ইয়েন লিয়র হর্স্ট আসে নরওয়েজিয়ান উচ্চারনে; আবার ইংলিশে আসে জর্ন লিয়র হর্স্ট। হর্স্ট হচ্ছেন স্ক্যান্ডিনেভিয়ানের জনপ্রিয় ক্রাইম থ্রিলার লেখক। নরওয়ের ভেস্টফোর্ড প্রদেশের পুলিশ বিভাগে দীর্ঘদিন তিনি সিনিয়র ইনভেস্টিগেটর অফিসার হিসেবে কর্তব্যরত ছিলেন। ২০০৪ সালে তিনি সাহিত্যে পদার্পন করেন কি উইটনেস বইটি রচনার মাধ্যমে।
এই বইটিই হচ্ছে তার সৃষ্ট জনপ্রিয় চরিত্র উইলিয়াম উইস্টিং সিরিজের প্রথম বই। এখন অবধি উইলিয়াম উইস্টিং সিরিজের ১৪টি বই প্রকাশ পেয়েছে যার মধ্যে কয়েকটা ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে এবং বেশ প্রশংসাও কুড়িয়েছে। আর তাই নর্ডিক সাহিত্যের এত জনপ্রিয় লেখকের ক্রাইম ফিকশন নিয়ে যখন সিরিজের ঘোষণা এলো তখন হাইপ না উঠে উপায় আছে।
নরওয়েজিয়ান ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির ইতিহাসে উইস্টিং সিরিজ হচ্ছে সবচেয়ে বেশী ব্যয়বহুল আর সবচেয়ে বেশী হাইপ তোলা একটা সিরিজ। মূলত ১০ পর্বের এই সিরিজটা হর্স্টের দুইটি বইয়ের সমন্বয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। ২০১২ সালে প্রকাশ পাওয়া দ্য কেইভম্যান এবং ২০১৩ সালে প্রকাশ পাওয়া দ্য হান্টিং ডগস দুটি বইয়ের সমন্বয়ে এই সিরিজের প্রথম সিজনের দশটি এপিসোড নির্মাণ করা হয়েছে। প্রথম পাঁচটি পর্বে দ্য কেইভম্যান আর পরের পাঁচটি পর্বে দ্য হান্টিং ডগস বইটি দিয়ে চিত্রনাট্য সাজানো হয়েছে।

দ্য কেইভম্যান (১-৫ এপিসোড)
নরওয়ের লারভিক শহরের পুলিশের সিনিয়র চিফ ইনভেস্টিগেটর অফিসার হচ্ছে উইলিয়াম উইস্টিং। তদন্তে সফল হবার জন্য বিশেষ খ্যাতি আছে তার। শহরের সবাইই তাই উইস্টিংকে পছন্দ করে। তার বাড়ি থেকে মাত্র তিন ব্লক দূরেই একটি বাড়িতে মৃত এক ব্যক্তির লাশ খুঁজে পাওয়া যায়। এক লোক তার টেলিভেশনের সামনে বসে মারা গিয়েছেন তাও বিগত চারমাস আগে। প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, লোকটি অর্থাৎ ভিগো হানসেন এমন একজন লোক ছিলেন যাকে কেউ খুব ভালোভাবে চিনে না; এমনকি কেউ তাকে ভালোভাবে লক্ষ্য করেছে কিনা তাই সন্দেহ। ঘটনাটাতে বেশ আকর্ষিত হয় উইস্টিংয়ের মেয়ে সাংবাদিক লিনে। দারুণ একটা আর্টিকেলের আশায় ভিগো হানসেনের খোঁজ করতে থাকে লিনে।
ওদিকে গাছের নীচে বরফের মধ্যে আরেক লাশ খুঁজে পায় লারভিক পুলিশ বাহিনী। তদন্তে বেরিয়ে আসে লাশটি আসলে কোনো এক আমেরিকানের। খবর পেয়ে ছুটে আসে দুই এফবিআই এজেন্ট। যার মধ্যে ম্যাগি গ্রিফিন জানায় বিগত কয়েক বছর যাবত এক হাইওয়ে সিলার কিলারকে খুঁজে ফিরছে তারা। তাদের সন্দেহ সেই হাইওয়ে সিলার কিলারই নরওয়েতে এসে ছদ্মবেশে আস্তানা গেড়েছে। লারভিক পুলিশ বাহিনী তা বিশ্বাস করতে চায় না। কিন্তু ধীরে ধীরে যেন প্রমাণ মিলতে একের পর এক। এরিমধ্যে লিনের করা আর্টিকেল ফলাও করে প্রচার হলে ব্যাপারটা আরো বেশী যে উসকে যায় সিরিয়াল কিলারের জন্যে। একদিন লিনেকেই তুলে নিয়ে যায় সিরিয়াল কিলার।

দ্য হান্টিং ডগ (৬-১০ এপিসোড)
সতের বছর আগের কথা, নরওয়ের সবচেয়ে বহুল আলোচিত এক ক্রিমিন্যাল ইনভেস্টিগেশনের সিনিয়র চীফ হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন উইলিয়াম উইস্টিং। সিসিলিয়া লিন্ডে নামে এক তরুণী নিখোঁজ হবার পর খুন হলে নরওয়ে জুড়ে তীব্র নিন্দা উঠে পুলিশের বিরুদ্ধে। দ্রুত কেস সমাধানের আশায় উইলিয়াম প্রমাণাদি সঠিকভাবে পর্যবেক্ষণ না করেই এক লোককে দোষী সাব্যস্ত করে। এমনকি পরে ফের তদন্ত করে জানা যায়, অভিযুক্ত করার জন্যে প্রমাণাদি সাজানো হয়েছিল। যার ফলে উইলিয়াম উইস্টিংকে সাসপেন্ড করা হয় এবং মিডিয়া যেন এই ব্যাপারটাকে জনগণের কাছে আরো উসকে দিতে শুরু করে।
সারাজীবন অপরাধী খুঁজে আসা উইস্টিংই আজ আইনের চোখে অপরাধী। তাকে তাড়া করে ফেরে তার সারাজীবনের সমস্ত কেসের সাফল্য। এরিমধ্যে শহরে আবারো একটা তরুণী নিখোঁজ হয়। নিখোঁজ হওয়া তরুণী যে পুলিশের সাহায্য চেয়েছিল অথচ পুলিশ তেমন কিছুই করতে পারেনি – এই ব্যাপারটা সামনে এলে ঘটনা বেগতিক হয়ে যায়। গল্প ক্রমশ জট পাকাতে শুরু করে।

এই ছিল মোটামুটি দশ পর্বের দুই ভাগের গল্প। হ্যাঁ অ্যান্থলজি মনে হলেও আসলে দুটি গল্পে যোগসূত্র আছে। নরওয়েতে মানবিধাকার ব্যাপারটা খুবই স্পর্শকাতর। এমনকি নরওয়েতে কোনো অপরাধীকেই ফাঁসি দেয়া হয় না। আপনি প্রশাসনের লোক বলেই যে, যেখানে সেখানে যে কোনো নরওয়েজিয়ান জিজ্ঞাসাবাদ করবেন – এমনটা হবে না। আপনাকে পরিপূর্ণ কারণ জানাতে হবে নয়তো উলটো আপনার নামে কেস হয়ে যেতে পারে। এমনকি জিজ্ঞাসাবাদের সময় আপনার সঙ্গে অস্ত্র থাকাটাও নরওয়েজিয়ানদের কাছে অপমানসূচক। এই সিরিজ দেখতে বসলে এই ব্যাপারগুলো দেখে যাতে বিরক্ত না হন তাই আগেভাগেই বলে নিলাম।
শুরুর দিকটা খুবই ইন্টারেস্টিং। সিরিয়াল কিলিংয়ের শুরুটা যেমন হয় আর কি! আচমকাই একটা লাশ খুঁজে পাওয়া আর সেটার তদন্ত করতে গিয়ে ভয়ংকর এক খুনীর পেছনে ছোঁটা। শুরু থেকেই ব্যাপারটা ইন্টারেস্টিং হয়ে উঠছিল। খুব ধীরেসুস্থে বুঝেশুনে আগানো যাকে বলে। একইসঙ্গে চলছিল ডিটেকটিভের জার্নালিস্ট মেয়ের তদন্তের গতিও। নির্মান খুবই জোশ। বিশেষ করে সিনেমাটোগ্রাফি আর ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরিং। দুইটাই দারুণ লেগেছে। আর নরওয়ের সৌন্দর্য সে তো চোখে লেগে থাকার মতো।
কিন্তু এসব দিয়ে তো আর একটা সিরিজ পরিপূর্ণতা পায় না। নির্মানের পাশাপাশি চিত্রনাট্য আর অভিনয় দক্ষতারও দরকার আছে। মূল গল্পটা আমার ভালো লেগেছে। একজন সিরিয়াল কিলার ইউএস থেকে পালিয়ে এসেছে নরওয়েতে। তার কিলিংয়ের নেশা কিন্তু যায়নি তখনো। আর তাই সে এক নরওয়েজিয়ানের পরিচয়ে নতুনভাবে সিরিয়াল কিলিং শুরু করে। পরের ভাগের গল্পটাও মোটামুটি ভালোই। ১৭ বছর আগের এক তদন্তে উইস্টিং প্রমাণ নকল করার দায়ে ফেঁসে যায়। উইস্টিং নিজেও জানে এটা অন্য কারো কাজের মাশুল যেটা তাকে গুনতে হচ্ছে। ব্যস শুরু হয় উইস্টিংয়ের নিজেকে নির্দোষ করার যাত্রা।
সমস্যাটা হচ্ছে এক্সিকিউশন বা চিত্রনাট্যে। চিত্রনাট্যে প্লটহোল আছে ভালোই। তবে প্লটহোলের চাইতে বেশি বিরক্তিকর ছিল অতিরিক্ত টুইস্টের বোঝা। অতিরিক্ত টুইস্ট দেয়াতে ভেস্তে গেছে সব নির্মানশৈলী আর অভিনয় দক্ষতা। আবার একইসঙ্গে আছে অবান্তর কিছু ব্যাপার-স্যাপার।
কাহিনীর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত নয় এমন অনেক ঘটনাকেও প্রাধান্য দেয়া হয়েছে সিরিজে। সাবপ্লট হলেও মেনে নেয়া যেত কিন্তু না সেগুলো সাবপ্লটের মধ্যেও পড়ে না। আর এসব কারণেই সিরিজ শেষ হবার আগেই অনেক প্রশ্ন উঁকি দেয় মস্তিষ্কে। অনেক কিছুই ধোঁয়াশা রয়ে যায় সিরিজ শেষে। শেষের দিকে যেন একদম গোঁজামিল দিয়ে সিরিজটা মেলানোর একটা প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়।
এতকিছু সত্ত্বেও সিরিজের প্রথম ভাগের গল্পটা দারুণ। সিরিয়াল কিলিংয়ের পর্বটুকু অন্তত শেষ অবধি ঠিকঠাকই ছিল। এতটুকু পার্ট অন্তত বেশ উপভোগ্যই মনে হয়েছে। অন্তত দেখার মতো বা বলা যায় এভারেজ আর কি। খুনীকে আড়াল করে রাখতে এবং দর্শককে আটকে রাখতে সক্ষম হয়েছে পরিচালক। যদিও একদম শেষের দৃশ্যাবলীগুলো অনেকের বিরক্তির উদ্রেক ঘটাবে। তবুও অন্তত এতটুকু পার্ট ঠিকই আছে বলা চলে। অন্তত নর্ডিক-নয়্যার সিরিজ হিসেবে উপভোগ্যই বলবো।

কিন্তু পরের পর্বে খুব বেশী বিরক্ত হয়েছি। শুরুটা ভালো ছিল বেশ ইন্টারেস্টিং। যদিও শুরুতেই অনেকটাই আন্দাজ করা যায়। দুইটা পর্ব পার হবার পরই হতাশ হয়ে কাহিনীকে শুধু শুধু টেনে বড় করার জন্য। একের পর এক টুইস্টের আশায় এত এত প্লটহোল আর অবান্তর ব্যাপার-স্যাপার যে লিটারেলি বিরক্ত হয়ে গেছি শেষের দিকে। এমনকি শেষে সন্দেহভাজনের কার্যকলাপ দেখে আপনি অবাক হবেন এই ভেবে যে – হাসা উচিত না কাঁদা? অথচ গল্পটা খুবই সুন্দরভাবে সাজানো আর গোছানোই ছিল শুরুতে।
উইস্টিং তার অভিনয়ে বেশ ভালোই ছিলেন কিন্তু খাপছাড়া মনে হয়েছে লিনে চরিত্রটার অভিনয়। অভিনয় হয়নি তা নয় কিন্তু অভিনয়ের মধ্যে যে একটা ব্যাপার থাকে সেইটাই নাই। যেন জোর করে অভিনয় করা টাইপ। এফবিআই এজেন্টদের মধ্যে গ্রীফিন চরিত্রটা বেশ দক্ষ আর পরিপূর্ণ ছিল। তবে আরেকজন এফবিআই এজেন্ট জন চরিত্রটা দেখে মনে হয়েছে সাদা আর কালোর সমান অধিকার এটা বুঝাতেই নেয়া হয়েছে। আর কোনো কারণ নেই। সিরিজের আরেক পুলিশ অফিসার নিশের চরিত্রে বেশ রহস্য তৈরী করলেও তাও ধোঁয়াশাই রয়ে গেছে।
দুই ভাগেরই শুরুর তিনটা এপিসোড দারুণ; খুব ভালো কিছুর আশা দেয়। কিন্তু শেষে গিয়ে যেন চুপসে যাওয়া বেলুনের রূপ নেয়। বিবিসির এই সিরিজটাকে নিয়ে যতটা হাইপ উঠেছিল আসলে ততটা হাইপ ধরে রাখতে পারেনি সিরিজে। যত গর্জে তত বর্ষে না টাইপ। তবে অনেকের আবার এই সিরিজ ভালো লাগতে পারে। তাহলে নর্ডিক এই নয়্যার সিরিজ কি দেখার অযোগ্য? না মোটেও তা নয়! বরং বলবো উইস্টিং অনেক ভালো নির্মাণশৈলীর উদাহরণ বিশেষ। আইএমডিবিতে রেটিং ৭.৪/১০ এবং গুগলের মতে ৯২ ভাগ লোক এই সিরিজটা পছন্দ করেছে। এখন বাকিটা নির্ভর করছে একান্তই আপনার উপরে – দেখবেন কি দেখবেন না?
