খুব আশা আর ভরসা নিয়ে দেখতে বসেছিলাম অসুর এবং দেখা শেষে অসুরের বধ না হলেও আমার সময় বধ হয়েছে এবং আশায় নিরাশার পানি ঢেলে দিয়েছে কেউ। ভুটের এই ওয়েব সিরিজ এতটাও ভালো লাগেনি আমার কাছে যতটা মানুষ বলেছে। এভারেজ একটা ওয়েব সিরিজ হিসেবে মেনে নিচ্ছি। রেটিং করলে ৫০% এর বেশি দিতে পারবো না। আর হ্যাঁ, রিভিউতে স্পয়লার আছে; আপনি দেখে না থাকলে দয়া করে পড়বেন না।
একটা বাচ্চা ছেলে জন্ম নেয়ার পর থেকেই নিজেকে অসুর ভাবতে শুরু করে। আর তার এই প্যাথেটিক সাইকোলজিটা তৈরি করে তারই পিতা। ছেলেটা আর ৮/১০টা ছেলের থেকে আলাদা হয়। পিতার সেই খেদোক্তিগুলো নিজের মধ্যে ধারণ করতে করতে একসময় নিজেকে অসুর ভাবা শুরু করে ছেলেটা। হয়ে ওঠে এক নৃশংস সাইকোপ্যাথ কিলার। দুর্ধর্ষ এই সাইকোপ্যাথ কিলারকে ধরতেই মরিয়া সিবিআই। আর গল্প মূলত এইটাই। কনসেপ্ট দারুণ তা নিঃসন্দেহেই বলে দেয়া যায়। তাহলে ঝামেলা কিসে? চলেন মূল ঝামেলায় ফেরত যাই।
প্রথম পর্বেই যেটা চোখে লাগছে সেটা হলো – ক্রাইম সিনে থাকা একটা গাড়ির গেট খুলতে যায় ধনঞ্জয় হাতে গ্লাভস পড়ে; কিন্তু কোন এক কারণে গাড়িতে আগুন লেগে গেলেই আমরা তাকে গ্লাভসবিহীন অবস্থায় ফিরে পাই – কন্টিনিটি ব্রেক! অ্যাসিসটেন্ট ডিরেক্টরগুলো কি করতেছিল তখন? যাক গে, বারে বারে শেহেরোমে এইসি ছোটি ছোটি বাত হোতি রেহতি হ্যায় – ব্যাপারটা মেনে নিয়ে গল্পে আগাই।

গল্প কিছুদূর আগাতেই প্রথম প্লটহোল চোখে লাগে। গেজ করতে পারি খুনি বা খুনির সাথে কানেক্টেড কাউকে। এত বড় প্লটহোলও এড়ায়া গেলাম ভালো লেভেলের কোন টুইস্টের আশায়। আর সেই টুইস্টে এতটাই অবাক হলাম যে বোকা*দা হয়ে গেলাম।
জিন্দেগিতে ভাই কখনো দেখিও নাই, শুনিও নাই বা পড়িও নাই যে, একজন ফরেনসিক এক্সপার্ট কেউ এমন দুর্ধর্ষ কোন ক্রাইম কেস লিড করে। জ্বি না, পরিস্থিতির স্বীকারেও এমনটা আমি ভাবতে পারি না। যে সিভিল সার্জন সেই আবার গোয়েন্দা। কি আমি গাঁজা খায়া সিরিজ দেখতে বসছি নাকি চিত্রনাট্যকার গাঁজা খায়া লিখছে আর পরিচালক তা টানতে টানতে বানাইছে।
যেখানে সিবিআইতে ব্যাকগ্রাউন্ড চেক না করেই একজন মানুষকে চাকরি দিয়ে দেয়া হয়েছে, সেখানে কেমনে আশা করি যে ফরেনসিকই ডিটেক্টিভ না। সম্ভব ফিকশনে সবই সম্ভব। আর হ্যাকিং দেখে কমেডি ফিল আসছিল কেন বুঝি নাই আসলেই। আরও ইন্টারেস্টিং বিষয় হচ্ছে খুনি কিন্তু নিজেরে ধরা খাওয়ানোর জন্য ব্যাগে করে প্রমান নিয়ে ঘুরে এমনকি যখন পুরা সিবিআই টিম তাকে খুঁজছে এমন মোমেন্টেও; যাতে যে কেউ বুঝতে পারে ইনিই খুনি।
আর রাসুলের সঙ্গে থাকা চুতিয়া লোকটার আসলে কপালে মরণ ছিল; অন্তত পরিচালকের স্বার্থে এমনটাই বলতে বাধ্য হলাম। অবশ্য দ্বিতীয় সিজনে গিয়ে তারা কাহিনীর মোড় ঘুরাতে এবং প্লটহোল বুঝতে পেরে দর্শকদের বলবে – আমরা আসলে যাকে অসুর ভেবেছি সে অসুর নয়!

গল্পে কয়েক বছর আগে পরের দৃশ্য আছে কিন্তু কোন ধরণের মেকাপের সহায়তা নেয়া হয় নাই। একটা বাচ্চা ছেলে এক দশকেরও বেশি সময়ে বড় হয়ে গেল অথচ তারা একই রকম রয়ে গেল। এত এত প্লটহোল? আর নিখিল চরিত্রের অভিনয় দেখে বুঝাই যায় যে, লোকটা অভিনয় করছে। হ্যাঁ কেবল অভিনয় করছে সেইটা বোধ হয়েছে।
একজন সাধারণ মানুষ যদি বিপদে ১০% উপস্থিত বুদ্ধিসম্পন্ন হয়; তাহলে একজন পুলিশ অফিসার থাকবে কমপক্ষে ৩০% আর একজন ডিটেক্টিভ হবে ধরলাম ৫০%। অথচ আশেপাশে পুলিশকে মরতে দেখেও নিখিল বলদ নিখিল হয়েই দাঁড়িয়ে ছিল। বেসিক্যালি কবরস্থানের সিনটা কি ছিল? পরিচালক বি লাইক – আমি যা বলছি তাই করবা; আমার বুঝেই করতে হবে তা গাঁজাখুরি হলেও চলবে। মানে আমাদের মতি মিয়ার মতো আমাকে স্যার ডাকবা টাইপ।
চলেন কিছু পজিটিভ দিক নিয়া কথা বলি। আবারও বলছি কনসেপ্ট দুর্দান্ত। কিন্তু ঐ যে, এত এত প্লটহোল নিয়ে জাতি কি করিবে অনি সেন? অসুরের বিল্ডাপ আর সাইকোলজিক্যাল থট ভালো ছিল। এইখানে অসুরের ব্যাপক ভয়াবহতার রূপ ফুটে উঠেছে। আর বাচ্চা ছেলেটার অভিনয় দেখে সত্যিই মুগ্ধ হয়েছি। আরসাদের অভিনয় ভালো ছিল। গল্পের ব্যাকগ্রাউন্ড দারুণ ভালো লেগেছে। এই গল্প লিখতে যে ব্যাপক পড়াশুনা আর রিসার্চের প্রয়োজন তা বুঝাই যায় গল্পে।

তবে এই সিরিজের সবচেয়ে বড় ফল্ট বাজেট মনে হয়েছে আমার কাছে। বাজেট কম ছিল বলে অতি শর্টকার্টে অনেক কিছু দেখাতে যেয়ে গোঁজামিল দিতে হয়েছে। ফিনিশিংয়ে তো পুরাটাই গোঁজামিল। যাক বাজেট ভালো হলে নিশ্চয়ই অনেক ভালো লেভেলের আউটপুট দেয়া সম্ভব ছিল। তবে চেষ্টা করেছে ভিন্ন কিছু করার এই ব্যাপারটা সত্যিই বাহবার দাবীদার। গতানুগতিক চিন্তাধারা থেকে বের হতে পারাটাই অনেক বড় ক্রেডিট। আর এই কারণেই আপনাকে রিকমান্ড করছি দেখুন সিরিজটা।
আমার চোখে যেইসব ভুল ধরা পড়ছে সেইগুলাই লিখছি। আপনার আর আমার দেখা আর বুঝার মধ্যে ভিন্নতা আছে। আপনার কাছে এইটা মাস্টারপিস মনে হলেও আমার মনে হয় নাই। আবার আপনার কাছে যেইটা গার্বেজ সেইটা আমার কাছে মাস্টারপিস লাগতেই পারে ব্যাপার না।
Feature Image: imdb.com
