পুরাণ মতে, আমাদের এই দুনিয়াটা তিনটা ভাগে বিভক্ত। স্বর্গলোক – যেখানে দেবতারা বাস করেন। মর্ত্যলোক – যেখানে মানুষজাতির বসবাস। আর সবশেষে পাতাল লোক – যেখানে নিকৃষ্ট পোকামাকড়ের বসবাস। বিভিন্ন পুরাণ মতে এর আলাদা আলাদা নামকরন আছে। যেমন – হিন্দু পুরাণে পাতাল লোক বা যমলোক; ইসলাম ধর্মে দোজখ বা জাহান্নাম; নর্স মিথোলজিতে নিফলহেল আর গ্রীক পুরাণে এলিসিউম। যে নামেই ডাকা হোক না কেন – আসলে সকল পাপীদেরই শেষ ঠিকানা এই পাতাল লোক। সেইসব পাপীদেরকেই অসুর, রাক্ষস, রাবন, শয়তান ইত্যাদি নামে অবহিত করা হয়।
সদ্য মুক্তি পাওয়া আমাজন প্রাইমের হাইপ তোলা সিরিজ পাতাল লোকেও এই পুরাণের সঙ্গে বাস্তবিক জগতের এক নিরবচ্ছিন্ন যোগসূত্র দেখানো হয়েছে। স্বর্গলোকে সমাজের সুবিধাভোগী মানুষদের বসবাস, যারা দেবতাদের মতো রাজকীয় আর বিলাসের জীবনযাপন করে। উল্টোদিকে পাতাল লোক নামক জায়গা দেখানো হয়েছে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষজনদের ঠিকানা হিসেবে; যেখানে তারা নিজেদের সুবিধার জন্যেও হোক কিংবা স্বর্গলোকে বসা দেবতাদের কলকাঠি নাড়ানোর কারণেই হোক – বিভিন্ন ধরণের জঘন্য কাজেকর্মে লিপ্ত হয়ে শেষে আশ্রয় চায় সেই দেবতার কাছেই। আর মধ্যিভাগে থাকে মর্ত্যলোক যেখানে বাস করে সাধারণ জনগোষ্ঠী। যারা স্বর্গলোক বা পাতাল লোকের রোষানলের স্বীকার হয় সর্বদা; তবুও সবকিছু বুঝে নিয়েও নিজের জীবনটাকে চালিয়ে নেয়াই যেন তাদের নিত্যদিনকার যুদ্ধ।

সঞ্জীব মেহরা। দেশের অন্যতম প্রথিতযশা এক চ্যানেলের উপস্থাপক। দুর্দান্ত পার্সোনালিটি আর উপস্থিত বুদ্ধিসম্পন্ন এই মানুষটার খ্যাতি পুরো দেশ জুড়ে। তবে এই লোকটার কারণে অনেক বড় বড় শিল্পপতি এমনকি মন্ত্রী-মিনিস্টারদেরও অপদস্থ হতে হয়েছে মিডিয়ার সামনে। কেননা, সাংবাদিকতার দিক থেকে কাউকেই ছাড় দিতে রাজি নয় সঞ্জীব। সেরকমই কোন শত্রুতার জের ধরে নাকি অন্য কোনো কারণেই হোক দিল্লী পুলিশ এক বেনামী ফোনকল পেয়ে চারজন যুবককে গ্রেফতার করে; আর তার কারণ হচ্ছে তারা সঞ্জীব মেহরাকে খুন করার পরিকল্পনা করছিল বিগত ৪/৫ দিন যাবত এই দিল্লীতে বসেই। পুলিশ যখন তাদেরকে একটা ব্রীজের উপর চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলে তখন তাদেরই একজন একটা ফোন ফেলে নীচের নদীতে। তদন্তের দায়ভার পড়ে নিকটস্থ থানার ইন্সপেক্টরের উপর।
হাতিরাম চৌধুরী। আউটার যমুনা থানার ইন্সপেক্টর। সঞ্জীব মেহরাকে হত্যার চক্রান্ত করা সেই পুলিশ কেসে তদন্ত আসে তারই কাঁধে। স্বয়ং ডিআইজি সাহেব তাকে এই কেসের দায়িত্ব দেন। হাতিরামের পুলিশ ক্যারিয়ারে এই প্রথম এত বড় একটা কেসের তদন্ত পেল সে। স্ত্রী রেনু আর ছেলে সিদ্ধার্থকে নিয়ে হাতিরামের সংসার। ছেলে মোটেও তার কথা শুনে না আর স্ত্রীও বেশ তাচ্ছিল্য করে। ছোটকাল থেকে নিজের বাবার গাফিলতির কারণে তাচ্ছিল্য আর অবজ্ঞা নিয়ে বড় হতে হয়েছে হাতিরামকে। বাকিটা জীবন ছেলের চোখে অবজ্ঞা আর তাচ্ছিল্যতা চায় না হাতিরাম। যে কোন মূল্যেই হোক এই কেস সমাধান তার চাইই চাই। নিজেকে প্রমাণ করার, নিজেকে মেলে ধরার এই তো সুযোগ। এমন সুযোগ হাতিরাম কোনোভাবেই হাতছাড়া হতে দিতে চায় না। এরকমই চিন্তাভাবনা থেকেই প্রথম সূত্রেই পেয়ে যায় এক আসামীর অতীত ইতিহাস।

বিশাল তেয়াগী। সঞ্জীব মেহরাকে খুনের পরিকল্পনায় আটক করা চারজনের মধ্যে অন্যতম। বিশাল তেয়াগী আসলে একজন দুর্ধর্ষ কিলার। হাতুড়ি দিয়ে মানুষকে হত্যা করে বিধায় তা নাম হয়ে গেছে হাতোড়া (হাতুড়ি) তেয়াগী। দিল্লী পুলিশের কাছে ধরা খাবার আগ অবধি সর্বমোট ৪৫টা খুন করেছে তেয়াগী। এতগুলো খুন একজন মানুষ দুই উপায়েই করতে পারে। হয় সে সিরিয়াল কিলার আর নয়তো কেউ তাকে শেল্টার দেয়। হাতিরামও তাই ভাবে। আর সেই মোতাবেক কাজ করতে গিয়ে কিছু গোপন সত্য বেরিয়ে আসতে চাইলে হাতিরামের চাকুরি চলে যায়।
চাকুরি হারিয়ে দিশেহারা হাতিরাম। জীবনে এই প্রথম এত বড় একটা সুযোগ এসেছিল অথচ কিছুই করতে পারলো না। এরমধ্যে একদিন তার ছেলে স্কুলে পিস্তল হাতে ধরা খায়। অন্যদিকে বিশাল তেয়াগীর জীবন বৃত্তান্ত নিয়ে টকশো করে সঞ্জীব মেহরা। ব্যাপারটাকে যেন আরো উসকে দেয় নিজের ক্যারিয়ারের স্বার্থে। সিবিআই এসে দিল্লী পুলিশের কাছ থেকে নিয়ে নেয়। আর সংবাদ সম্মেলনে জানায় পুরো ব্যাপারটা আসলে আইএসএস এর কাজ। অথচ হাতিরামের সন্দেহ হয় এখানে কোন গোপন তথ্য লুকানো হচ্ছে। চাকুরী থাকুক বা না থাকুক, জীবন থাকুক বা না থাকুক, এতসব চিন্তাকে ছাপিয়ে হাতিরাম ছোটে কেস সমাধানের লক্ষ্যে।

স্যাক্রেড গেমস আর দিল্লি ক্রাইমের জনপ্রিয়তার পর বলিউডপ্রেমীরা অপেক্ষায় ছিল দারুণ এক ওয়েব সিরিজের। বিশেষ করে ক্রাইম থ্রিলারের। হালের অসুর শক্তিশালী গল্প নিয়ে আসলেও দুর্বল নির্মাণের কারণে সেই আক্ষেপ পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। আর স্যাক্রেড গেমসের পর নেটফ্লিক্সও তেমন কিছু উপহার দিতে পারেনি এক দিল্লি ক্রাইম ছাড়া। যদিও জামতারা প্রকাশ পেয়েছে তবে খুব বেশী একটা দর্শকপ্রিয়তা অর্জন করতে পারেনি। আর এই মোক্ষম সুযোগটাই যেন নিলো আমাজন প্রাইম।
মে মাসের শুরুর দিকে তাদের নতুন ওয়েব সিরিজের ট্রেইলার দিয়েই তাক লাগিয়ে দিলো সবাইকে। সেই সুবাদেই সিরিজ প্রেমীদের কাছে পাতাল লোক দারুণ এক হাইপ তৈরি করে ফেললো রীতিমত। এরমধ্যে বলিউডের প্রথা ভাঙ্গা পরিচালক অনুরাগ কশ্যপ যিনি স্যাক্রেড গেমস পরিচালনা করেছেন, তিনি নিজেই যখন টুইট করে বলেন পাতাল লোক ইন্ডিয়ার সেরা ক্রাইম থ্রিলার সিরিজ; তখন আর দ্বিতীয় কোন কথা বলার দরকার পড়ে না।

পাতাল লোক সিরিজটির মূল লেখক হিসেবে ছিলেন সুদীপ শর্মা। সুপারস্টার, এনএইচ১০ এবং উড়তা পাঞ্জাব – মুভিগুলো তারই লেখা। পরিচালকের আসনে ছিলেন প্রসিত রয় এবং আভিনাশ অরুন। প্রসিত রয় এর আগে পারি মুভি পরিচালনা করেছিলেন। আর অরুন মাদারি এবং দৃশ্যাম এর মতো মুভির সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে ছিলেন। তাই বলার অপেক্ষা রাখে না লেখক আর পরিচালকদের এই জুটিটা কতটা ভালো কাজ উপহার দিয়েছে। আর প্রযোজনায় ছিলেন বলিউড নায়িকা আনুশকা শর্মা। বলিউডের নামীদামী সব প্রযোজকদের ভীড়ে আনুশকা শর্মা নামটা খুবই কম শোনা গেলেও দারুণ একটা ওয়েব সিরিজ উপহার দেয়ার জন্য দর্শকরা তাকে মনে রাখবে।
সিরিজের নির্মাণ খুবই ভালো। কোনো দিকেই কোনো কমতি বা খামতি রাখেনি পরিচালকদ্বয়। সিনেমাটোগ্রাফি, ক্যামেরা ট্রিটমেন্ট, অ্যাকশন দৃশ্য, ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরিং – সবকিছুই একদম নিখুঁত ভাবে করা হয়েছে যেন। কোনো ধরণের খুঁতই ধরতে পারা যায়নি, অন্তত আমার পক্ষে। উপরন্তু কিছু ব্যাপার ভালো লেগেছে। কোনো কালেই বলিউডের কোনো মুভি বা টিভি সিরিজে সংখ্যালঘুর ব্যাপারটাকে তুলে ধরা হয় না। বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই এড়িয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু লেখক সাম্প্রদায়িক এই ব্যাপারটাকে এতভাবে সূক্ষ্মভাবে তুলে ধরেছেন যে বাহবা পাওয়ার যোগ্য।

আরেকটা বিষয়ও না বললেই নয়। বেশীরভাগ সিরিজগুলোই ক্রিমিন্যাল বা অপরাধীর যে কোনো একটা ব্যাকড্রপের কাহিনী বলে পার পেতে চায় যেন। তবে এখানে সুদীপ শর্মা চারজন ক্রিমিন্যালের আলাদা আলাদা ব্যাকস্টোরি দেখিয়ে দারুণ শক্তসমর্থভাবে গড়ে তুলেছেন একেকটা চরিত্রকে। ভিত্তি শক্ত ছিল বলেই হয়তো দৃশ্যে তেমন কোনো নৃশংসতা না দেখিয়েও দুর্ধর্ষ এক কিলারের সঙ্গে দর্শকের পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন লেখক আর পরিচালক। নাহ শুধুমাত্র অপরাধীই না; লেখক চেষ্টা করেছেন প্রতিটা চরিত্রকে দারুণভাবে গড়তে আর তাতে তিনি সাফল্য লাভ করেছেন তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আর সেজন্যে লেখকের দুই বছর সময় যে চলে গেছে তাতে আশা করি আফসোসের কিছু নেই।
এখন আসি অভিনয়ের কথা। পুরো সিরিজটার লাইমলাইট ছিল হাতিরাম চৌধুরীর উপর, এই কাজে জীবনের সেরাটাই দিয়েছেন জয়দীপ আহলাওয়াত। বিদ্যুত জামালের কমান্ডো মুভিতে ভিলেন ছিল সেটা বেশ ভালোই মনে আছে। পরে দেখলাম বেশ কিছু মুভিতেই ছিল তবে খেয়াল করা হয়নি। যাক গে, জয়দীপের চরিত্রটা খানিকটা ব্যতিক্রম ধারার। নিজের বাবার গাফিলতির জন্য আজীবন সেই বাবার হাতেই মার খেয়ে বড় হয়ে উঠা; পুলিশের চাকুরীতে এসে তার কাছেই ট্রেইনিং নেয়া কেউ তারই বস বনে যায়; নিজের ছেলে কিংবা স্ত্রী কেউই তেমন গুরুত্ব দেয় না হাতিরামকে; বিষণ্ণতা, ক্ষোভ, হেরে যাবার আক্ষেপ – সবকিছু মিলিয়ে হাতিরাম চৌধুরীর থেকে অনেক বেশী ভালো কাজ করিয়ে দেখিয়েছেন জয়দীপ আহলাওয়াত।

সিরিজের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র সঞ্জীব মেহরা চরিত্রে ছিলেন নীরাজ কবি। নীরাজ কবিকে প্রথম দেখেছি রাণী মুখার্জীর বিপরীতে হিচকি মুভিতে। কি অসাধারণ অভিনয় দক্ষতা লোকটার। এরপর স্যাক্রেড গেমসের কথা আর নাইবা বললাম। পাতাল লোকে সঞ্জীব মেহরা হচ্ছে এমন একটা চরিত্র যে কিনা একইসঙ্গে সত্যবাদী; আবার নিজের ক্যারিয়ারের স্বার্থে যে কোনো কিছু করতেই ব্যাপক আগ্রহী; এমন একটি ভাইটাল চরিত্রে নীরাজ কবি দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন। এত ন্যাচারাল ছিলেন যে বুঝার উপায় নেই উনি অভিনয় করছেন নাকি বাস্তবেই এমন তিনি।
এবং সিরিজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের অধিকারী ভিশাল তেয়াগী চরিত্রে অভিষেক ব্যানার্জী। মির্জাপুরে মুন্না ত্রিপাটির বন্ধু থাকা এই ছেলেটির অভিনয় আমার ভালোই লেগেছিল। কিন্তু ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেনি এত দুর্ধর্ষ এক সিরিয়াল কিলারের চরিত্রে নিজেকে দারুণভাবে মানিয়ে নেবে অভিষেক। ঠাণ্ডা মাথার খুনি অথচ খুনের সময়ের যে হিংস্রতা বা পাশবিকতার অভিব্যক্তি – সত্যিই মুগ্ধ করেছে। দুর্দান্ত লেগেছে এক কথায়। এছাড়া, স্বস্তিকা, নীহারিকা সহ প্রতিটা চরিত্রই এত নিখুঁত অভিনয় করেছে যে গল্পটাকে দারুণ জমাতে সাহায্য করেছে তাদের অভিনয়। এমনকি ১/২ টা দৃশ্যে থাকা অটো ড্রাইভারেরও সে কি অভিনয়।

ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয়গুলোকে সূক্ষ্মভাবে ফুটিয়ে তোলার কারণেই এই সিরিজের গভীরতা এতটা ভালোভাবে চোখে পড়েছে। হ্যাঁ, গল্প অনেক স্লোবার্ণ বা খানিকটা শ্লথ গতিসম্পন্ন মনে হতে পারে অনেকের কাছে। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমার তেমন মনে হয়নি। কারণ শুধু মোটিভের পেছনে না ছুটে, একইসঙ্গে ব্যাকড্রপ স্টোরি দেখানোর উপরও জোর দিয়েছেন লেখক। সবদিক বিচারে দারুণ একটা ওয়েব সিরিজ উপহার দিয়েছে সুদিপ শর্মা। ইতিমধ্যেই শোনা যাচ্ছে দ্বিতীয় সিজনের চিন্তাও ঘুরপাক খাচ্ছে তার মাথায়।
