকেই মানুষের মধ্যে অস্তিত্বের কিংবা পরিচয়ের যে সংকট, তাই বৃহদাকারে পরাবাস্তব গল্পের মাধ্যমে উপস্থাপিত হয়েছে। এই উপন্যাসের প্রতিটি চরিত্র কাফকা তামুরা, নাকাতা, জনি ওয়াকার, ওশিমা, মিস সায়েকিসহ সবাইই নিজের পরিচয় সংকটে বিব্রত। নিজেকে খুঁজে পেতে মরিয়া হয়ে অদ্ভুত সব কাণ্ড করে বসে।