Crafting Ideas Into Impactful Content

মহাশ্বেতা দেবী: কলম যাঁর আমৃত্যু সঙ্গী

লেখাই একমাত্র কাজ যেটা করতে আমার কোন কষ্ট কিংবা ক্লান্তিবোধ হয় না। পেশায় আমি একজন লেখক– এইটাই আমার সবচাইতে বড় পরিচয়। লেখালেখির সমস্ত খুঁটিনাটি জেনেই লেখাকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলাম। জনপ্রিয়তা অর্জনের নিমিত্তে নয়।

মহাশ্বেতা দেবী

১৯৯৬ সালের ডিসেম্বর মাসের কথা। কলকাতার ‘হাজার চুরাশির মা’ খ্যাত মহাশ্বেতা দেবী আসলেন ঢাকায়। এসেই আড্ডায় বসলেন বাংলা সাহিত্যের স্বল্পপ্রজ শক্তিমান লেখক আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সাথে।

কথা প্রসঙ্গে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে বললেন,

“আমি ২০২৫ সাল পর্যন্ত বেঁচে থাকতে চাই।পরবর্তী প্রজন্মের একজন প্রত্যক্ষদর্শী হতে চাই। উপভোগ করতে চাই সময়ের এই পরিবর্তনটাকে। স্বচক্ষে দেখতে চাই কালের বিবর্তন।”

মহাশ্বেতা দেবী

মানুষের মুখের কথা মুখেই রয়ে যায় প্রকৃতির অমোঘ নিয়মের হেরফেরে। বছর ঘুরতেই আখতারুজ্জামান ইলিয়াস পরলোকগমন করলেন। কিন্তু তাই বলে কি মহাশ্বেতা দেবী থেমেছিলেন; না থেমেছিল তার লেখা? অরণ্যের অধিকার, হাজার চুরাশির মা, রুদালি, সংঘর্ষ দিয়ে এক বৈভব জীবনের যাত্রা করেছিলেন। সেই যাত্রাপথে অর্জন করেছেন সাহিত্য একাডেমি, পদ্মশ্রী, পদ্মবিভূষণ, ম্যাগসেসে, জ্ঞানপীঠ কিংবা বঙ্গবিভূষণ এর মতো উজ্জ্বল তারার; যে আলোয় নিজের পাশাপাশি বাংলা সাহিত্যকেও করেছেন আলোকিত।

কিন্তু একটাই আফসোস পরবর্তী প্রজন্মের একজন হতে পারলেন না তিনি। তার আগেই পরলোকের ডাক পড়েছিল তার। ২৮শে জুলাই ২০১৬ সালে তিনি চলে যান অন্য জগতে। কিন্তু হাজার চুরাশির মা যেন এখনো বেঁচেই আছে পাঠকদের মনে।

ভাবনার রঙিন জগতে ছিল যেই মানুষটার বিচরণ।

১৪ জানুয়ারি, ১৯২৬ সালে ব্রিটিশ-শাসিত অবিভক্ত বাংলাতে জন্ম নিয়েছিলেন মহীয়সী এই কথাসাহিত্যিক। ঢাকার আরমানিটোলার ১৫নং জিন্দাবাহার লেনের মামাবাড়িতে জন্ম নেন মহাশ্বেতা দেবী। ঢাকায় জন্মগ্রহন করলেও মহাশ্বেতা দেবীর আদি নিবাস পাবনা জেলার বেড়া উপজেলার (তৎকালীন মথুরা থানা) ভারেঙ্গা নামক এক গ্রাম। তবে সেই গ্রাম আজ কেবলই স্মৃতি বা অতীত ইতিহাস। কেননা, যমুনার করাল গ্রাসে হয়েছে তা বিস্মৃত।

বাবা মনীশ ঘটক তখন পঁচিশ বছর বয়সী আর মা ধরিত্রী দেবী আঠারো। বাবা মনীশ ঘটক ছিলেন প্রখ্যাত কবি এবং ঔপন্যাসিক। অবশ্য মা ধরিত্রী দেবীও কমবেশি লেখালেখির সাথেই যুক্ত ছিলেন তবে লেখালেখির চাইতে তার পড়াশুনার ব্যপ্তি ছিল বিস্তৃত। এছাড়া বাংলা সিনেমার অনন্য এক দিকপাল, এমনকি বাংলা সাহিত্যেও যার আছে অসংখ্য ছোটগল্পের সমাহার; সেই প্রখ্যাত চিত্র নির্মাতা ঋত্বিক ঘটক ছিলেন সম্পর্কে তার কাকা।

একজন মহাশ্বেতা দেবী

সাহিত্য চর্চা যে মহাশ্বেতা দেবীর রক্তের সাথে মিশে আছে তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। মহাশ্বেতা দেবীর প্রমাতামহ যাদবচন্দ্র চক্রবর্তী ছিলেন রাজা রামমোহন রায়ের জীবনীকার। এবং কেশবচন্দ্র সেন, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মতো মানুষজনদের সঙ্গে ছিল তার ঘনিষ্ঠ সম্পৃক্ততা। যাদবচন্দ্র চক্রবর্তীর মেয়ে অর্থাৎ মহাশ্বেতা দেবীর মাতামহী কিরণময়ীর ছিল বিশাল সংগ্রহের এক ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার। মাতামহীর কাছে কাটানো শৈশবকালের কারনেই হয়তো তার সাহিত্যপাঠ এবং উদার মানসিকতা প্রভাব ফেলেছিল মহাশ্বেতা দেবীর জীবনে।

শুধু কি তাই? কিরণময়ীর ছিল ইতিহাসের প্রতি এক বিশেষ ঝোঁক, যে জন্যে সংগ্রহশালায় ইতিহাসভিত্তিক এমনকি সব জেলার ইতিহাস বিষয়ক বইগুলো ছিল। পরবর্তী জীবনে মহাশ্বেতা দেবীর ইতিহাসপ্রেমি হবার এটাও একটা কারণ অবশ্য। শৈশবে দাদীমার কাছেই শুনেছেন রূপকথা ছাড়াও ডেভিড কপারফিল্ড ও অলিভার টুইস্টের গল্প। গল্প শোনার সেই ঝোঁকটা পরবর্তী জীবনে নিজেকেই গল্প লিখতে বাধ্য করেছিল মহাশ্বেতা দেবীর জীবনে।

‘ইকনোমিক অ্যান্ড পলিটিক্যাল উইকলি’ নামক এক নাম করা পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা এবং সম্পাদক ছিলেন শচীন চৌধুরী; যিনি সম্পর্কে মহাশ্বেতার দেবীর বড়মামা ছিলেন।কবি অমিয় চক্রবর্তী ছিলেন সম্পর্কে তার মামা। এমন এক পরিবারের সন্তান হয়ে লেখালেখিতে যুক্ত না হলেই বরং অবাক হবার ব্যাপারটা কাজ করতো। কিন্তু সে সুযোগ আর কোথায় দিলেন মহাশ্বেতা দেবী। নিজেকে ছাড়িয়ে গেছেন নিজেরই করা সাহিত্য কর্মে। আর তাই তো হয়েছেন কালোত্তীর্ণদের একজন।

বার্ধক্য ঝাপটে ধরলেও কলম থামেনি তার।

বাবারা সব ভাইবোন যেমন ঠিক তেমনি আমার সব ভাইবোনরাও জন্মসূত্রেই কিছু ইশ্বরপ্রদত্ত উপহার নিয়ে জন্মেছিলাম। ছবি আঁকার হাত, গানের গলা বা অভিনয় ক্ষমতা আর সাহিত্য চর্চা; আমাদেরকে এসব আলাদা করে শিখতে হয়নি। তবে কি জানেন তো, উত্তরাধিকারলব্ধ সম্পত্তি দিয়ে অন্তত শিল্প-সাহিত্য চর্চা সম্ভব নয়। তাই নিজেদের ইচ্ছায় এবং নিরন্তর চেষ্টায় সেটাকে বাড়িয়ে উপযুক্ত করতে হয়েছিল আমাদের। তাই বলতে পারেন, লিখতে লিখতেই কেমন করে যেন লেখক হয়ে গেলাম আমি।

মহাশ্বেতা দেবী

নয় ভাইবোনের মধ্যে সবার বড় ছিলেন মহাশ্বেতা দেবী। সহজাত প্রবৃত্তিতে এরা সবাইই কমবেশি শিল্প-সাহিত্য প্রবণতা সম্পন্ন হলেও মহাশ্বেতা দেবীই কেবল পেয়েছেন সাহিত্যিকের খ্যাতি। মাত্র চার বছর বয়সেই ঢাকার ইডেন মন্টেসরি স্কুলে ভর্তি করানো হয় মহাশ্বেতা দেবীকে। বাবার চাকরির সূত্রে স্কুলে নিয়মিত হতে পারেননি কখনোই।  তবে তাই বলে তার পড়াশোনাতে ছেদ পড়েনি বিন্দুমাত্রও।

১৯৩৬ সালে শান্তিনিকেতনে ভর্তি করানো হয় মহাশ্বেতা দেবীকে। সপ্তম শ্রেনীতে বাংলার শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। পরবর্তীতে বন্ধুসম কাকা ঋত্বিক ঘটকের সান্নিধ্যে ইংরেজি সাহিত্যে মনোযোগী হয়ে উঠেন তিনি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছেলেবেলা সম্পর্কিত একটা লেখা লিখেছিলেন তিনি যা ১৯৪০ সালে রংমশাল পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এটিই ছিল তার প্রথম প্রকাশিত লেখা।

সেই সময়কালে মহাশ্বেতা দেবী।

শান্তিনিকেতন থেকে ইংরেজিতে অনার্সসহ বিএ পাশ করে চলে আসেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজিতেই এমএ করতে। দেশবিভাগের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কবলে পরে লেখাপড়া স্থগিত হয়ে যায় তখন। পরবর্তীতে বিভিন্ন কাজে যুক্ত হয়ে গেলেও দুই দশক পর এমএ পাশ করেন মহাশ্বেতা দেবী।

এরিমধ্যে দেশবিভাগের প্রাক্কালে প্রখ্যাত নাট্যকার ও সাহিত্যিক বিজন ভট্টাচার্যের সঙ্গে পারিবারিকভাবে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন মহাশ্বেতা দেবী। বিজন ভট্টাচার্য ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির একজন সদস্য যার জন্য অর্থনৈতিক কোন কাজেকর্মে তার সম্পৃক্ততা ছিল না। মহাশ্বেতা দেবী তাই দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছিলেন পদ্মপুকুর ইনস্টিটিউটে শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে।

হাজার চুরাশির সেই মা – মহাশ্বেতা দেবী।

জীবিকার তাগিদে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পেশার সাথে যুক্ত হতে হয়েছে তাকে। স্বামী কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য বলে চাকরিতে ঢুকেও খুব বেশিদিন স্থায়ী হতে পারেননি তিনি। কেননা, নানান সময়ই পুলিশি ঝামেলার কারণে তাকে চাকরিচ্যুত হতে হয়েছে। এমনকি মহাশ্বেতা দেবীর মতো মানুষকেও সংসার চালানোর দাঁয়ে বাড়ি-বাড়ি ঘুরে কাপড় কাচার সাবান বিক্রি করতে হয়েছে। আর এরসাথে টিউশনি তো ছিলই।

এরিমধ্যে আরেক প্রখ্যাত সাহিত্যিকের জন্ম হয় তারই গর্ভে। নবারুণ ভট্টাচার্যের আগমন যেন মহাশ্বেতা দেবীর জীবন সংগ্রামকে আরো বেশি কঠিন করে তোলে। ১৯৫৭ সালে রমেশ মিত্র বালিকা বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সুযোগ পেলে অস্থির জীবনে যেন খানিকটা স্বস্তি আসে। এরই সুবাদে ১৯৬৩ সালে এমএ পাশ করলে পরের বছরই বিজয়গড় জ্যোতিষ রায় কলেজে ইংরেজির অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন।

বিজন ভট্টাচার্য, মহাশ্বেতা দেবী এবং নবারুণ ভট্টাচার্যের দুর্লভ একটি ছবি।

জীবনের এই উত্থান-পতন, বিচিত্র কর্মজীবন, নানান ধরনের মানুষদের সাক্ষাত, দারিদ্র্যতার কষাঘাত, দেশবিভাগের যন্ত্রণাদায়ক স্মৃতি; এসবই মহাশ্বেতা দেবীকে ধীরে ধীরে ঋদ্ধ করেছে। এই ভাবনার খোরাকগুলোকে হারাতে না দিয়ে নিদারুণ দারিদ্যতার মধ্যেও চালিয়ে গেছেন সাহিত্য রচনার কাজ। শ্রীসুমিত্রা দেবী বা শ্রীমতি সুমিত্রা দেবী এবং সুমিত্রা দেবী ছদ্মনামে তিনি অসংখ্য গল্প লিখেছেন ‘সচিত্র ভারত’ নামক পত্রিকায়। পরবর্তীতে মহাশ্বেতা দেবী নামে ‘দেশ’ পত্রিকাতে গল্প ছাপানো শুরু করলে সাহিত্য জগতে নিজের সুখ্যাতি বাড়াতে শুরু করেন তিনি।

উত্থান-পতনের আরেকটা অংশ ছিল বিজন ভট্টাচার্যের সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনাটা। ১২/১৩ বছরের নবারুণ ভট্টাচার্যকে ফেলে চলে আসতে হয়েছিল তাকে। অতিরিক্ত ঘুমের ঔষধ খেয়ে আত্মহত্যার প্রচেষ্টাও করেছেন। হয়তো বেদনা ভুলতেই আবারো বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন অসিত গুপ্তের সঙ্গে। কিন্তু বিধিবাম! দুবছর কাটতে না কাটতেই আবারো বিচ্ছেদ। পরবর্তী নিঃসঙ্গ জীবনে কাজ ছাড়া আর কাউকেই সঙ্গী করার কথা ভাবেননি মহাশ্বেতা দেবী। তবে হ্যাঁ কাজের পাশাপাশি সঙ্গী করেছিলেন নিম্নবিত্ত, নিপীড়িত আর অবহেলিত জনগোষ্ঠীকে।

হাজার চুরাশির মা বইয়ের প্রচ্ছদ।

ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত ইতিহাস-আশ্রিত আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘ঝাঁসির রাণী’ তাকে খ্যাতি এনে দেয়। ১৯৫৬ সালে তার প্রথম উপন্যাস ‘নটী’ এর পটভূমি প্রকাশিত হয়। যেটার পটভূমি রচিত হয়েছিল ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ নিয়ে। এরপর পালাক্রমে উপন্যাস অমৃত সঞ্চয়ন, গল্প চম্পা এবং আঠারো শতকের বর্গি আক্রমনকে উপজীব্য করে লেখেন আঁধার মানিক

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বাদেও মধ্যবিত্ত আর সামাজিক জীবনকেও তুলে এনেছিলেন মধুরে মধুরে, এতটুকু আশা, তিমির লগন, তারার আঁধার, লায়লী আসমানের তারা নামক উপন্যাসগুলোতে।

লেখালেখিতে বুঁদ হয়ে থাকাটাই যেন তার জীবনের লক্ষ্য ছিল।

তবে পরবর্তীকালে কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যু, হাজার চুরাশির মা এবং অরণ্যের অধিকার তার সাহিত্যিক হিসেবে অবস্থানকে এক অনন্য উচ্চতা আর শক্ত অবস্থানে নিয়ে যায়।

সাহিত্য কীর্তির জন্য অসংখ্য পুরষ্কারে সম্মানিত হয়েছেন মহাশ্বেতা দেবী। ১৯৭৯ সালে সাহিত্যের জন্য ভারতের সম্মানসূচক পুরষ্কার সাহিত্য একাডেমি পান অরণ্যের অধিকার উপন্যাসটির জন্যে। পরে পদ্মশ্রী, পদ্মবিভূষণ, রামন ম্যাগসাইসাই, বঙ্গবিভূষণ সহ আরও একাধিক পুরষ্কার। ভারতে সাহিত্যিকদের জন্যে দেয়া শ্রেষ্ঠ সম্মান জ্ঞানপীঠ পান ১৯৯৬ সালে। তবে পুরষ্কার কখনোই এতটাও আনন্দ দিতে পারেনি মহাশ্বেতা দেবীকে, যতটা দিতো মানুষের ভালোবাসা। তাই পুরষ্কারের তেমন কোন যত্ন না হলেও আদিবাসী বা নিম্নবিত্ত মানুষদের দেয়া কোন উপহার থাকতো অত্যন্ত যত্নে।

আফ্রিকান নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার হাত থেকে জ্ঞানপীঠ পুরষ্কার গ্রহণ করছেন মহাশ্বেতা দেবী।

আমি লিখেছি একটা উচ্চবিত্ত ঘরেরই নারীর কথা; হাজার চুরাশির মা লেখার পর কত মা আমাকে বলেছেন যে, এ তো আমার ছেলের গল্প। আপনি লিখলেন কী করে! তার মানে এই অভিজ্ঞতা অনেকেরই, তখন কিন্তু কলকাতাতেই বেশি দেখেছি, পশ্চিমবাংলায় অন্যত্রও হয়েছে। কীভাবে ছেলেরা নিহত হয়েছে। এবং বহু ছেলের নাম, ছেলে না হয়ে নম্বর হয়ে গিয়েছিল। এই এক, দুই, তিন-চার করে আসছে যখন এখানে পৌঁছাবে তখন, আপনার ছেলের নাম হয়ত এখানে আছে। এটা আমি শুনেছিলাম। সুজাতা নামটা এরকম যে-কোন উচ্চবিত্ত ঘরের নারী, মানে মায়ের কথা। মানুষটা আর মানুষ থাকে না, নম্বর হয়ে যায়। ওতো নম্বর হয়ে গিয়েছিল। নম্বর এলেই বলতে পারবো তার কী হয়েছে।

মহাশ্বেতা দেবী

নিজের জীবনের এত উত্থান-পতন ছিল বলেই সারাজীবন কাজ করেছেন মানুষের অধিকার রক্ষায়। আর এই জন্যই মহাশ্বেতার দেবীর রাজনৈতিক সচেতনতাও ছিল প্রবল। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকায় ছিলেন মহাশ্বেতা দেবী । মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়েরও কাছাকাছি এসেছেনে এই আন্দোলনের মধ্য দিয়েই।

মহাশ্বেতা দেবী এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

তবে তাদের সম্পর্কটা ছিল একটু ভিন্ন রকমের; কখনো তা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে প্রকাশ পেয়েছে, কখনো তা বন্ধুসুলভ বড়বোনে প্রকাশ পেয়েছে কিংবা কখনো তা অভিভাবকের ছন্দে কথা বলেছে। আমৃত্যু মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলেছেন। কিন্তু কখনো কোন দলের তকমা নিজের গায়ে মাখান নি। তাই হয়তো তার পরলোকগমনে শোকাহত হয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপ্যাধ্যায় বলেছেন,

ভারত এক মহান লেখিকাকে হারাল, বাংলা এক মহান মাকে হারাল। আমি এক জন ব্যক্তিগত পথপ্রদর্শক, একজন অভিভাবককে হারালাম। শান্তিতে থাকুন মহাশ্বেতা দি।

সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি সামাজিক কাজকর্মের নজির খুঁজে পাওয়া দুষ্কর ছিল বলেই হয়তো সেটা একদমই নেইতে পর্যবসিত হলো। যেই কলম ছিল তার প্রতিবাদের ভাষা অবশেষে তাও থেমে গেল একদিন। চলে গেলেন অজানার উদ্দেশে; থেমে গেল তার লড়াই। কিন্তু মরে গিয়েও যেন বেঁচে রইলেন এই মহীয়সী সাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবী।

জীবনের একদম অন্তিম মুহূর্তগুলোও তার কলমকে থামাতে পারেনি।

এই মহীয়সী কথাসাহিত্যিকের জন্মদিনে রোদসী ম্যাগাজিনের পক্ষ থেকে রইলো অনন্ত শ্রদ্ধা, সম্মান আর ভালোবাসা।

সূত্র: বিবিসি বাংলা, আনন্দবাজার পত্রিকা, কালি ও কলম এবং সাহস অনলাইন পত্রিকা।
ছবিসূত্র: হিন্দুস্তানটাইমস এবং অনলাইন হতে সংগ্রহীত।  
বিঃ দ্রঃ লেখাটি রোদসী ম্যাগাজিনের অনলাইন সংস্করণের জন্য লেখা হয়েছিল।

Share this
Facebook
Twitter
LinkedIn

Related Posts

রিভিউ

পনম্যান: সামাজিক রীতিনীতির যাঁতাকলে পিষ্ট এক থ্রিলার গল্প

গল্পের ভাঁজে একেকটা কর্মকান্ডে উঠে এসেছে কখনো সমাজব্যবস্থার নড়বড়ে কাঠামো, কখনো সমাজের নৈতিকতার যাতাকলে পিষ্ট মানুষদের অসহায়ত্ব, কখনো ব্যক্তিত্বের নৈতিকতার সীমাবদ্ধতা, অথবা কখনো অর্থনৈতিক অসাম্যের মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে যে বিষ ছড়ায় তার বাস্তব দৃশ্যময়তা।

দ্য ফ্রগ: হয়েও হলো না একটি পারফেক্ট ক্রাইম থ্রিলার

নেটফ্লিক্সের নতুন কোরিয়ান থ্রিলার সিরিজ দ্য ফ্রগের প্রত্যেকটা এপিসোডের শুরুতে এই ডায়ালগটা শুনতে পাবেন। কোরিয়ান ভাষায় সিরিজটার নাম অনেকটা এমন – In the forest where no one’s around. কিন্তু তাহলে নামটা ফ্রগ হলো কেন?