Crafting Ideas Into Impactful Content

ডিফেন্ডিং জ্যাকব: অ্যাপেল প্লাসের ক্রাইম থ্রিলার মিনি সিরিজ

Our memories are often less reliable than we think, particularly in moments of stress.

ম্যাসাচুসেটসের কাউন্টির সাজানো গুছানো একদম ছিমছাম শহরটার নাম নিউটন। এই শহরেরই বাসিন্দা অ্যান্ডি বারবার। স্ত্রী লরি আর ছেলে জ্যাকবকে নিয়ে তার সুখের সংসার। অ্যান্ডি পেশায় নিউটন শহরতলীর অ্যাসিসট্যান্ট ডিসট্রিক্ট অ্যান্টর্নি। বিগত বিশ বছর ধরে এই পেশায় থেকে নিজের একটা শক্ত অবস্থান গড়ে ফেলেছেন অ্যান্ডি।

শহরের প্রতিটা মানুষ অ্যান্ডি আর তার পরিবারকে যথেষ্ট সম্মান আর শ্রদ্ধাও করে এজন্যে। একদিন শহরের আবাসিক পার্কে ১৪ বছর বয়সী একটা ছেলের লাশ পাওয়া যায়। কেসটার দায়িত্ব পায় অ্যান্ডি বারবার। আরো জানা যায় খুন হওয়া ছেলেটি আসলে তার নিজের ছেলে জ্যাকবের সহপাঠী।

প্রাথমিক তদন্তে বেরিয়ে আসে লিওনার্দ পেটজ নামক এক পেডোফাইলের নাম। যে আগেই এই ধরণের ঘৃণিত কাজের জন্য সাজাপ্রাপ্ত। কিন্তু তার বিরুদ্ধে তেমন কোনো প্রমাণ না পাওয়ায় তাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় পুলিশ। এরিমধ্যে একদিন জ্যাকবের ঘরে একটা চাকু আবিষ্কার করে অ্যান্ডি। একইসঙ্গে খুন হওয়া ছেলেটার জামায় জ্যাকবের হাতের ছাপ পায় ফরেনসিক ল্যাব। ধীরে ধীরে জ্যাকবের বিরুদ্ধে যেতে শুরু করে সকল প্রমাণাদি।

Image Source: imdb.com

অ্যান্ডিকে চাকরি থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। লরিকেও তার অফিস থেকে মানা করে। এমনকি বন্ধ হয়ে যায় জ্যাকবের স্কুল যাতায়াত। অ্যান্ডির সাজানো সুখের সংসার ভাঙ্গতে শুরু করে। শহরতলীর সবাই অ্যান্ডি আর তার পরিবারকে দোষী সাব্যস্ত করে ফেলে ইতিমধ্যেই।

একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এলে জ্যাকবকেই দোষী মেনে নেয় পুরো সমাজ। অ্যান্ডি আর লরি দুজনই দ্বিধায় পড়ে যায় – তাহলে কি তারা তাদের ছেলেকে এতদিনেও চিনতে পারেনি। নাকি জ্যাকবের ছোটবেলার সেই ঘটনাটা লুকিয়ে রেখে লরি কোনো ভুল করেছিল? নাকি অ্যান্ডির অতীত ইতিহাস এর সঙ্গে যুক্ত? নাকি জ্যাকব নিজেই রাগের বশবর্তী হয়ে সহপাঠীকে খুনটা করে ফেলেছে?

Image Source: imdb.com

সত্য ঘটনা অবলম্বনে না হলেও সেইরকমই একটা ঘটনার ছায়া অবলম্বনে তৈরি হয়েছে ডিফেন্ডিং জ্যাকব। একই শিরোনামে উইলিয়াম ল্যান্ডায় এর উপন্যাস অবলম্বনেই সিরিজটি নির্মিত হয়েছে। অ্যাপল টিভি প্লাসের জন্য সিরিজটি লিখেছেন মার্ক বোম্ব্যাক। যিনি ইতিমধ্যেই আনস্টপেবল, উল্ভারিন, টোটাল রিকল এবং ডউন অফ দ্য প্ল্যানেট অ্যাপিসের মতো জনপ্রিয় মুভির স্ক্রিপ্ট লিখেছেন। পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন মরটেন টিলডাম – প্যাসেঞ্জার্স এবং দ্য ইমিটেশন গেম এর নির্মাতা। সিনেমাটোগ্রাফির কথাও বিশেষ করে বলতে হয় যে দায়িত্বে ছিলেন গেম অফ থ্রোনসের সিনেমাটোগ্রাফার জোনাথন ফ্রিম্যান

অ্যান্ডি বারবার চরিত্রে ছিলেন ক্যাপ্টেন আমেরিকা খ্যাত ক্রিস ইভান্স। লরি চরিত্রে ছিলেন মিশেল ডকরি এবং তাদের ছেলে জ্যাকব চরিত্রে ছিল স্টিফেন কিংয়ের গল্প অবলম্বনে নির্মিত আইটি মুভি খ্যাত জ্যাডেন মার্টেল। এছাড়াও আরো তিনটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে ছিলেন চেরি জোন্স, আমেরিকান গডস সিরিজের ম্যাড সুইনি খ্যাত পাবলো শ্রাইবার এবং হুইপলাশ খ্যাত জে.কে. সিমন্স।

Image Source: tumbler.com

ক্রিস ইভান্সের অভিনয় নিয়ে কি তেমন কিছু বলার দরকার আছে? তাও বলতে হয়। ক্রিস ইভান্স একজন সম্মানিত ডিসট্রিক্ট অ্যান্টর্নি যে বিগত বছরগুলোতে যেই কেসেই হাত দিয়েছেন তাই সফল হয়েছে। শুধু অফিসই নয় বরং পুরো শহরের সকল মানুষ অ্যান্ডিকে বিশ্বাস করে, ভরসা করে অ্যান্ডির উপর। আর সেই অ্যান্ডির ছেলেই কিনা সহপাঠী খুনের অভিযোগে অভিযুক্ত। এই যে বিশ্বাস ভঙ্গের মানসিক চাপ, এই যে কলিগদের কাছে ছোট হয়ে যাওয়ার ক্ষোভ, এই যে প্রতিবেশীদের তাচ্ছিল্যতা শিকার অ্যান্ডি – এইসব বিষয়গুলো যেন ক্রিস ইভান্সের জন্য আরো পরিপূর্ণতা পেয়েছে।

একজন বাবা হয়ে নিজের ছেলের প্রতি অটল বিশ্বাস; ছেলেকে শাসন করা; চরম স্ট্রেসের দিনেও স্ত্রীকে শান্ত রাখা – কোনোকিছুই যেন ছাড় দেয়নি ক্রিস। এমনকি দরকারের সময় নিজের অতীতকেও ভুলে থাকা কিংবা সমস্ত বাঁধাকে অতিক্রম করে নিজের পরিবারকে রক্ষা – অ্যান্ডি বারবার চরিত্রটাই যেন ছিল ক্রিস ইভান্সের জন্য। দুর্দান্ত আর অসাধারণ অভিনয়।

Image Source: imdb.com

লরি চরিত্রে থাকা মিশেল ডকরিও মোটেই নিজের অভিনয় দক্ষতাকে তুলে ধরতে পিছপা হননি। স্বামী আর ছেলেকে নিয়ে সুখের সংসার লরির। পরিবারের জন্য নিজের সবটা উজাড় করে দেয় লরি। ছেলে অভিযুক্ত হলে চাকরি হারায় কিন্তু মা আর স্ত্রীর দায়িত্বে অটল থাকা এক নারীর চরিত্রে ছিলেন ডকরি। শুধুমাত্র যে নিজের ছেলের প্রতি মমত্ববোধ তা নয়; খুন হয়ে যাওয়া ছেলেটার মায়ের হাহাকারও যেন ফুটে উঠেছে লরির অভিব্যক্তিতে।

ধীরে ধীরে সত্য যত ছড়াতে শুরু করে লরি চরিত্রটাও যেন দ্বিধাগ্রস্ত হতে শুরু করে। স্বামীর অতীত, ছেলের অতীত, ছেলের বর্তমান অভিব্যক্তি – সব মিলিয়ে একজন মায়ের যে মানসিক চাপ তা একদম একুরেট আর পারফেক্ট ছিল মিশেল ডকরির অভিনয় দক্ষতার কল্যাণে।

Image Source: nerdsandbeyond.com

জ্যাকবের চরিত্রে থাকা জ্যাডেন মার্টেলও দারুণ অভিনয় করেছে। সিরিজের শুরু থেকেই একদম শেষ অবধি স্ক্রিনে রহস্য আটকে রাখার জন্য জ্যাকবের চরিত্রটা কতটা গুরুত্বপূণ ছিল তা না দেখলে বুঝা যাবে না। বিশেষ করে, জ্যাকবের এমন অদ্ভুত অভিব্যক্তিসম্পন্ন আচরণ।

একটা ১৪ বছরের ছেলের উপর দিয়ে খুনের অভিযোগের কারণে কি ধরণের মানসিক যন্ত্রণা যায় তা যেন ফুটিয়ে তুলেছেন মার্টেল। আর মার্টেলের আইনজীবীর চরিত্রে থাকা জোয়ানা মানে চেরি জোন্সের অভিনয় ছিল একদমই প্রাণবন্ত আর দারুণ। এছাড়া পাবলো স্রিবার আর জে.কে. সিমন্স এবং বাদবাকি সবার অভিনয়ও দারুণ লেগেছে।

গল্পটা একদমই সাদামাটা হলেও নির্মাণ উপস্থাপনা ছিল দারুণ। খুব সুন্দরভাবে স্ক্রিপ্টটা সাজানো হয়েছে। বেশ গুরুগম্ভীর আর মার্জিত উপস্থাপন। শুরু থেকেই ভালো লাগা কাজ করে যার জন্য। সিনেমাটোগ্রাফি দুর্দান্ত লেগেছে। নির্মাণ নিয়ে বলার কিছু নেই। প্রতিটা এপিসোড দেখেছি আর বলেছি অ্যাপেল টিভি প্লাস নির্মাণের পেছনেই অঢেল টাকা, মেধা আর শ্রম ঢেলেছে।

আর তা সত্যি কিনা আপনি নিজেও টের পাবেন সিরিজ দেখলে। নির্মাণ আসলেই দারুণ আর দুর্দান্ত লেগেছে। ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরিং নিয়ে সবসময়ই কথা বলি। এবারো বলবো ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরিংয়ের কারণেই সিরিজটা আরো বেশী রহস্যপূর্ণ আর দুর্দান্ত লেগেছে।

Image Source: imdb.com

হ্যাঁ, এই সিরিজ দেখে স্লোবার্ন বলবে এমন লোকের সংখ্যা নেহায়েত কম হবে না। এমনকি ৪/৫ যে কোনো একটা এপিসোডের কাহিনী একদম ঝুলে গিয়েছিল। এমনও মনে হতে পারে সিরিজে দুইটা এপিসোড না হলেও এমন কোনো ক্ষতি হতো না। তবুও স্লোবার্ন হোক আর টেনেটুনে লম্বাই করাই হোক – ব্যাপারটা সুক্ষ্ম আর গভীরভাবে গল্পের গহীনে ডুবে সাহায্য করেছে।

গল্পের প্রতিটা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশ দর্শকের সামনে তুলে ধরাই যেন ছিল চিত্রনাট্যকার আর পরিচালকের অন্যতম দায়িত্ব। একটা ভুল বোঝাবুঝির কারণেও সমাজে একটা পরিবারকে কি ধরণের যন্ত্রণা সহ্য করতে তাও দেখাতে বাদ রাখেনি লেখক। অন্যে দেখে ফেলবে এই ভয়ে সাতসকালে দোকানে গিয়ে বাজার করা; বাড়ির বাইরে বের হলেই প্রতিবেশীর কটূক্তি।

আমাদের সমাজের চিরাচরিত চেনা রূপের প্রতিফলন খুব ভালোভাবেই ফুটে উঠেছে। সবকিছু মিলিয়ে কোনো কিছুরই অভাববোধ করিনি পুরো সিরিজ জুড়ে। যার জন্য বাধ্য হয়ে বলতে হচ্ছে – একটা পারফেক্ট মিস্ট্রি ক্রাইম থ্রিলার মিনি সিরিজ। যারা বাংলা সাব খুঁজেন তাদের জন্যও সুখবর; কারণ ইতিমধ্যেই কুদরতে জাহান জিনিয়া এবং সাঈম শামস দুজনেই এই সিরিজটির অনুবাদ করেছেন কয়েকটা পর্ব।

Image Source: impaward.com

আরেকটা বিষয়ে দর্শকের আক্ষেপ থাকতে পারে বা বলা যেতে পারে অনেকেই হয়তো শেষটা মেনে নিতে পারবে না। সিরিজের শেষটা দেখে অন্তত আমি সন্তুষ্ট। মূল বইটা পড়া হয়নি তবে অনলাইনে লস আঞ্জেলস টাইমস আর হলিউড রিপোর্টার পত্রিকা দুটি থেকে প্রকশিত দুটি আর্টিকেল পড়লাম; যেখানে বই আর সিরিজের শেষটা নিয়ে তুলনামূলক আলোচনা করা হয়েছে। সাত নাম্বার এপিসোড পর্যন্ত সবই ঠিকঠাক আছে তবে শেষটাতে বই আর সিরিজে ভালোই তফাত আছে। সিরিজের শেষে যেমন কোনো কিছুই খোলাসা করা হয়নি; বরং পুরোটাই দর্শকের উপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে; বইতে আসলে তেমনটা না।

বইতে স্পষ্ট করে দেয়া হয়েছে শেষটাতে। স্পয়লারের ভয়ে বলা যাচ্ছে না। তবে আপনি সিরিজ দেখা শেষ করে উপরে দেয়া হাইপারলিংক দুটো পড়ে নিলেই বুঝতে পারবেন। সিরিজের শেষটা দেখে কেবল একটা কথাই বলতে ইচ্ছে হয়েছে – পরিবারের জন্য একজন বাবা বা একজন স্বামী সব করতে প্রস্তুত থাকে সর্বদা; হোক তা কোনো অপরাধ কিংবা কোনো অতীত ইতিহাস। আর বইটার শেষে হয়তো বলতাম – নিজের ছেলের ভবিষ্যতের জন্য একজন মা কি করতে পারে তা কল্পনাতীত।

Share this
Facebook
Twitter
LinkedIn

Related Posts

রিভিউ

পনম্যান: সামাজিক রীতিনীতির যাঁতাকলে পিষ্ট এক থ্রিলার গল্প

গল্পের ভাঁজে একেকটা কর্মকান্ডে উঠে এসেছে কখনো সমাজব্যবস্থার নড়বড়ে কাঠামো, কখনো সমাজের নৈতিকতার যাতাকলে পিষ্ট মানুষদের অসহায়ত্ব, কখনো ব্যক্তিত্বের নৈতিকতার সীমাবদ্ধতা, অথবা কখনো অর্থনৈতিক অসাম্যের মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে যে বিষ ছড়ায় তার বাস্তব দৃশ্যময়তা।

দ্য ফ্রগ: হয়েও হলো না একটি পারফেক্ট ক্রাইম থ্রিলার

নেটফ্লিক্সের নতুন কোরিয়ান থ্রিলার সিরিজ দ্য ফ্রগের প্রত্যেকটা এপিসোডের শুরুতে এই ডায়ালগটা শুনতে পাবেন। কোরিয়ান ভাষায় সিরিজটার নাম অনেকটা এমন – In the forest where no one’s around. কিন্তু তাহলে নামটা ফ্রগ হলো কেন?