Crafting Ideas Into Impactful Content

অতিপ্রাকৃতের সন্ধানে: কালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়া কিংবদন্তিগুলো

অতিপ্রাকৃতের সবচাইতে সহজ অর্থ হচ্ছে, যেটা অযৌক্তিক। প্রকৃতির সাধারণ নিয়মের বাইরে ঘটে যাওয়া ঘটনাকেই অতিপ্রাকৃত বা অলৌকিক বলে আখ্যা দেয়া হয়ে থাকে। প্রাগৈতিহাসিক কালে মানুষ যখন গুহাবাসী ছিল তখন থেকেই অজানাকে জানার একটা প্রবৃত্তি তৈরি হয়ে গিয়েছিল মানবসত্ত্বার মনের গহিনে। এই অদম্য ইচ্ছে থেকেই মানুষ সাগর পাড়ি দিয়ে নতুন মহাদেশে পা রেখেছিল। এমনকি এই অদম্য ইচ্ছেই মানুষকেই পৃথিবী পেড়িয়ে চাঁদে নিয়ে গেছে। কিন্তু এই অদম্যতা যে সবসময় সফল হয়েছে তাও কিন্তু নয়! অনেক অদম্য ইচ্ছের কাছে বলি দিতে হয়েছে মানব প্রাণ পর্যন্ত। তাও কি থেমেছে মানুষের অদম্যতা? না থামেনি বরং বেড়েছে। 

যুগে যুগে ঘটে যাওয়া এইসব অতিপ্রাকৃত ঘটনাই কিংবদন্তি এবং লৌকিক সাহিত্য হয়ে রয়ে গিয়েছে মানুষের মুখে মুখে। কখনোবা সেগুলো উঠে এসেছে সত্য ঘটনা থেকে; কখনোবা পৌরাণিক বা পুরাণের গল্প থেকে। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে রয়ে যাওয়া এসব রহস্য মানুষকে এখনো রোমাঞ্চিত করে। আর তাই তো, এইসব কিংবদন্তিতেও মানুষের আগ্রহ অনেক বেশি। আর তাই মানুষের জানা-অজানা কিংবদন্তিগুলো, অতিপ্রাকৃত, পৌরাণিক গল্পগুলো নিয়ে মলাটবন্দি এক বইয়ের আয়োজন।  

অতিপ্রাকৃতের সন্ধানে নামক বইটিতে কৌতূহলী এসব গল্প, ছাপার হরফে মলাটবদ্ধ করেছেন লেখক আব্দুল্লাহ ইবনে মাহমুদ। অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২০ এ ছায়াবীথি প্রকাশনীর ব্যানারে বইটি প্রকাশ পেয়েছে। প্রচ্ছদ করেছেন মারযুক রহমান রিফাত। প্রচ্ছদটা অনেকেরই ভালো লেগেছে কিংবা লাগতে পারে; ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে খুব বেশি জমকালো মনে হয়েছে। যদিও বইয়ের অধ্যায়ের চিত্রগুলোকে তুলে ধরার একটা চেষ্টা ছিল প্রচ্ছদশিল্পীর। বইটির পেইজ, বাইন্ডিং সর্বোপরি বইটির আউটলুক খুবই স্ট্যান্ডার্ড মানের। 

লেখক রোর বাংলা নামক জনপ্রিয় অনলাইন কন্টেন্ট প্ল্যাটফর্মের অন্যতম জনপ্রিয় ফিচার লেখক। ইতিপূর্বেই, এই বইয়ের বেশ কয়েকটা অধ্যায় রোর বাংলার অনলাইন সাইটে প্রকাশ হয়েছে। বইটিতে মোট আটাশটি অধ্যায় রয়েছে। প্রথম সাতটা অধ্যায় আলকেমি বা পরশ পাথর সম্পর্কিত। বিখ্যাত বিজ্ঞানী স্যার আইজ্যাক নিউটনের পরশপাথরের প্রতি আগ্রহ আর গবেষণা নিয়েই মূলত এই অধ্যায় রচিত। সঙ্গে ছিল নিকোলাস ফ্লামেলের রহস্যময় অন্তর্ধান। 

© Wazedur Rahman Wazed

আট নাম্বার অধ্যায়ে উঠে এসেছে অমরত্বের ঝর্ণা নিয়ে রচিত যত উপকথা আর গল্প। অধ্যায় নয় আর দশ খুবই কৌতূহলোদ্দীপক। প্রাচীন ব্যবিলনের জাদুবিদ্যা নিয়ে রচিত অধ্যায়ে উঠে এসেছে ফেরেশতা হারুত-মারুতের আখ্যান। আর পরের অধ্যায়ে ঈশ্বরকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে শাদ্দাদের পৃথিবীতে বেহেশত নির্মাণের গল্প সঙ্কলিত হয়েছে। 

এগারতম অধ্যায়ে এসেছে অ্যালিস্টার ক্রোলি নামক এক কুখ্যাত ব্যক্তির জীবনী। তার কার্যকলাপের আলোকে তাকে পৃথিবীর খারাপতম মানুষ বলে আখ্যা দেয়া হয়। বারতম অধ্যায়ের গল্পটা কমবেশি সবারই জানা। বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের গল্প – যেখানে জাহাজ বা বিমান মিলিয়ে যায় বাতাসে। এখানকার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার চাইতে অলৌকিক ব্যাখ্যাগুলোই বরং মানুষকে আরো বেশি আনন্দ দেয়। পরের দুই অধ্যায়ে এসেছে দুজন রহস্যময় ব্যক্তির কথা। এসেছে আল-বিলেকের এর কথা, যিনি কিনা ভবিষ্যত দুনিয়া থেকে ঘুরে এসেছেন বলে দাবি করতেন। তারপরেই আছে নস্ট্রাডামুসের কথা – যিনি নিজের মৃত্যুর ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন নিজেই। 

পনেরতম অধ্যায়ে উঠে এসেছে এক সেতুর কথা। কেউবা ডাকে আদম সেতু নামে; কেউবা আবার রাম সেতু। সাগরে বিলীন হয়ে যাওয়া এই সেতুর পৌরাণিক আর লৌকিক গল্প নিয়েই এই অধ্যায় রচিত। পরের অধ্যায়ে উঠে এসেছে এক সিরিয়ান উপাখ্যান যেই ঘটনার বর্ণনা রয়েছে পবিত্র গ্রন্থ কুরআনেও। আসহাবে কাহাফ বা গুহাবাসীদের সেই গল্পই বলেছে এই অধ্যায়। এরপরের অধ্যায়ে লেখক জনপ্রিয় আরেক মিথ নিয়ে আলোচনা করেছেন – ভ্যাম্পায়ার মিথ। 

রূপকথার পাখি ফিনিক্সকে নিয়ে সাজানো হয়েছে আঠারতম অধ্যায়। যে পাখি ছাই থেকে বারবার জন্ম নেয়। উনিশতম অধ্যায়ে উঠে এসেছে পৃথিবীর বিতর্কিত এক গুপ্তসংঘের কথা, নাম ইলুমিনাতি। সেসব ছাপিয়ে হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার কথা নিশ্চয়ই মনে আছে? শহরের সব ইঁদুরই না বরং শহরের সব শিশুকে নিজের সুরের যাদুতে আকৃষ্ট করে নিয়ে গিয়েছিল দূরে কোথায়ও। শুধুই কি পৌরাণিক গল্প এটা নাকি আছে সত্যতা – তাই নিয়ে আলোচনা হয়েছে বিশতম অধ্যায়ে। পরের দুটি অধ্যায়ে শয়তানকে নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিভিন্ন ধর্ম এবং মিথগুলোতে শয়তানের উৎপত্তি নিয়ে আলোচনা। 

রাজা সুলাইমানের কথা মনে আছে? জিনদের বশ করে কাজ করাতো ইসলামের যেই নবী – মনে আছে তার কথা? সেই রাজা সুলাইমানের ইতিবৃত্ত নিয়ে আলোকপাত হয়েছে তেইশতম অধ্যায়ে। নেপোলিয়নের কথা তো জানাই আছে সবার? নেপোলিয়নের একটা পিরামিড রহস্য রয়েছে যা আজ অবধি সমাধা হয়নি; মূলত সেই রহস্যটা কি তাই নিয়েই এই অধ্যায়। ইহুদী, ইসলাম আর খ্রিস্টান – তিন সম্প্রদায়ের কাছেই ইয়াজুজ-মাজুজ ধর্মীয়ভাবে বেশ পরিচিত একটা নাম। সেই ইয়াজুজ-মাজুজদের নিয়েই রচিত পঁচিশতম এই অধ্যায়। আর অধ্যায় ছাব্বিশ থেকে আটাশ অবধি প্রাচীন মিসরের কিছু কিংবদন্তি আলোচ্য হয়েছে। 

লেখক আব্দুল্লাহ ইবনে মাহমুদ। Image Source: facebook.com/abdullah.ibnmahmud

আব্দুল্লাহ ইবনে মাহমুদ। পড়াশুনার পাঠ চুকিয়ে বর্তমানে কর্মজীবনে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। পাশাপাশি লেখালেখিটাকেও আঁকড়ে ধরে রেখেছেন বেশ ভালোভাবেই। রোর বাংলা সাইটের অন্যতম সেরা ও জনপ্রিয় লেখক হিসেবে ইতিমধ্যেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তার শতাধিক লেখনি জনপ্রিয়তা পেয়েছে অসংখ্য পাঠককুলের কাছে। এরই ধারাবাহিকতায় গ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগ করেছেন। বইমেলা ২০২০ এ আদী প্রকাশন থেকে বের হয় তার অনূদিত গ্রন্থ, চিত্রাকর বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত প্যালেস অফ ইল্যুশনস। এছাড়া, ছায়াবীথি প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয় অতিপ্রাকৃতের সন্ধানে এবং ইহুদী জাতির ইতিহাস নামক আরো দুটি বই। ইতিমধ্যেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে রচিত হয়েছে তার মৌলিক উপন্যাস এলিরিন

বইয়ের শুরুটা হয়েছে আলকেমি বা পরশমণি নামক অধ্যায় দিয়ে। যেটা যে কোনো পাঠকের কাছেই খুব আগ্রহ জাগানিয়া। শুরুতেই এমন টপিক পেয়ে পাঠক যে গ্রোগ্রাসে গিলতে চাইবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। সর্বোপরি, বইতে আলোচ্য টপিক নির্বাচনের জন্য লেখককে বাহবা দিতেই হয়। মোটামুটি সবগুলো টপিকই অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক। একইসাথে এত আকর্ষণীয় আর বিনোদনমূলক টপিক যে কোনো পাঠকই নিশ্চিন্তমনে লুফে নিবে। 

তবে কিছুটা মনঃক্ষুণ্ণ হতে হয়েছে লেখকের লেখনশৈলীর কাছে। কেননা, ব্লগসাইটের লেখার ‘টোন’ আর মলাটে বন্দি ছাপার অক্ষরের লেখার ‘টোন’ এক হবার কথা নয়। ‘আমাদের আজকের আয়োজন’ ‘এই পর্বে থাকছে’ ‘চলুন জেনে নেই’ ‘একটু পরেই আসছি সেই টপিকে’ – এই ধরণের উপমাগুলো সাধারণত ব্লগসাইটের জন্যই উপযুক্ত। মলাটবন্দি ছাপার অক্ষরে এমন বাক্যগুলো কেমন যেন অদ্ভুত ঠেকে। এমনটা মনে হতেই পারে যে – তাহলে ব্লগ আর বইয়ের মধ্যে তফাতটা রইলো কোথায়? 

ব্লগের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা যেমন হয় যে – একটা ব্লগ সাধারণত সর্বোচ্চ আড়াই হাজার শব্দ পর্যন্ত একজন পাঠক একটানা পড়তে পারে। ক্ষেত্রেবিশেষে এটা কমবেশিও হতে পারে। তাই ব্লগে যতটুকু সময় পাঠককে আটকে রাখতে চায় লেখক ঠিক ততটুকুই উপকরণ ঢেলে লেখাটাকে সাজাতে হয়। আর পাঠক নিজেও জানে যে, ব্লগ থেকে যতটুকু না জানলেই নয় ঠিক ততটুকুই জানতে পারা যায়।

কিন্তু একজন পাঠক যখন জেনে-বুঝে-দেখে একটা ননফিকশন বই কিনছে; তখন সে অবশ্যই অল্পটা জেনে সন্তুষ্ট হতে পারবে না। অন্তত যতটা পর্যন্ত না লিখলেই নয় ততটাই পাঠক আশা করে। এমন অনেক অধ্যায়ই আছে যেগুলো পড়া শেষে সন্তুষ্টি ভাবটা কাজ করেনি; একজন নিতান্তই সাধারণ পাঠক হিসেবে। মনে হয়েছে যেন – লেখক হয় মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ নিয়ে আলোচনা করেই সময় কাটিয়েছেন; আর নয়তো তথ্যের উপর দিয়ে ভেসে বেড়িয়েছেন; গভীরে ডুবে বিস্তারিত আলোচনার জায়গাটা রয়েই গেছে অপূর্ণ। 

© Wazedur Rahman Wazed

নিঃসন্দেহে লেখক আব্দুল্লাহ ইবনে মাহমুদ যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন সঠিক আর নির্ভুল তথ্য দেয়ার। সেটার ছাপ বইতে স্পষ্ট। তবে এমনটা ভাবার সুযোগও তিনি রেখেছেন যে, লেখক চাইলে হয়তো আরেকটু বিশদভাবে আলোচনা করতে পারতেন। ফিকশনে কখনোই সর্বোচ্চ তথ্য দেয়ার দরকার পড়ে না। কিন্তু ননফিকশনে আপনাকে সর্বোচ্চটাই দিতে হবে। কেননা, আপনি জানেন না পাঠক কতটুকু আগে থেকেই জেনে বইটা পড়তে বসেছে। 

তবে হ্যাঁ, সন্তুষ্টিও আবার পাঠকভেদে নির্নীত হয়ে থাকে। কোনো পাঠক যদি ইতিপূর্বে এসব না জেনেই পড়তে বসে তবে তার কাছে এমন বই রত্নতুল্য হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। তার মানে এই না যে, একজনের কাছে রত্নতুল্য এই বই আরেকজনের কাছে পাথরতুল্য মনে হবে। প্রথমজন পড়ে হয়তো তৃপ্ত হবে; আর দ্বিতীয়জন পড়ে হয়তো তৃপ্ত হতে পারবে না; তার জানার আগ্রহটা রয়েই যাবে। স্কুল-কলেজ পড়ুয়া পাঠক কিংবা আলসে বুড়ো পাঠকদের জন্য এই বই অবশ্যই দুর্দান্ত এক সংকলন। কিন্তু জানতে আগ্রহী আর কৌতূহলী পাঠকরা অনেক কিছুই জানতে পারলেও, অন্তত পূর্ণতা পাবে না এই বই থেকে। 

‘সেটা নাহয় পরের খণ্ডেই আসুক’ বা ‘বিস্তারিত জানতে পড়ে দেখতে পারেন আমার ইহুদী জাতির ইতিহাস গ্রন্থটি’ কিংবা ‘সেই কাহিনী তোলা থাক পরের খণ্ডের জন্য’ – ব্লগসাইটে এসব হাইপারলিংক করে দেয়া যায় যেন পাঠক পড়তে পড়তে আগ্রহী হলে ঘুরে আসতে পারে। কিন্তু এটাকে বইতে ব্যবহার করলে কেমন যেন অদ্ভুত ঠেকে দেখতে বা পড়তে।

পরিবর্তে, পরের খণ্ড কিংবা অন্য গ্রন্থের কথা টীকাতে গিয়ে, ‘এই গল্পের সূত্রপাত এখান থেকে – আমার অমুক বইটি পড়তে পারেন আগ্রহী হলে’ আর নয়তো, ‘উপরিউক্ত * তারকা চিহ্ন বিষয়গুলো নিয়ে পরবর্তীতে গ্রন্থ রচনার পরিকল্পনা রয়েছে, যদি পাঠকরা আগ্রহী হয়’ এভাবে লিখলে মনে হয় প্রচার আর বইয়ের স্ট্যান্ডার্ড ভাব – দুইই বজায় থাকতো। একইসঙ্গে লেখক চাইলে বইয়ের শেষে একটা গ্রন্থপুঞ্জিও যুক্ত করে দিতে পারতো।

বইতে টপিক অত্যধিক বেশি বলে মনে হয়। লেখক চাইলে টপিক কমিয়ে লেখা পূর্ণাঙ্গ বা বিশদভাবে লেখার চেষ্টা করলে, হয়তো বই নিয়ে দ্বিতীয় উচ্চবাক্য করতে হতো না পাঠককে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, অমরত্বের ঝর্ণা অধ্যায় পড়ে পাঠক যতটা তৃপ্ত হবে ঠিক ততটাই হতাশ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে নেপোলিয়নের পিরামিড রহস্য অধ্যায় পড়ে। এছাড়া, বইতে ব্যবহৃত চিত্রগুলোর ক্ষেত্রে কিছু জায়গায় সেগুলোর অবস্থান অপ্রাসঙ্গিক লেগেছে। অত্যন্ত দরকার ছিল বলে মনে হয়নি। 

© Wazedur Rahman Wazed

সম্পাদক আর লেখকের যৌথ প্রচেষ্টার ফলেই হয়তো বানান ভুল সংক্রান্ত কোনো ত্রুটি নজরে আসেনি। এদিক থেকে দুজনকেই সাধুবাদ জানাতে হয়। অন্যদিকে সম্পাদককে জানাতে হয়, বানানের পাশাপাশি বাক্য গঠনের দিকে খানিকটা নজর দিলে হয়তো লেখকের লেখার পূর্ণতা আরো কিছুটা পরিস্ফুটিত হতো। লেখকের লেখনশৈলীতে কিছু কিছু জায়গায় রুক্ষতা আছে; আবার আছে গতিহীনতা; যার কারণে সাবলীলতা আর প্রাঞ্জলতা – দুই হারিয়েছে। তবে সেটা ক্ষেত্রবিশেষে, অল্প কিছু অংশে, পুরোটা জুড়ে নয়। এদিকটাতেও খানিকটা নজর দেয়া উচিত ছিল সম্পাদক সাহেবের। 

এই বইয়ের মলাট মূল্য নিয়েও অনেকের অভিযোগ রয়েছে। যদিও ব্যক্তিগতভাবে আমি সবসময়ই এই বিষয়টাকে এডিয়ে যাই। তবে বলতে বাধ্য হলাম যে, এখনকার ইন্টারনেটের জগতে এই বইয়ের মলাট মূল্য সত্যিকার অর্থেই খানিকটা বেশি মনে হয়। কেননা, বেশিরভাগ তথ্যই অনেক বেশি সহজলভ্য আধুনিকতার যুগে। তবে হ্যাঁ, যদি পাঠক গ্রন্থটি পড়ে তৃপ্ত হয় তবে মূল্য নিয়ে আফসোসের জায়গাটা মূহূর্তেই উবে যায়। তাই এই প্রসঙ্গটা আসলে পাঠক থেকে পাঠকে ভিন্নতা বহন করে।

এতদসত্ত্বেও, বইটা প্রশংসার দাবীদার। কারণ, যেভাবে লেখক শূন্য থেকে একটা মৌখিক বা লৌকিক সাহিত্যকে তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে লেখনীতে পূর্ণতা দিয়েছেন – তা নিঃসন্দেহে বেশ ভালো উদ্যোগ। একইসঙ্গে চমৎকার কাজ। লেখকের প্রতি শুভকামনা রইলো পরবর্তী বইগুলোর জন্যে। আর হ্যাঁ, যদি লেখকের মনে হয় উপরিউক্ত ব্যাপারগুলোতে নজর দেয়া সত্যিকার অর্থেই জরুরী – তাহলে এই গ্রন্থালোচনা যে সফল তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। 

এখন এমন একটা সময় যে, কোনো বই নিয়ে প্রশংসা করলে সেটা হয় স্বজনপ্রীতি আর নয়তো অর্থের বিনিময়ে হয়েছে বলেই ধরে নেয় পাঠককুল। আবার, সমালোচনা করলে ব্যক্তিগত শত্রুতা বা হিংসার জের বলেই বিবেচিত হয় – যতই তা গাঠনিক সমালোচনা হোক না কেন। এই বইয়ের লেখক আব্দুল্লাহ ইবনে মাহমুদ ব্যক্তিগতভাবে আমার পরিচিত নন। রোর বাংলায় আমরা দুজনেই লেখালেখি করি; ব্যস এটুকুই। কখনো দেখা হয়েছে কিংবা আলাপ হয়েছে কিনা, সেটাও নিশ্চিত নই। একজন নিতান্তই সাধারণ পাঠক হিসেবে নিজের প্রতিক্রিয়াটাই ব্যক্ত করেছি কেবল। এতে যদি লেখকের খারাপ লাগে তাহলে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি।একইসঙ্গে পরবর্তী বইগুলোর জন্য শুভকামনা রইলো লেখকের প্রতি।

বই: অতিপ্রাকৃতের সন্ধানে
লেখক: আব্দুল্লাহ ইবনে মাহমুদ
সম্পাদনা: মুহাইমিনুল ইসলাম অন্তিক
প্রচ্ছদ: মারযুক রহমান রিফাত
প্রকাশনী: ছায়াবীথি
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ২৭২
মলাট মূল্য: ৫০০/- টাকা মাত্র

Share this
Facebook
Twitter
LinkedIn

Related Posts

রিভিউ

পনম্যান: সামাজিক রীতিনীতির যাঁতাকলে পিষ্ট এক থ্রিলার গল্প

গল্পের ভাঁজে একেকটা কর্মকান্ডে উঠে এসেছে কখনো সমাজব্যবস্থার নড়বড়ে কাঠামো, কখনো সমাজের নৈতিকতার যাতাকলে পিষ্ট মানুষদের অসহায়ত্ব, কখনো ব্যক্তিত্বের নৈতিকতার সীমাবদ্ধতা, অথবা কখনো অর্থনৈতিক অসাম্যের মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে যে বিষ ছড়ায় তার বাস্তব দৃশ্যময়তা।

দ্য ফ্রগ: হয়েও হলো না একটি পারফেক্ট ক্রাইম থ্রিলার

নেটফ্লিক্সের নতুন কোরিয়ান থ্রিলার সিরিজ দ্য ফ্রগের প্রত্যেকটা এপিসোডের শুরুতে এই ডায়ালগটা শুনতে পাবেন। কোরিয়ান ভাষায় সিরিজটার নাম অনেকটা এমন – In the forest where no one’s around. কিন্তু তাহলে নামটা ফ্রগ হলো কেন?