বিশ্ব স্থবির হয়ে আছে। মানবজাতি গৃহবন্দি। অদ্ভুত এক ডিস্টোপিয়ান সময় পার করছি সকলে যেন। আতঙ্ক মুহুর্মুহু দলা পাকিয়ে গলার কাছে আটকে যাচ্ছে। মৃত্যু যেন সবার চারপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে। সবচেয়ে কাছের প্রিয়জনকেও প্রতিনিয়ত সন্দেহ হচ্ছে। সময়ও যেন তার সাধারণ গতি হারিয়ে পর্যবসিত হচ্ছে স্থূলতায়। অদ্ভুত এক মৃত্যু নেশায় নিজেকে আসক্ত করেছে যেন প্রকৃতি। মুক্তির সংজ্ঞাও যেন ধীরে ধীরে রুদ্ধতায় পরিণত হচ্ছে। আর আমরা…অদ্ভুত এক অবরুদ্ধ সময়ে মুক্তির আশায় প্রহর গুনে যাচ্ছি।
অস্থির এক সময় পার করছি আমরা। করোনার এই লকডাউনে গৃহবন্দি মস্তিষ্ক যেন অবরুদ্ধ হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করে নিচ্ছিল। হাতের কাছে না পড়া বইয়ের স্তূপ কিন্তু ইচ্ছে করে না। মুভি আর টিভি সিরিজের এত সহজলভ্যতাও যেন মনকে টানে না। একদলা আতঙ্ক গলার কাছে এসে দলা পাকিয়ে আটকে থাকে সর্বদা। এরকম একটা পরিস্থিতিতে দরকার ছিল ভিন্ন কিছু; একদমই ব্যতিক্রমী কিছু। তরুণদের নতুন উদ্যোগের কিছু।
এমতাবস্থায় বাতিঘর প্রকাশনী থেকে অনলাইন গল্প সংকলন যেন খানিকটা স্বস্তি এনে দিল। শরীফুল হাসানের সম্পাদনায় মোট ৪২ টি গল্প অন্তর্ভূক্ত হয়েছে এই সংকলনটিতে। ৪২ জন লেখককে একটা সংকলনে পাওয়া চাট্টিখানি কথা নয়; তাও যদি হয় সকলের জন্য উন্মুক্ত অনলাইন সংকলন। সংকলনটি পাবেন এখানে।

যাক এতসব কথা রেখে মূল প্রসঙ্গে ফিরি। সম্পাদনায় ছিলেন সুলেখক শরীফুল হাসান। উপদেষ্টা হিসেবে ছিলেন আরেক সুলেখক মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন। সার্বিক সহযোগিতায় ছিলেন বাপ্পী খান; অবশ্য সবকটা গল্পের প্রচ্ছদ করার দায়ভারও ছিল এই লোকটার কাঁধে। প্রচ্ছদগুলো আসলেই খুব সুন্দর হয়েছে।
সংকলনটির আয়োজনে ছিল বাতিঘর প্রকাশনী এবং এর প্রচারকার্য সম্পন্ন করেছে থ্রিলার পাঠকদের আসর নামক ফেসবুক গ্রুপ আর তার সাথে সংশ্লিষ্ট সকল সদস্য। ৪২টা গল্পের সার-সংক্ষেপ আর প্রতিক্রিয়া দিতে গেলে আমার এই রিভিউ আরেকটা সংকলনের সমতুল্য বলেই গণ্য হবে। তাই বাছাই করে গল্পের সারাংশ আর প্রচ্ছদ দিলাম এবং সবগুলার ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়া লিখলাম।
প্রতিবিম্ব – তানজীম রহমান
গল্পটা একটা দশ বছরের বাচ্চা ছেলের। বাচ্চাদের যতসব উদ্ভট কাজকর্ম আছে এই ছেলেটাও তাই করে। কিন্তু একদিন একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটে যায় ওর নিজের সঙ্গেই। নতুন আনা ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় অদ্ভুত একটা দৃশ্য দেখে।

তানজীম রহমানের বর্ণনাভঙ্গি বেশ সাবলীল আর প্রাঞ্জল। উত্তম পুরুষে গল্প বর্ণনার ক্ষেত্রে শব্দচয়ন আর বাক্যগঠনের প্রতি লেখকের বিশেষ নজর দিতে হয়; নাহয় পাঠকের ধৈর্য্যচুতি ঘটার সম্ভাবনা থাকে। মাত্র হাজার দুয়েকেরও কম শব্দে লেখা এই গল্পে তানজীম রহমান সেই কাজটিই করে দেখিয়েছেন। খুবই সাধারণ একটা গল্পকে অনন্য সাধারণ মাধুর্যতা দিয়েছেন লেখক। লিনেয়ার গল্পটাকেই এত সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছেন যে, পাঠক তো প্রশংসা করবেই; উপরন্তু সংকলনটা পড়ার প্রতি আরো বেশী আগ্রহান্বিত বোধ করবে। সম্পাদকের ধন্যবাদটা এখানে প্রাপ্য।
জম্বা – বাপ্পী খান
মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিককার ঘটনা। মানিকগঞ্জের বালিয়াটি জমিদারবাড়িতে রহস্যময় এক সিন্দুক আছে। যুদ্ধ শুরু হলে জমিদারবাবু পালিয়ে যায় এক বস্ত্রে। জমিদারবাড়ির কেয়ারটেকার সুন্দরলাল তাই বেঁচে দিয়ে দুটো অর্থের আশায় সিন্দুক নিয়ে ছোটে একমাত্র মেয়েকে সঙ্গী করে। কিন্তু পথিমধ্যে ধরা পড়ে হানাদার বাহিনীর কাছে।

বাপ্পী খানের লেখা একদমই সহজ ধারার। সরলরেখার মতো হলেও কিছু কিছু বাক্যের কারণে বাপ্পী খানের লেখায় বক্রতার সৃষ্টি হয়। গল্পে বর্ণিত উর্দু ভাষার প্রয়োগে খামতি লেগেছে। এইসব ব্যাপারে খানিকটা সতর্ক থাকা উচিত লেখকের। যাক গে, গল্পের প্লট আর উপস্থাপনে বেশ ভালো কাজ দেখিয়েছেন। এক নিমেষেই পড়ার মতো একটা গল্প।
কারাগার ৪৬০০ – তানজীরুল ইসলাম
ভবিষ্যত দুনিয়ার এক কারাগার; যা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। প্রহরী হিসেবে পাহারায় রত থাকে একদল হিউম্যানয়েড রোবট। অবশ্য কয়েকজন মানুষও এদের সঙ্গে সতর্কতা অবলম্বন করে থাকে। কিন্তু এতসব নিরাপত্তা ব্যবস্থা সত্ত্বেও একদিন জানা যায় যে, কারাগারের সকল কয়েদি পালিয়েছে। রোবটগুলো সব বিকল হয়ে পড়ে আছে।

তানজীরুল ইসলাম একজন পুরোদস্তুর সাই-ফাই বা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর লেখক। ভিন্ন ধারার এমন বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীগুলো আসলে বেশ ভালো লাগে। গল্পটা অনেক সুন্দর করে সাজানো আর উপস্থাপন করা হয়েছে। বর্ণনাভঙ্গিও প্রাঞ্জল তবে শুরুতে খটমটে লেগেছে খানিকটা। পরে অবশ্য ঠিক ছিল। আর লেখক চরিত্রের নামগুলো খুবই কঠিন করে ফেলে ব্যতিক্রম করতে গিয়ে।
নেচার কোড – কৌশিক জামান
নেচার কোড আসলে ঐশ্বরিক কোড, যা দিয়ে মহাবিশ্ব গঠিত হয়েছে। এই নেচার কোড নিয়েই একদিন প্রেরকের ঠিকানাবিহীন অদ্ভুত এক ইমেইল এসেছিল সাংবাদিক মহসিন আনোয়ারের কাছে। তার জীবনী লেখার কাজ করছে রাসেল আর তাকেই বলছিলেন এই নেচার কোডের বিষয়ে। সেই মেইলটা পরে তিনি আর খুঁজে পাননি এবং তার পিছনে একদল লোক লেগে গিয়েছিল ইতিমধ্যেই।

কৌশিক জামান। সমসাময়িক অনুবাদ সাহিত্যে বেশ আলোচিত আর জনপ্রিয় নাম। অনুবাদে সিদ্ধহস্ত হলেও মৌলিকে এইটাই শুরুর দিকের একটা কাজ। বর্ণনাভঙ্গি বেশ প্রাঞ্জল আর সাবলীল। এমনকি বিজ্ঞান বিষয়ক কথাবার্তাগুলো বেশ সহজ আর স্বাভাবিকভাবেই উপস্থাপন করা হয়েছে। গল্পটা যদিও অনুমেয় তবুও খুবই সুন্দরভাবে সাজানো আর গোছানো। লেখকের অনুবাদ পড়েই অভ্যস্ত কিনা নাকি অন্য কোনো কারণেই হোক, মৌলিক হলেও খানিকটা অনুবাদ সাহিত্যের মতোন লেগেছে। তাই বলবো, লেখকের মৌলিক লেখার চর্চা চালানো উচিত।
ডিমেনশিয়া – মোহাইমিনুল ইসলাম বাপ্পী
নতুন গ্রহে বসতি স্থাপনের লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রজাতীর এগ নিয়ে যাত্রা করা দুই নভোচারীর মধ্যে বাকবিতন্ডা চলছিল। আমেরিকার নভোচারী রিক চাইছে প্ল্যানেট আলফায় যেতে কিন্তু বাংলাদেশী নভোচারী তমালিকা চৌধুরী চাইছিল প্ল্যানেট বিটায় যেতে। তো তর্কাতর্কির এক মূহূর্তে রিক চেয়ারের সঙ্গে বেঁধে ফেলে তমালিকাকে। আর তারপরই রিকে স্পেস নার্ভাস ব্রেকডাউন হয়। স্মৃতিভ্রষ্ট রিক জেগে উঠে ঠিকই কিন্তু নিজেকেই চিনতে পারে না।

গল্পটা খুবই সুন্দর। দ্বিতীয় কোন কথা বলার সুযোগ রাখে না। বিশেষ করে এতটুকুন একটা গল্পে গতিপথ বদলে ফেলার ব্যাপারটা ভালো লেগেছে। শব্দগত ভুল ছিল ২/১ টা। তবে উপস্থাপন ছিল সাবলীল আর প্রাঞ্জল। ভালো লেগেছে।
ধোঁয়াটে বাতাসে, নালিশ রেখে যায় – ইমতিয়াজ সজীব
হৃদয় তাকে মাকে নিয়ে বস্তির একটা ঘরে থাকে। দুজনের ভাতের ব্যবসা। রিক্সাওয়ালারা এসে ভাত খেয়ে যায়। হৃদয়ের আবার সাইড ইনকাম আছে পিক পকেটিংয়ের। যার শেয়ার দিতে হয় মিজানকে। ছোট থেকেই মায়ের চরিত্রের কারণে বেশীদিন এক জায়গায় থাকতে পারেনি হৃদয়রা। তবে এবার সবকিছু ঠিক হয়ে গেছে বলে মনে করে হৃদয়। কিন্তু বাড়ি ফিরে দেখে তার মা মিজানের সঙ্গে রসিয়ে রসিয়ে কথা বলছে। হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে একটা অদ্ভুত কাণ্ড ঘটিয়ে বসে হৃদয়।

খুবই নৃশংস তবে চরম বাস্তবিক একটা গল্প। লেখার ধাঁচে খানিকটা ভিন্নতা আছে যা লক্ষ্যনীয়। বর্ণনাভঙ্গি সাবলীল আর প্রাঞ্জল। শব্দগত ভুল থাকলেও বাক্যের অলংকরণ খুবই সুন্দর জালে বুনা। লেখককে অভিনন্দন এবং একইসঙ্গে কাজ চালিয়ে যাবার অনুরোধ। শুধু ভালো নয় বরং দারুণ লেগেছে।
ত্রাণ-কর্তা – রবিন জামান খান
আলহাজ্ব মোহাম্মদ মফিউজ্জামান তরফদার অত্র এলাকার এম্পি সাহেব। ধার্মিক হিসেবে আছে যার বিশেষ খ্যাতি। তবে এসবকিছুর আড়ালে আছে তার ভিন্ন এক সত্ত্বা। আর তা হচ্ছে জনগণের জন্য দেয়া ত্রাণ নিয়ে মজুদ করা। আর সুযোগ বুঝে তা বেঁচে দিয়ে টাকা হাতিয়ে নেয়া।

একদমই সাদামাটা আর চেনাজানা একটা গল্প। তবে উপস্থাপনে ছিল ভিন্নতা। লেখকের লেখনশৈলী বেশ দক্ষতা আর পরিপক্বতার প্রমান দেয়। করোনার এই দিনগুলোতে এর চাইতে বাস্তবিক আর সামাজিক গল্প দ্বিতীয়টা হতে পারে না। একদমই লিনেয়ার গল্প হলেও খারাপ লাগেনি পড়তে।
কালিজিরা কাব্য ও একটি সরল সমীকরণ – আলী ওয়াহাব সৌহার্দ্য
জহির সোলায়মান সাদাসিধে একজন মানুষ। তবে খানিকটা পাগলাটে স্বভাব রয়ে গেছে তার রন্ধ্রে। কখন কি করেন তার ঠিক-ঠিকানা নাই। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের এক প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক গাণিতিক সমস্যার সমাধান নিয়ে চিন্তিত। তাদের মধ্যে আদৌ কি কোন সম্পর্ক আছে নাকি এটাও শুধুই একটা গল্প।

আলী ওয়াহাব সৌহার্দ্য খুব ভালো লিখেছেন। একটা গল্পকেই দুইটা প্যারালাল দৃষ্টিভঙ্গিতে লিনিয়ারভাবে বলে গেছেন বিরতি না দিয়েই। লেখার ধার আর ধাঁচ দুইটাই প্রবলভাবে লক্ষ্যনীয়। তবে ব্যক্তিগত মতে, লেখকের আরো চর্চার দরকার। গল্প আর লেখনী খুব সুন্দর হলেও গল্পের শুরুসহ কয়েক জায়গায় খাপছাড়া ভাব আছে। শব্দচয়নে দারুণ পারদর্শীতা দেখালেও কিছু বাক্যগঠনে অনন্যতার আশ্রয় নিতে গিয়ে কাঠিন্যতায় রূপান্তরিত হয়েছে – এমনটা মনে হয়েছে।
নিঃসঙ্গতার দিনে – সাঈদ শিহাব
ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে ধ্বংস এক নগরীর বাসিন্দা গল্পকথক। অত্র এলাকায় হয়তো কেবল হাতেগোণা কয়েকজন বেঁচে আছে যার মধ্যে গল্পকথক একজন। প্রতিদিন সূর্যের আলোয় একবার বাইরে বের হয় খাবারের সন্ধান আর বেলা থাকতেই ফিরে আসে নীড়ে। এক রাতে নিজের ঘরের জানালায় দাঁড়িয়ে একটা মানুষকে আত্যহত্মা করতে দেখে গল্পকথক। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে পরদিন গিয়ে কোথাও খুঁজে সেই লাশটা পাওয়া যায় না।

গল্পের নামকরণটা যেমন সুন্দর হয়েছে তেমনি উপস্থাপনটাও সুন্দর হয়েছে। যদিও হাইলি প্রেডিক্টেবল মনে হয়েছে তবুও পড়তে বিন্দুমাত্র মন্দ লাগেনি। বরং বেশ উপভোগ করেছি। সাঈদ শিহাবের লেখনশৈলী ভালো লেগেছে। খুব সূক্ষ্ম হাতে গুছিয়ে লেখার একটা প্রবণতা আছে এই লেখনশৈলীতে। কিছু টুকিটাকি বিষয় আছে তবে সেগুলো চর্চায় কেটে যাবে বলেই বিশ্বাস করি।
সলিতারিও – তানিয়া সুলতানা
প্রতিটি মানুষ জন্ম নেয়ার পরপর এই পৃথিবীর মানুষ আর পারিপার্শ্বিকতা তার কাঁধে অর্থ-বিত্ত অর্জনের একটি অদৃশ্য দায়িত্ব কিংবা বোঝা চাপিয়ে দেয়। কেউ সেই বোঝাটা বইতে বইতে নিজ থেকে হালকা করে নেয়, কারও হয় একদম উলটো। প্রচণ্ড লোভ তাদের বোঝাটাকে আরও ভারি করে তোলে।
জোভান্নি প্রায় সময়ই লক্ষ্য করে তার প্রতিবেশী লোকটা একা একা সময় কাটায় তারই মতো। সপ্তাহান্তের ছুটিতে দুজনের স্ত্রী বা প্রেমিকা বাপের বাড়ি চলে যায়। ফলে দুজনেই অদ্ভুত এক নিঃসঙ্গতায় ভোগে। একদিন দুজনের মধ্যে কথা হয়। কথাপ্রসঙ্গে নিজের স্ত্রীকে খুন করার ইচ্ছা প্রকাশ করে লোকটা জোভান্নির কাছে।

শুরুটা খানিকটা দুর্বল গতিসম্পন্ন মনে হয়েছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে গল্পটা যেন ক্রমশ ডালপালা মেলে নিজের পরিধি বাড়ালো। তানিয়া সুলতানার লেখনশৈলী খুবই চমৎকার। নিজের সঙ্গে নিজের দ্বন্দ্ব নাকি প্রতিবিম্ব! দারুণ লেগেছে গল্পটা।
এই গলিটা ভালো নয় – নজরুল ইসলাম
আফজাল একজন বর্গা চাষী। তবে মৌসুম কেটে গেলে ভ্যানে সবজি আর তরকারী বিক্রি করে সে। এমনই একদিন এক গলিতে ঢুকে পড়ে রয়ে যাওয়া সবজিগুলো বেচার আশায়। গলির মুখটা সবসময়ই বন্ধ থাকে তবে আজ কোনো কারণে খোলা আর গলির মুখে লেখা ‘এই গলিটা ভালো না।’ আফজাল এতকিছু খেয়াল করে না। ভ্যানে আর কয়টা সবজি আছে এগুলো বেচতে পারলেই তার শান্তি। সব বেচা শেষে যখন ফিরতি পথ ধরে তখন রাস্তা ভুলে সেই একই গলিতে ঘুরে ফিরে আসে বারবার।

খুবই সাধারণ একটা গল্প হলেও নজরুল ইসলামের ব্যতিক্রমী ভাবনার প্রতিফলন লক্ষ্য করা গেছে লেখনীতে। শব্দগত আর বাক্যগঠনগত কিছু ভুল নজরে পড়েছে। তবে একটা হরর গল্পকে বাস্তব সময়ের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ করে চমৎকার একটা গল্প উপহার দেয়ার জন্য লেখককে ধন্যবাদ।
দাঁড়কাক – ইশরাক অর্ণব
গ্রীক দেবতা অ্যাপোলোর সঙ্গী দাঁড়কাক যাকে দুর্ভাগ্যের প্রতীক বলা হয়; আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে কিংবদন্তি মোতাবেক সৌভাগ্যের প্রতীকও মানা হয়ে থাকে। আমাদের গল্পকথক দাঁড়কাকও তেমনই দুই ভাগ্য নিয়েই হাজির হয়েছেন গল্পে। তবে কথা হচ্ছে তিনি সৌভাগ্যের প্রতীক হবেন নাকি দুর্ভাগ্যের প্রতীক?

ইশরাক অর্ণব পুরোদস্তুর পাঠক হলেও সম্প্রতি সাহিত্য অঙ্গনে বিচরণ শুরু করেছেন অনুবাদ সাহিত্য দিয়ে। আর তারই সূত্র ধরে এই গল্পের সৃষ্টি। গল্পটা ভালো হয়েছে। দ্বিমুখী চরিত্রের উপস্থাপন গল্পকে আরো ভারী করেছে। বর্ণনাভঙ্গি সহজ আর প্রাঞ্জল রাখার চেষ্টা যে করেছেন তার ছাপ গল্পে স্পষ্ট বুঝা যায়। আর সফল হয়েছেন বিধায়ই গল্পটা ভালো লেগেছে। তবে ব্যক্তিগত দৃষ্টিকোণ থেকে অর্ণব যে প্রচুর বই পড়ে তার ছাপ তার লেখাতেও চলে এসেছে। নিজস্ব যে লেখার রীতি বা কৌশল সেটা খুব বেশী একটা প্রস্ফুটিত হতে পারেনি। ভবিষ্যতে ঠিক হয়ে যাবে আশা করি।
সহানুভূতি ক্যাফে – শাহেদ জামান
মানুষের অনেকগুলো বৈশিষ্ট্যের একটি হচ্ছে তাদের অপরিসীম কল্পনাশক্তি। এর বলেই তারা পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠ হতে পেরেছে। আরেকটি হচ্ছে তাদের বিশ্বাস করার ক্ষমতা। তারা নিজেদেরই সৃষ্টি কাল্পনিক কোনো ধারণাকে ধ্রুব সত্য বলে বিশ্বাস করতে পারে। যদিও সে ক্ষমতাও তাদের কল্পনাশক্তিরই একটি বহিঃপ্রকাশ।
ভবিষ্যত দুনিয়ায় প্রযুক্তি দারুণ উন্নতি হয়েছে। ক্যাফেগুলোতে কিউবিকল বসানো হয়েছে। তেমনই একটা ক্যাফেতে বসে আছে বিভু। সামনের মনিটরে আছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অহন। কথাপ্রসঙ্গে বিভু জানায় তার আত্মহত্যা করতে ইচ্ছা করছে। অহন বিভিন্নভাবে বিভুকে বোঝানোর চেষ্টা করে। কিন্তু বিভুর মাথায় যেন আত্মহত্যার ভূত চেপে বসেছে।

যখন থেকে বুদ্ধিমান মানুষের জন্ম, তখন থেকেই সে মৃত্যুকে ভয় পেয়ে এসেছে। আর সেই ভয় কাটানোর জন্য আশ্রয় নিয়েছে নানা রকম কাল্পনিক ধারণার। সেখান থেকে ক্রমে জন্ম হয়েছে বিভিন্ন ধর্মের, যেগুলোর বেশিরভাগ জুড়েই ছিল মৃত্যু পরবর্তী জীবনের নানা ঘটনা। মানব ইতিহাসের একটা দীর্ঘ সময় জুড়ে আছে ধর্মের রাজত্ব।
সমসাময়িক অনুবাদ জগতে শাহেদ জামানও বেশ পাঠকপ্রিয়। মৌলিকও লিখেছেন বটে। সহানুভূতি ক্যাফে গল্পটার মূল ম্যাসেজটা দুর্দান্ত। মানুষ সবকিছুকে জয় করতে পারলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে মানুষ সত্যিকার অর্থেই অসহায়। আর এতটুকুন একটা গল্পের বর্ণনায়ও লেখক বেশ ইন-ডেপথ কথাবার্তা নিয়ে আলাপ-আলোচনা করেছেন; ব্যাপারটা সত্যিই প্রশংসার দাবীদার। তবুও গল্পটাতে কি যেন নেই – এমনটা মনে হয়েছে পড়া শেষে। এর সঠিক কারণ অনুসন্ধান করিনি তাই বলতেও পারলাম না।
বিপদ যখন আসে – সুস্ময় সুমন
কায়সুল কবির একজন লেখক। একটা ছোটগল্প লিখতে চাচ্ছেন কিন্তু কি লিখবেন তা বুঝতে পারছেন না। এমনই উদ্ভ্রান্ত সময়ে চশমাও ফেললেন ভেঙ্গে। চোখে সব ঝাপসা দেখছেন। রান্নাঘরের কোনাটা থেকে খসখস আওয়াজ ভেসে আসছে। ঘরে কি তবে চোর ঢুকলো? বাতি নিয়ে উঠে সামনে আগানো মাত্রই পেছন থেকে মাথায় আঘাত করে কেউ। কে?

সুস্ময় সুমনের লেখা আসলেই খুন-খারাবি জনরার। নৃশংস বর্ণনা এই লোকটার হাতে ভালোই আসে। এই গল্পটাও তেমনই ধারার। ছোট পরিসরে বা বলা যায় সীমিত আকারের খুন-খারাবির গল্প এটা। প্রথমত গল্পটা অগাছালো মনে হয়েছে। আর দ্বিতীয়ত লেখকের বর্ণনাভঙ্গি একই ধারায় চলতে চলতে হঠাৎ করে বিচ্যুত হয় যেন। ব্যাপারটা চোখে লাগে আর কি।
অভিনব স্বাভাবিকত্ব – কিশোর পাশা ইমন
এই মরণঘাতী ভাইরাসে মৃত আর ধ্বংস হয়ে যাওয়া ঢাকা শহরের এক শূন্য ফ্লাইঅভারের উপর দাঁড়িয়ে আছে ডিলান। একটা বাইক এসে থামলো তার পাশে। বাইকার একজন মেয়ে, নাম নোভা, তাকে লিফট দিল। পথিমধ্যে তেল নেয়ার জন্য পাম্পে থামলো। গাড়িতে করে আসা একদল সন্ত্রাসীদের হাতে তুলে দিল ডিলানকে নোভা।

অ্যাপোক্যালেপ্টিক একটা গল্প। শুরুটা চমৎকার, এমনকি গল্পে দারুণ অ্যাকশনও আছে। আছে মানবজাতির করুণ পরিণতির ইতিহাস। তবে তাও গল্প পড়া শেষে খুশী হতে পারিনি। শুরুর উপস্থাপনের সঙ্গে শেষের উপস্থাপন খুব বেশি একটা মানানসই মনে হয়নি আমার কাছে। হঠাৎ করে থমকে গেল যেন। যদিও থমকে যাবার দরুণ নামের ভারটা লক্ষ্য করা যায়। তবে লেখকের যেন এটাকে বিশাল পরিসরে লেখার ইচ্ছা ছিল বলেই মনে হয়।
বাতিঘর – জাহিদ হোসেন
অনেক অনেককাল আগের কথা। মৎস্যজীবী এক পাহাড়ি জনপদের গল্প এটা। অ্যাংক্রা হচ্ছেন একজন ইফ্রি বা কবিরাজ। জনপদের সকলের জীয়নবাতি আছে তার কাছে। তবে সে ছাড়া আর কেউই এই ঘরের প্রবেশের অধিকার রাখে না। জনপদের এক ডানপিটে ছেলে ফুংক্রা। নিজের সন্তান না থাকায় ফুংক্রাকে বেশ পছন্দ করে অ্যাংক্রা। একদিন নিষিদ্ধ সেই বাতিঘরে প্রবেশ করে গেলে ফুংক্রা। তারপরই এক ঝড়ে দারুণভাবে আহত হয় ফুংক্রা।

এই লোকটা গল্প বলতে জানে। কি দারুণভাবে একজন পাঠককে মুহূর্তের মধ্যেই ডুবিয়ে দেয় অন্য কোন এক জগতে। এর চাইতে ভালো কোন কথা আপাতত খুঁজে পাচ্ছি না। অতি অল্প শব্দসংখ্যার মধ্যেও যেন বিশাল এক উপন্যাস পড়ে ফেললাম। গল্প, উপস্থাপন সবকিছুই দুর্দান্ত লেগেছে আমার কাছে। এমনকি গল্পের অন্তর্নিহিত ম্যাসেজটাও দারুণভাবে ভাবিয়ে তুলবে পাঠককে।
প্রহরি – কায়সার কবির
আকবর আলি খান সাবেক পুলিশ অফিসার। বর্তমানে নিজের মেয়ের সঙ্গে জীবনযাপন করছেন; সেই মেয়ে যাকে কোনোদিন পিতৃসুলভ মায়ায় কাছে ডেকে দুটো কথা বলারও সময় পান নি। বসে বসে তাই নিজের ব্যর্থতায় নিজেকেই দোষারোপ করেন। এক রাতে আচমকা নীচতলায় শব্দ পান ধস্তাধস্তির। বারান্দা দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখেন তার মেয়েকে নৃশংসভাবে খুন করতে যাচ্ছে এক খুনী। কি করবে সে?

কায়সার কবির আদতে একজন রেডিও জকি। তবে একজন পুরোদস্তুর বইপোকাও বটে। এই প্রথম কিছু লেখার চেষ্টা করলেন। অনুমেয় হলেও গল্প ভালো হয়েছে। আর উপস্থাপনও বেশ পরিপাটি। বর্ণনাভঙ্গি যতটা সহজ রাখা যায় ততটাই চেষ্টা করেছেন। তবুও লেখার অপরিপক্বতা চোখে পড়ে। যদিও প্রথম লেখা হিসেবে ছাড় দেয়াই যায়। ভবিষ্যতে চর্চার পরামর্শ রইলো।
রাত তিনটেয় – প্রিন্স আশরাফ
গল্পকথক একজন গাইনোকোলজিস্ট। একরাতে আচমকা প্রাইভেট নাম্বার থেকে ফোন আসে তার কাছে। কিন্তু ফোনটা আসে যার কাছ থেকে আদতে সে মৃত। কিন্তু তা কি করে সম্ভব?
হাইলি প্রেডিক্টেবল গল্প। কিছু বিষয় নিয়ে খটকাও আছে। যাক গে, লেখকের লেখনশৈলী প্রাঞ্জলই ছিল তবে গল্প সাজানোটা পরিপূর্ণ মনে হয়নি।
রুম নাম্বার তিন – নিয়াজ মেহেদী
এনায়েত সাহেব সরকারি চাকুরিজীবী। বদলি হয়ে এসেছেন এক সরকারি বাংলোয় থাকতে। কিন্তু এসেই প্রথম দিনে অদ্ভুত কিছু ভুতুড়ে কাণ্ডকারখানার সন্ধান পান।

নিয়াজ মেহেদীর লেখনশৈলী বেশ গঠিত আর পরিপক্ব। লেখনশৈলীতে এক ধরনের ভার আছে। পড়ে আরাম লাগে। গল্পটা শুরু থেকে ভালোই লাগছিল এর প্রাঞ্জলতা আর বর্নণাভঙ্গির জন্যে। কিন্তু শেষের পরিণতিটা ব্যক্তিগতভাবে ভিন্ন ধারার ভেবেছিলাম বলেই হয়তো ভালো লাগেনি। তবে পাঠকদের ভালো লাগবে বলেই আশা করি।
যাদুর শহর – নেওয়াজ নাবিদ
গল্পকথক আর তার বান্ধুবী একদিন বেশ রাত করে ফিরছিল বাসার দিকে। পথিমধ্যে রিকশাওয়ালার আচরণ খানিকটা খটকা লাগে গল্পকথকের। খানিক বাদেই টহলরত পুলিশের খপ্পরে পড়ে ওরা দুজন।

খুবই সিম্পল একটা ঘটনাকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখানোর চেষ্টা করেছেন লেখক। তবে গল্পটা আমার কাছে প্রেডিক্টেবল মনে হয়েছে। বাস্তবিক এমন ঘটনার স্বীকার হয়েছি বলেই কিনা কে জানে। যদিও লেখকের লেখনশৈলী আর উপস্থাপন ভালো লেগেছে। পাঠকের ভালো লাগবে গল্পটা।
অদ্ভুত আঁধার এক – জুবায়ের রুমেল
শানুর আজ মন খারাপ। শুধুই খারাপ না বরং তিরিক্ষি হয়ে আছে। রফিক স্যার ক্লাসে সবার সামনে কানে ধরিয়েছে। জেদ ধরে বসে থেকে সন্ধ্যা নামিয়েছে কখন টেরই পায়নি মেয়েটা। বাড়ি ফেরার পথে অদ্ভুত কিছু কান্ড ঘটতে থাকে ওর সাথে।

লেখকের বর্ণনার কৌশল কিছু কিছু জায়গায় খটমটে লাগলেও ভালো লেগেছে। চরিত্রের উপস্থাপন কিংবা গা-ছমছমের ভাবের ক্ষেত্রেও বর্ণনা ভালো ছিল। কিন্তু গল্পটা কেন যেন খাপছাড়া মনে হয়েছে। পরিপূর্ণভাবে গুছানো মনে হয়নি।
ক্লেশ – সুমিত শুভ্র
আজগর মৃধা এক আশ্চর্য স্যাটেলাইট আবিষ্কার করেছেন। এই স্যাটেলাইটের মাধ্যমে দুঃখী মানুষের সন্ধান পান তিনি। এক রাতে সেরকমই এক মানুষের সন্ধান পেয়ে ছুটে যান আজগর সাহেব।

সুমিত শুভ্রের গল্প বলার ধরন আর রীতি ভালো লেগেছে। গল্পটাও বেশ ভালো। বিশেষ করে দুঃখ ধরার স্যাটেলাইট পার্টটা। গল্প সাজানো আর গুছানো হলেও শেষে কেমন যেন অগাছালো মনে হয়েছে। এতটুকুনের মধ্যেও আরেকটু গুছিয়ে লেখা সম্ভব ছিল বলেই মনে হয়েছে।
এদিক দিয়ে কাউকে ঘোড়ায় চড়ে যেতে দেখেছেন? – নাবিল মুহতাসিম
গল্পকথক বাসা থেকে নেমে গলির মোড়ের চায়ের দোকানে এসেছেন। খানিক বাদেই এক পথচারী তার পাশে এসে দাঁড়িয়ে গল্প জমানোর চেষ্টা করে। কথায় কথায় লোকটা বলে ফেলে, খানিক আগেই এদিক দিয়ে কাউকে ঘোড়ায় চড়ে যেতে দেখেছে সে। কিন্তু লকডাউনের মধ্যে তা কি করে সম্ভব?

নাবিল মুহতাসিমের লেখনশৈলীতে এমন একটা ভাব আছে যার জন্য মনে হয়, লেখক একটা চেয়ার টেনে পাঠকের সামনে বসে গল্প শুনাচ্ছেন। চমৎকার একটা গল্প। দারুণ লেখনশৈলী, দারুন উপস্থাপন এমনকি বিবরণ ধারাও দারুণ। একটা সাধারণ চিন্তাধারাকে ভিন্নদৃষ্টিভঙ্গিতে এমনভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন যে, এই ক্ষেত্রে দ্বিতীয় কিছু বলার সুযোগ রাখেনি লেখক।
অবশেষে – রাইসুল আরেফিন
শুরুটা ভালো; মানে হচ্ছে হাবেফোবিয়া নিয়ে গল্পটা ঠিকই ছিল। তারপর লিনেয়ার ধারায় সেই পুরনো ধাঁচের একই গল্প। খুব বেশী ভালো লাগেনি। পড়ার জন্যই পড়া কেবল। বর্ণনাভঙ্গি আর উপস্থাপনেও তেমন ভিন্নতা নজরে আসেনি।
ছোট সামছু’র লকডাউন বৃত্তান্ত – শরীফুল হাসান
পেটের খিদের চেয়ে বড় আজাব পৃথিবীতে আর নাই।
ছোট সামছু এলাকার পাতি রংবাজ। ফাই-ফরমায়েশ কাজ করে পেট চালায়। কিন্তু করোনার এই লকডাউনে পেটে দানা পানি পড়াও বন্ধ হয়ে গেছে তার। এরকম সময়ে ছোট সামছু চুরি করার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু চুরি করতে গিয়ে ধরা খায় সামছু।

শরীফুল হাসানের লেখা নিয়ে নতুন করে কি আর বলার আছে। গল্পটা এক কথায় দুর্দান্ত। বর্ণনা আর উপস্থাপন এমনকি গল্পের আবহও বেশ দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক। গল্পের প্রথম ধাক্কাটা অপ্রত্যাশিত ছিল আর পরেরটা প্রত্যাশিত। তবুও বেশ উপভোগ করেছি গল্পটা।
শাহেদ আলীর ফ্যান্টম হাত – মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
একদিন আচমকা এক দুর্ঘটনার কবলে পড়ে শাহেদ আলী তার ডান হাতটা হারায়। কিন্তু এরপর থেকেই অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটতে থাকে শাহেদ আলীর সঙ্গে। এই যেমন দুই হাতের কাজ অবলীলায় করে ফেলার পর শাহেদ আলীর মনে পড়ে তার তো এক হাত নেই।

খুবই সিম্পল একটা গল্প কিন্তু তাও দুর্দান্ত লেগেছে এর উপস্থাপনের জন্য। বিশেষ করে মানুষের একটা অঙ্গ হারিয়ে গেলে তার মধ্যে যে সাইকোলজিক্যাল ব্যাপারগুলো ঘটে, সেগুলোর উপস্থাপন ভালো লেগেছে। অল্প কিছু বাক্যেও যে মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপারগুলোকে দারুণভাবে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব তাই বুঝিয়েছেন লেখক। চমৎকার উপভোগ্য একটা গল্প।
ছায়ার সওদা – সিদ্দিক আহমেদ
গল্পকথক ঘুম ভেঙে যায় শব্দে। উঠে দেখে কেউ একজন তার ঘরে বসে আছে। প্রথমে ভাবে হয়তো চোর এসেছে ঘরে কিন্তু লোকটা নিজেই বলে সে আসলে এসেছে ছায়া বিক্রি। সবার হয় একটা ছায়া কিন্তু লোকটার ছায়া আসলে দুইটা।

গল্পটা ভালো লেগেছে; যদিও শেষটা আমার কাছে প্রত্যাশিত ছিল। তবুও উপস্থাপন আর বর্ণনাভঙ্গি বেশ গোছানো আর উপভোগ্য। এমনকি গল্পের বর্ণনায় কয়েক জায়গায় লেখক আমাকে হাসিয়েছে পর্যন্ত। ভালো লেগেছে সিদ্দিক আহমেদের লেখা।
সময়ের মাত্রায় একজন সুন্দরম – যারিন তাসনিম প্রমি
আখতার নামক এক লোকের বাসায় বসে আছেন পুলিশ অফিসার প্রলয়। লোকটার ভাষ্যমতে সে কাউকে খুন করেছে আর তাই পুলিশকে ডেকে পাঠিয়েছে। প্রলয় আর প্রলয়ের সঙ্গে থাকা পুলিশরা সারাবাড়ি তন্ন তন্ন করে খুঁজেও কোথাও লাশ খুঁজে পেল না। আচমকাই লোকটা অস্বাভাবিক আচরণ করা শুরু করে।

গল্পের মূল প্লটটা খুবই দারুণ। যদিও গল্পের উপস্থাপন বা গোছানোতে অনেকখানি অপরিপক্বতা আর তাড়াহুড়া ভাব লক্ষ্যনীয়। আর সেজন্যেই মনে হয় এত সুন্দর গল্পটা খাপছাড়া মনে হয়েছে। তবে বিজ্ঞানের বিষয়গুলো ভালোভাবেই ফুটাতে পেরেছেন লেখক। শুভকামনা লেখকের জন্য।
মোক্ষম চাল – আমের আহমেদ
বিশ্বকে দুইভাগ করা দুই পরাশক্তির মধ্যে যুদ্ধ লেগেছে। রাশিয়া আর আমেরিকা নিজেদের ভয়ানক মারণাস্ত্রগুলো একে অপরের দিকে ছুঁড়ে মারছে। মানবজাতির ধ্বংস অনিবার্য।

গল্পটা ইন্টারেস্টিং তবে সেটা শেষটার কারণে। গল্পের প্লটটা দারুণ বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হলে পুরো পৃথিবী কিভাবে ভাগ হয়ে যাবে তারই একটা দূরদৃষ্টি সম্পন্ন গল্প। তবে গল্পের বর্ণনাভঙ্গি খুব বেশী নন-ফিকশনাল মনে হয়েছে। আর্টিকেল বা ফিচার টাইপ লেখায় সাধারণত এইভাবে ইতিহাসের তথ্য বর্ণনা করা হয়ে থাকে। বর্ণনাভঙ্গির কারণে উপস্থাপনটাও ভালো লাগি লাগি করেও লাগেনি।
অপরিচয় – সালমান হক
রাশেদ যুদ্ধফেরত এক মুক্তিযোদ্ধা। নিজেকে খুঁজে ফিরে সে এই নতুন দেশটাতে। নিজের সত্ত্বাটাকে বেমালুল হারিয়ে ফেলা এক যুবকের গল্প এটা।

সালমান হক। অনুবাদ সাহিত্যে নিজের জায়গা পাকাপোক্ত করেছেন অনেক আগেই। মৌলিক ঘরানার থ্রিলার সাহিত্য লিখেও পাঠকপ্রিয়তা কুড়িয়েছেন। গল্পটা খুবই সাধারণ একটা ধারণা নিয়ে লেখা। তবে লেখকের মুন্সিয়ানা হচ্ছে তার বর্ণনা। এই বর্ণনাভঙ্গি শুধুমাত্র সাবলীল আর প্রাঞ্জলই নয়। বরং কাব্যিক একটা ভাব আছে লেখনীর মধ্যে। যেই কারণে না বলা কথাগুলো খুব সুন্দরভাবে গল্পে মিশিয়ে দিতে পেরেছেন লেখক। গল্পে এক ধরণের বিষণ্ণতার সুরও টের পাওয়া যায়। মুরাকামির ইফেক্ট কিনা বলা যাচ্ছে না। তবে সাধারণ গল্পটাকেই এত সুন্দরভাবে উপস্থাপন করার জন্য লেখককে ধন্যবাদ।
আকিফো – সিহান নাইম
গল্পটা ইন্টারেস্টিং। দুইটা মানুষের প্যারালাল জীবনের ঘটনাগুলোকে এক সুতোয় গাঁথার চেষ্টা করেছেন লেখক। গল্পে এক তৃতীয়াংশ মোটামুটি ভালোই ছিল। তবে শেষের দিকটার বর্ণনাভঙ্গি বা উপস্থাপন অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে প্রথম দিকের তুলনায়।

যার জন্য পুরো গল্পটাকেই অসম্পূর্ণ মনে হয়েছে। শেষটা আরো গুছিয়ে লেখা যেত বলে মনে হয়েছে। তবে গল্পের উপমার ব্যবহার ভালো লেগেছে। লেখককে শুভকামনা।
একটা সিনেমা দেখবেন – ওয়াসিফ নূর
গল্পের প্লটটা বেশ ইন্টারেস্টিং তবে গল্পটা পরিপূর্ণতা পায়নি। মূল অংশের ব্যাখ্যা অনেকটাই ধোঁয়াশা রয়ে গিয়েছে। ব্যাখ্যাটা আরো গুছিয়ে লিখলে গল্পটা ব্যতিক্রম হতে পারতো।
এনিওয়ার্ম – অনন্যা নাজনীন
সাই ফাই গল্প। খুবই ইন্টারেস্টিং। গল্পের প্লটটা জোশ। এমনকি যেই ব্যাপারগুলোকে তুলে ধরা হয়েছে সেগুলোও ভালোই লেগেছে। একটা দূরদৃষ্টিসম্পন্ন গল্প বলা যেতে পারে।

বর্ণনাভঙ্গি আর উপস্থাপনও বেশ ভালো লেগেছে। কিন্তু কিছু ব্যাপারে কথা থাকলেও ব্যাপারগুলো সুন্দরভাবে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব। ভালো লেগেছে।
দোযখ – কাজী ঐশী
লেখক লুপ বা চক্রাকার ধারার একটা গল্প লিখতে চেয়েছিলেন হয়তো। তবে কোন এক অদ্ভুত কারণে গল্পটা অসম্পূর্ণ মনে হয়েছে। কেমন যেন খাপছাড়া ধরনের। আরো গুছিয়ে সুন্দর করে সাজিয়ে লেখার অপশন ছিল বলেই মনে হয়েছে।
হারানো বিজ্ঞপ্তি – তানযীলা তারাইয়্যান
গল্পটাকে প্রেডিক্টেবল ভেবে এড়িয়ে যেতে চেয়েও যাইনি। শুরু থেকে গল্পটা অনেকটা বেশী এলোমেলো আর অগাছালো ছিল। বর্ণনাভঙ্গি আর উপস্থাপনে বেশ অসংগতি চোখে পড়েছে। শুরু থেকে গল্পটাকে আরো বেশী গুরুত্বপূর্ণ করা উচিত ছিল।

তবে তাও গল্পের দ্বিতীয় ভাগ থেকে গল্পটা জমে উঠতে শুরু করেছিল। একটা দিক প্রেডিক্টেবল হলেও অন্য আরেকটা ব্যাপার একদমই অপ্রত্যাশিত ছিল।
মহামারী – মৌলি আখন্দ
গল্পটা একদমই সাদামাটা। বর্ণনাভঙ্গি আর উপস্থাপন নিয়েই তেমন করে কিছুই বলার নেই। ডাক্তারদের প্রতি সমাজের তাচ্ছিল্যতার ব্যাপারটা ভালো লেগেছে বিশেষ করে মহামারীর কালে।
মৃত্যু – তানজিল সা’দ
অনেকের ভালো লাগতে পারে তবে গল্পটাই মূলত আমার ভালো লাগেনি। অতিরিক্ত অতিপ্রাকৃত বলে মনে হয়েছে। উপস্থাপনও খুব বেশী ভালো লাগেনি। বর্ণনাভঙ্গি প্রাঞ্জল আর সাবলীল। চেষ্টা করলে লেখক আরো ভালো কিছু লিখতে পারবে বলে আশা রাখি।
উধাও – সালমান সাকিব জিসান
হাইলি প্রেডিক্টেবল। গতানুগতিক ধারার গল্প। উপস্থাপন বা গল্প সাজানোও একদমই সাদামাটা। লেখনশৈলী কিছু কিছু জায়গায় ভালো লেগেছে বটে।
ফিয়ার অব ডেথ – নওশের ডন
আমার কাছে গল্পটা খুব বেশি ভালো লাগেনি। মানে ফেসবুকে অহরহ এমন গল্প পড়া যায়। অনেকটা বিশ্বাস করেন রাসেল ভাই ধারার মনে হয়েছে গল্পটাকে। তবে লেখকের উপর এই কারণে ভরসা রাখছি যে লেখনশৈলী বেশ ভালো লেগেছে।
অস্তিত্বের বিষাক্ত লোবান – সালেহ আহমেদ মুবিন
নামে যতটা ভার পেয়েছি গল্পে ততটা গভীরতা পাইনি। গতানুগতিক ধারার গল্প। এরকম গল্প অহরহ পড়ে অভ্যস্ত। তবুও গল্পটা পড়ে অতটাও খারাপ লাগেনি।

গল্প বলার ঢঙ ভালো লেগেছে। লেখনশৈলীতে নিজস্বতা আর স্বকীয়তা বজায় ছিল। যদিও কিছু উপমার ব্যবহার অর্থহীন মনে হয়েছে। আর হ্যাঁ, বর্ণনাভঙ্গিও প্রাঞ্জল আর সাবলীল।
জীবে প্রেম – গোলাম কিবরিয়া
খুব বেশী সাদামাটা। অনু গল্পের মতো। গতানুগতিক ধারার প্লট আর বলার ঢঙও সেই একই রকম লেগেছে।
এই সংকলনের অনেককেই আমি চিনি না। অনেকের সঙ্গে ফেসবুকে যুক্ত আছি কিন্তু ব্যাক্তিগতভাবে জানাশোনা নেই। আবার অনেকের সঙ্গে বেশ ভালো খাতিরও আছে বটে। তবে এতকিছুর উর্ধ্বে আমি কেবল একজন পাঠক হবার চেষ্টা করেছি; যার জন্য আমার কাছে অমুকে কেবল একজন লেখক বাদে আর কিছুই ছিলেন না অন্তত এই রিভিউ লেখার সময়ে। তাই দয়া করে ভাববেন না কারো প্রতি স্বজনপ্রীতি আর কারো প্রতি দুর্জনপ্রীতি করেছি। রিভিউ দেয়ার সময় আমি আমার মেন্টরকে পর্যন্ত ছাড় দেইনি। তাই আমার লেখায় কেউ যদি সামান্যতম কষ্ট পেয়ে থাকেন তাহলে আন্তরিকভাবে ক্ষমা প্রার্থণা করছি।
