Crafting Ideas Into Impactful Content

হার না মানা অন্ধকার: প্রকৃতির অন্ধকার জগতের এক ভিন্ন গল্প

অদ্ভুত আঁঁধার এক এসেছে এ-পৃথিবীতে আজ,
যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দ্যাখে তারা।

জীবনানন্দ দাস

কবি জীবনানন্দ দাস উক্তিটিতে ‘আঁধার’ উপমাটিকে হীন অর্থে ব্যবহার করেছেন তা বলার দরকার পড়ে না। শুধু জীবনানন্দ দাস নয় বরং শিল্পসাহিত্যে বিভিন্ন ভাবেই আঁধারকে খারাপ চোখে দেখাটা, বলতে গেলে স্বাভাবিক প্রবণতাই। উপরোক্ত উক্তিতে কথাটার মূল প্রসঙ্গ হচ্ছে আঁধার। 

সেই আঁধার সাধারণ হোক আর অসাধারণই হোক সেটার গুরুত্ব যে অপরিসীম তা বলাই বাহুল্য। এমনকি কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দেয়ার উপায় নেই; কেননা বিজ্ঞান এখানে এসে একমত পোষণ করে। আঁধারের যেমন সৌন্দর্য আছে তেমনি আছে এর কুৎসিত রূপ। প্রকৃতির নৈসর্গিক সৌন্দর্যের কাছে যেরকম আমাদের মানব মন হার মানে; ঠিক তেমনি প্রকৃতির অন্ধকারাচ্ছন্ন আর ব্যাখাতীত কিছু ব্যাপার আছে যেখানে মানব বুদ্ধি, যুক্তি আর বিজ্ঞানকেও হার মানতে হয়। প্রকৃতির ভারসাম্য বলা যায় যাকে। 

হরর মানেই ভূত-প্রেত কিংবা রাক্ষস-ডাইনীবুড়ির গল্প ব্যাপারটা ভাবা ভুল। হরর বলতে বুঝায় ভীতিকর কিছু। ভূতের বিবরণ পড়েই আপনার ভয় পেতে হবে এমনটা নয়। দেখা যায় অনেক গল্পেই কোন ভূত-প্রেতের উপস্থিতিই নেই তবুও গল্পটা কেমন করে যেন ভয়ের হয়ে উঠে। অথচ আমাদের দেশে এখনো সেই পিশাচের লেজ ধরে ঘুরঘুর করার ব্যাপারটাই রয়ে গেছে। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে মিশ্র ধারায় হররের ব্যাপ্তি কিছুটা হলে বেড়েছে। কাল্ট/ইতিহাস নির্ভর ডার্ক ফিকশন, এক্সপেরিমেন্টাল হরর, লাভক্র্যাফটিয়ান হরর, পজেশন মিস্ট্রি অসংখ্য বই ইতিমধ্যেই আমরা পড়েছি। 

সেরকমই একটা অতিপ্রাকৃত ধারার বই হচ্ছে বাপ্পী খান রচিত হার না মানা অন্ধকার। বাতিঘর থেকে ২০১৯ সালের বইমেলায় প্রকাশ হয়েছে বইটি। বাতিঘরের বইয়ের পৃষ্ঠা, বাঁধাই নিয়ে নতুন করে তেমন কিছুই বলার নেই। তবে প্রচ্ছদটার কথা বলা যায়। যেটা খানিকটা হলেও ভিন্নতা লক্ষ্য করা গেছে। যার পূর্ণ কৃতিত্ব প্রচ্ছদশিল্পী রাজুর। 

© Wazedur Rahman Wazed

মানুষের জীবনে ভেদাভেদগুলো কিভাবে তৈরি হয় জানেন? আমিই বলছি, আপনারা মিলিয়ে নিতে পারেন। লিঙ্গ, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, দেশ, সমাজ, দল কিংবা নীতি-এইতো? কিন্তু এসবের বাইরেও মতান্তরের আরেকটি ক্ষেত্র রয়েছে। আর সে বিভেদটা-আলো এবং অন্ধকারের। 

বাপ্পী খান

রফিক শিকদার। অতিপ্রাকৃত কোন শক্তি যে তার পিছু নিয়েছে সেটা সে তখনো বুঝতে উঠতে পারেনি, যখন বাবা-মাকে সাপে কেটেছিল। তবে পিছু নিলে কি হবে? কি করে যেন সব ঝামেলা থেকেই মুক্তি পেয়ে যেত রফিক শিকদার। হয়তো তা কামেল পীর দাদার নামকরণে নাম বলে; কিংবা হয়তো দাদার থেকে পাওয়া তাবিজের বলে। ঠিক তেমনি এতিম হওয়া মাত্রই কোথা থেকে যেন বাবার এক সৎ ভাই এসে রফিক শিকদারকে ঢাকা নিয়ে যায়।

পরিবার, মাথার উপর ছাদ, পড়ালেখাসহ জাগতিক সকল সুযোগ সুবিধাই জুটে যায় রফিক শিকদারের কপালে। এতসব সুযোগ সুবিধার মধ্যেও অতিপ্রাকৃত শক্তিটা যেন প্রবল চৌম্বক আর্কষণে টানতে থাকে রফিক শিকদারকে। আর সে সুবাদেই ‘সাপ্তাহিক সুপ্রভাত’ নামে এক পত্রিকায় লিখে ফেলেন ‘দেও’ নামক এক অতিপ্রাকৃত গল্প। যদিও সেটা আদৌ কোন গল্প ছিল না; কেননা সেই ঘটনার সাক্ষী ছিল রফিক শিকদার নিজেই। 

সেই থেকেই অতিপ্রাকৃত বিষয়গুলোর প্রতি ঝোঁকটা যেন আরো প্রবল হয়ে উঠে রফিক শিকদারের। চাচা আরিফ শিকদারের মৃত্যুতে ‘সত্যপ্রকাশ’ নামক ট্যাবলয়েড পত্রিকার দায়িত্বের ভারও রফিক শিকদারেরই কাঁধে পড়ে। আর ঠিক সেই সময় প্রাক্তন বন্ধু বিখ্যাত ফটোগ্রাফার ‘জিকো’র ফোন আসে তার কাছে। জিকোর থেকে জানা যায়, সাত বছর আগে সত্যপ্রকাশের এক অ্যাসাইনমেন্টে সিলেটে গিয়ে এক অতিপ্রাকৃত ঘটনার সাক্ষী হয়েছিল সে। সেখানে এক ঘন জঙ্গলের ভিতর ঝর্নার ধারে এক অপদেবতার অভিশাপই তার জীবনে ফলতে শুরু করেছে। আর গুগলের যুগে চটকদার খবর না পেয়ে রফিক শিকদার নির্ভর হয়ে পড়ে অতিপ্রাকৃত ঘরানার সিরিজ লেখাতে যার মধ্যে জিকোর গল্পটাও অন্তর্ভুক্ত। 

© Wazedur Rahman Wazed

আর সেই সুবাদেই অনেক আগে শোনা একটা অতিপ্রাকৃত গল্পের সন্ধানে রফিক শিকদার ছুটে যায় পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার পাহাড়ি অঞ্চলে। যাত্রাপথে দেখা হয় হেম্মাজ ফকিরের সাথে। যে কিনা এক দেবীর অভিশাপে দশ বছর আগে থেকে অন্ধ জীবনযাপন করছে।

শুধু তাই নয়, পার্বত্য চট্টগ্রামের এক দুর্গম অঞ্চলে ভূমিকম্পের ফলে মাটি থেকে উদ্ভূত এক অদ্ভুতদর্শন পাথরের সন্ধানও পায় রফিক শিকদার। তবে এই অনুসন্ধান যে রফিক শিকদারের প্রাণ কেড়ে নিতে পারে তা কি জানে রফিক শিকদার? 

কি হয় শেষমেশ? ‘দেও’ গল্পে এমন কি ঘটনা ঘটেছিল যা রফিক শিকদারের জীবন পালটে দিয়েছিল? জিকোরই সাথেই বা কি হয়েছিল? সেই অপদেবতা জিকোকে এমন কি অভিশাপ দিয়েছিল যার জন্য ওর জীবন বিপন্ন? পার্বত্য চট্টগ্রামের সেই গল্পটাইবা কি ছিল? আর হেম্মাজ ফকির আর তার অন্ধত্বের গল্প? এসবের মাঝে কি আর অন্য কোন গল্প আছে? 

বাপ্পী খান। মিডিয়া এবং মিউজিক অঙ্গনে পদচারণার পাশাপাশি থ্রিলার সাহিত্যেও তার আনাগোনা। বই পড়ার নেশা থেকে শখের বশে লেখালেখির শুরুর। বাতিঘর প্রকাশনীর থৃলার গল্প সংকলনের পাশাপাশি বেশ কিছু সংকলনে তার লেখা প্রকাশ পেয়েছে। ২০১৮ এর বইমেলায় তার প্রথম বই নিশাচর প্রকাশ পায়। তার দ্বিতীয় বই একা প্রকাশ পায় কলকাতার অরণ্যমন প্রকাশনী থেকে। হার না মানা অন্ধকার তার তৃতীয় গ্রন্থ। গেল বছর মেলাতেই এসেছিল এই বইটির সিকুয়েল ঘিরে থাকা অন্ধকার। সামনে হয়তো ত্রিলোজির তৃতীয় আর শেষ বইটিও চলে আসবে।

Image Source: facebook.com/bpchayashorir

পাঁচটা বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে একত্রিত করে মূল গল্পের প্লট সাজিয়েছেন লেখক। পাঁচটা গল্প ভিন্নধারার; একটার সাথে আরেকটার তেমন কোন সংযোগই নেই। তবে আদতে একটা সংযোগ আছে আর সেটা হচ্ছে- আলোর পেছনের আঁধার। প্রত্যেকটা গল্পেই আঁধারের রূপ ফুটে ওঠেছে। বিশেষ করে, জিকোর অপদেবতা আর হেম্মাজ ফকিরের দেবীর গল্পটা।

এই দুইটা গল্প বিশেষভাবে উল্লেখ করেই বলতে হয়। লেখকের সার্থকতা এটাই যে, পাঁচটা বিচ্ছিন্ন আঁধারের গল্প বর্ণনা করেও সবগুলোকে এক সুতোয় বাঁধতে পেরেছেন। আর এর পাশাপাশি পাঠককে ধোঁয়াশায় রাখার ব্যাপারটিও। কেননা, প্রথমত গল্প কোথায় যাচ্ছে সেটা বুঝা মুশকিল আবার একই সাথে গল্পের শেষটাও ধোঁয়াশা। সমাপ্তি আছে ঠিকই। কিন্তু হইয়্যাও হইলো না শেষ টাইপ আর কি। তবে হ্যাঁ, সিরিজ যে হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

পাঠকের দৃষ্টিকোণ থেকে সংগতির পাশাপাশি অসংগতিগুলো তুলে না ধরলে অবিচার করা হয়। বর্ণনাভঙ্গি সুন্দর আর সাবলীল হলেও কিছু কিছু জায়গায় অসামঞ্জস্য লেগেছে। বানান ভুলের ব্যাপারটাও চোখে লেগেছে। ‘র’ আর ‘ড়’ এর পার্থক্য তো লক্ষ্যনীয়। গল্পের প্লটগুলো দুর্দান্ত কিন্তু ক্লাইম্যাক্সে খানিকটা ঘাটতি লক্ষ্য করেছি যার জন্য কিছুটা বিক্ষিপ্তও মনে হয়েছে।

সর্বসাকুল্যে একটা উদাহরণ দিলে হয়তো ব্যাপারটা পরিষ্কারভাবে বুঝাতে পারবো। ধরুন, স্বাস্থ্য ভালো কেউ একজন শরীরের মেদ কমানোর আশায় প্রতিনিয়ত ব্যায়াম করছে। ইতিমধ্যেই অনেকখানি মেদ কমিয়ে ফেলেছে শরীর থেকে। দেখতে সুঠাম হলেও খানিকটা মেদ এখনো কাটানো বাকি। হয়তো সেগুলোও কাটিয়ে ফেলবে। বাপ্পী খানের লেখাটা ঠিক ঐ শরীরটার মতোই। অনেক পরিণত হয়েছে এবং সামনে আরো হবে। কেননা, লেখায় উন্নতির অনেক জায়গা আছে। 

© Wazedur Rahman Wazed

তবুও এমন নয় যে লেখা পড়া যায় না বা অন্য কিছু। আমি কেবল এটাই বুঝাতে চেয়েছি যে, বর্ণনাভঙ্গি যথেষ্ট প্রাঞ্জল আর সাবলীল থাকলেও উন্নতির অনেক জায়গা আছে বলে মনে হয়েছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বর্ণনায় লেখক কোন ধরনের কৃপনতা দেখাননি।

গল্প তৈরি, চরিত্র গঠন, গল্পের ধারা অব্যাহত রাখা এবং সবশেষে পরিণতিতে নিজের স্বতন্ত্রতা বজায় রাখা- এসব ক্ষেত্রেই বাপ্পী খান নিজের আগের দুটো বইকে টপকে নিজের জায়গা নিজেই তৈরি করে নিয়েছেন। আশা করি, ভবিষ্যতে এই ধারা অব্যাহত থাকলে আরো ভালো কিছু পাওয়া যাবে। 

বই: হার না মানা অন্ধকার
লেখক: বাপ্পী খান
প্রকাশনী: বাতিঘর
প্রচ্ছদ: রাজু
পৃষ্ঠা: ১০৯
মুদ্রিত মূল্য: ১৫০/- টাকা মাত্র

Share this
Facebook
Twitter
LinkedIn

Related Posts

রিভিউ

পনম্যান: সামাজিক রীতিনীতির যাঁতাকলে পিষ্ট এক থ্রিলার গল্প

গল্পের ভাঁজে একেকটা কর্মকান্ডে উঠে এসেছে কখনো সমাজব্যবস্থার নড়বড়ে কাঠামো, কখনো সমাজের নৈতিকতার যাতাকলে পিষ্ট মানুষদের অসহায়ত্ব, কখনো ব্যক্তিত্বের নৈতিকতার সীমাবদ্ধতা, অথবা কখনো অর্থনৈতিক অসাম্যের মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে যে বিষ ছড়ায় তার বাস্তব দৃশ্যময়তা।

দ্য ফ্রগ: হয়েও হলো না একটি পারফেক্ট ক্রাইম থ্রিলার

নেটফ্লিক্সের নতুন কোরিয়ান থ্রিলার সিরিজ দ্য ফ্রগের প্রত্যেকটা এপিসোডের শুরুতে এই ডায়ালগটা শুনতে পাবেন। কোরিয়ান ভাষায় সিরিজটার নাম অনেকটা এমন – In the forest where no one’s around. কিন্তু তাহলে নামটা ফ্রগ হলো কেন?