এই শহরে অনুভূতিহীন মহারাজারা দুই ধরনের। প্রথমত- পল্টি মানুষ। তারা কথার ফুলঝুড়ি ছড়ায়। বক্তৃতা দেয়। মালপানি ঢালে। ভোট নেয়। দ্বিতীয়ত- অস্ত্র-ছোরাবাজ। টাকাকড়ি নেয়। জীবন নেয় না। কিন্তু সময় জীবন নেয়, টাকা দেয়। উভয় দলই গুণ্ডা। শুধু পার্থক্য হলো তাদের ধরনধারণে। – গুলজার
শনিবার, ১৮ আগস্ট ১৯৩৪ সাল। তৎকালীন বৃটিশ-ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের ঝিলাম জেলায় (বর্তমান পাকিস্তান) মাখন সিং কালরা এবং সুজান কাউরের ঘর আলোকিত করে জন্ম নেয় এক শিশুপুত্র। সাম্পুরান সিং কালরা নাম পায় বাচ্চাটি। আচমকা তাসের ঘরের মতো তছনছ হয়ে যায় শিশুটির দুনিয়া। অল্প বয়সেই মাতাকে হারান। তারপর হারান দেশমাতাকে। এক ভূখণ্ড দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে নিজেদের আলাদা জাতি, গোত্র আর দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
ভাগ্যান্বেষণে মুম্বাই (তৎকালীন বোম্বে) শহরে পা রাখেন। দুবেলা দুমুঠো খাবারের আশায় কাজ নেন গাড়ির মেকানিক হিসেবে। কিন্তু কবিতার প্রতি ভালোবাসাও লালন করতে থাকেন সযত্নে গোপনে। আলী আকবর খান আর রবি শংকরের কোনো সঙ্গীতানুষ্ঠান বাদ দিতেন না। দেশভাগ পরবর্তী তীব্র বেকারত্ব এবং ট্রেড ইউনিয়নের আন্দোলন তাকে দারুণভাবে আলোড়িত করে।
সলিল চৌধুরী, শৈলেন্দ্র, সৈয়দ জাফরী এবং বলরাজ সাহানীর মতো স্বনামধন্য মানুষের সান্নিধ্য পেয়ে লেখালেখি শুরু করেন। এরপরের গল্পটা ছিল দিন বদলের। ভারতীয় শিল্প-সাহিত্য এবং চলচ্চিত্র অঙ্গনে পরিচিত, সমাদৃত এবং স্বনামধন্য বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী হিসেবে নিজের নাম আজীবনের জন্য স্থায়ী করে নেন। সাম্পুরান সিং কালরা নামক সেই লোককে আমরা না চিনলেও গুলজারকে কমবেশী সকলেই চিনি।

আমি মনে করি, ভারতীয় ছোটগল্প হলো আঁকাবাকা এবং উঁচু-নিচু পাহাড়ী পথে হাঁটার মতো। হাঁটতে হাঁটতে একসময় ঘুরে দাঁড়ালে দেখা যাবে আকাশ। – গুলজার
গুলজারের কবিতা বা লিরিক দুইটার সাথেই আগে থেকেই পরিচিত। তবে এই ভদ্রলোক যে এত ভালো আর দুর্দান্ত সব গল্প লিখেছেন তা সত্যিকার অর্থেই জানা ছিল না। একাধারে কবি, ছোটগল্প লেখক, শিশু সাহিত্যিক, ঔপন্যাসিক, অনুবাদক, গীতিকার, চলচ্চিত্র নির্মাতা, চিত্রনাট্য রচয়িতা, অঙ্কন শিল্পী এবং অধ্যাপক ছিলেন তিনি। একইসাথে বহু ভাষাবিদ বলে খ্যাতিও আছে তার। বাক্যের বুনন, শব্দচয়ন আর তার সঠিক ব্যবহার; এবং পাঠককে সম্মোহিত করে রাখার অলৌকিক দক্ষতার জন্য অনেকেই তাকে ‘শব্দের মোজার্ট’ বা ‘মাস্টার ওয়ার্ডস্মিথ’ অথবা ‘শব্দ-কারিগর’ খেতাবও দিয়েছেন।
ইংরেজিতে অনূদিত গুলজারের গল্প নিয়ে ‘রাভি পার এন্ড আদার স্টোরিজ’ এবং ‘হাফ এ রুপি স্টোরিজ’ শিরোনামে দুটি গল্প সংকলন আছে। ‘রাভি পার এন্ড আদার স্টোরিজ’ থেকে চারটি গল্প নিয়ে ‘সীমা এন্ড আদার স্টোরিজ’ নামে আরেকটি সংকলনও আছে। ‘টু’ তার একমাত্র উপন্যাস। ইতিমধ্যে যারা সাদাত হোসেন মান্টো পড়েছেন তাদের কাছে গুলজারের গল্পগুলো অত্যন্ত ভালো লাগবে। কেননা, দুইজনের লেখার পটভূমিটা একই। দেশবিভাগ, সীমান্তের গল্প, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা নিয়ে রচিত। সহজ আর সাবলীলভাবে বলে যাওয়া একটা গল্পই আচমকা একটা বাক্যে এসে এমনভাবে আঘাত করে যে, অন্তরাত্মা অবধি কেঁপে উঠতে পারে।
এক রঙের সঙ্গে অন্য রঙ মেশালে দুটি রঙই তাদের স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলে এবং তারা বদলে যায়৷ অথচ পাথর স্বকীয়তা হারায় না এবং বদলায়ও না। – গুলজার
‘রাভি পার এন্ড আদার স্টোরিজ’ এবং ‘হাফ এ রুপি স্টোরিজ’ সংকলন দুটো থেকে সেরা গল্পগুলো নিয়ে সাজানো হয়েছে গুলজারের নির্বাচিত সেরা গল্প নামের বইটি। বিদ্যাপ্রকাশ প্রকাশনী থেকে বইটি প্রকাশ পেয়েছে অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৮ তে। প্রচ্ছদ করেছেন মোবারক হোসেন লিটন। অনুবাদ ও ভূমিকা ফজল হাসানের। প্রচ্ছদ তেমন আহামরি কিছু না। কেবল গুলজারের নামটাই ব্যতিক্রম ধরণের; যা বইপড়ুয়া পাঠকদের আকৃষ্ট করবে। বইটার পেইজ, বাঁধাই সব স্ট্যান্ডার্ড মানসম্পন্ন বলা যায়।
দুটি পর্বে বিভক্ত বইটিতে সর্বমোট ১৬টি গল্প স্থান পেয়েছে। পর্ব এক: রাভি পার অ্যান্ড আদার স্টোরিজ এ স্থান পেয়েছে রাভি নদী পেরিয়ে, ধোঁয়া, মাইকেলএঞ্জেলো, হাত রাঙিয়ে দাও হলুদে, হিসাব কিতাব, পুরুষ, কাগজের টুপি এবং গুড্ডু গল্পগুলো। পর্ব দুই: হাফ এ রুপি স্টোরিজ এ স্থান পেয়েছে আধেক রুপি, যুদ্ধবিরতির সীমারেখা, সারথি, ফুটপাত, ইলিশ, ঘুঘু এবং জামুনি, অ্যাডজাস্টমেন্ট এবং দাদাজি গল্পগুলো। এতগুলো গল্প নিয়ে আলোচনা করা সম্ভব নয় আর আপনারও এত ধৈর্য্য থাকার কথা নয়। তাই যেই গল্পগুলো দুর্দান্ত আর অসাধারণ বলে মনে হয়েছে সেগুলোরাই বর্ণনা তুলে ধরছি।

মহিলারা যা-ই করুক না কেন, সবসময় তাদের কোন না-কোন পুরুষের কাছে জবাবদিহি করতে হয়। কখনও বাবার কাছে, অন্য সময় স্বামী কিংবা ছেলের কাছে। – গুলজার
রাভি নদী পেরিয়ে গল্পটি মূলত দেশভাগের সময় উদ্বাস্তু এক শিখ পরিবারের গল্প। এই গল্পটা আমার অনেকটা চেনা। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের একটা গল্প এই গল্পটার সাথে অনেকটাই মিলে যায়। এমনকি মুক্তিযুদ্ধের কোন সিনেমাতে দেখানো হয়েছে সম্ভবত। পাক সেনাদের ভয়ে মা বাচ্চার মুখ চেপে রাখে; যাতে বাচ্চা চেঁচিয়ে কেঁদে না উঠে। কিন্তু পাক সেনারা চলে গেলে দেখা যায় বাচ্চাটা মরে গেছে। এই গল্পটা অনেকটাই তেমন তবে অনন্য গুলজারের শব্দচয়ন আর বলার ঢং-এ।
ধোঁয়া গল্পটি ধর্মীয় নিয়মকানুনের ব্যবধান আর হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সংঘর্ষ নিয়ে লেখা। মুসলমান হোক আর হিন্দু, নিজেদের গোঁড়ামির জন্য দাঙ্গা তাদের কাছে নিতান্ত তুচ্ছ এক বিষয়। এলাকার প্রভাবশালী চৌধুরী মারা গেছেন। চৌধুরীর উইল মতে দাফনের বদলে পোড়ানোর সকল ব্যবস্থা করছেন চৌধুরানী। কিন্তু বাদ সাধে মহল্লার মুসলিমমনা লোকজন। এই অপমান যেন তাদের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। আর তাই তো, মৃতকে দাফন করার জন্যে জীবিতকে পুড়িয়ে মারে।
হিসাব কিতাব গল্পটিতে উঠে এসেছে চিরাচরিত মানব মনের অন্ধকার এক দিকের কথা; যা তৈরি করে দেয় ঘুনে খাওয়া এই সমাজ। মাস্টার রাম কুমারের মেয়ে ঊষার সঙ্গে বাবু দীন নাথ তার ছেলে সারভান কুমারের বিয়ে দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। মাস্টার খুবই আদর্শবাদী তাই মেয়ের বিয়ের বয়স পার হতে চললেও যৌতুকের মতো অন্যায় করে বিবাহে সম্মতি দিতে চান না। আর তাছাড়া, যৌতুকের এত রুপি দেয়ার মতো ক্ষমতাও তার নেই। আচমকা তার দীন নাথের সঙ্গে দেখা হয়। যিনি কেবল পুত্রবধূই চান, যৌতুক যার দুচোখের বিষ। কিন্তু আদতেও কি গল্পটাই তাই?
ইলিশ গল্পটি আদতে প্রেম আর ভালোবাসার গল্প মনে হলেও এটি সমাজের বাস্তব চিত্রের এক দারুণ প্রতীকী গল্প। বিভূতি আর কাঞ্চন বিবাহিত দম্পতি। প্রেমের কুলে ভাসছে দুজন। কাঞ্চনের গর্ভবতী হবার দিন এলো বলে। বছরের তিনটে মাস যখন ইলিশের পেটে ডিম থাকে তখনকারই এক সময়ে বিভূতি একজোড়া গর্ভবতী ইলিশ নিয়ে আসে। যে ইলিশের মুখটি হা করা থাকে সামান্য, যেন কিছু বলতে চায়।

ঘুঘু এবং জামুনি আসলে প্রেমের গল্প, ভালোবাসার গল্প; তবে এটি নর-নারীর ভালোবাসার গল্প নয়। বরং এটি একটি পাখির রঙিন ঘুড়ির প্রতি অলৌকিক ভালোবাসার গল্প। পাখিটি মনে করে ঘুড়িটি যেন ভিন্ন প্রজাতির কোন পাখি। পাখিটি জানে ঘুড়িটিকে কেউ পালে, বেশি উড়তে চাইলে সুতোয় টান মারে। কিন্তু পাখিটি এ জানে না, ঘুড়িটির আসলে কোন প্রাণ নেই; চোখ জুড়ানো এক জড়বস্তু ওটা।
অ্যাডজাস্টমেন্ট অদ্ভুত একটি গল্প। প্রেমের অস্তিত্বের গল্প, মৃত্যু যে ভালোবাসাকে স্থবির করে দিতে পারে না সেই বিশ্বাসের গল্প, বিপরীত লিঙ্গের একজন মানুষ যে বিপরীত লিঙ্গের অন্য মানুষটার প্রতি কতটা ডেসপারেট হতে পারে সেই বিশ্বাসের গল্প।
যদি রক্ত ঝরে, তবে সেটা ক্ষত, অন্যথায় প্রতিটি আঘাতই কবিতা। – গুলজার
লেখক সম্পর্কে তো মোটামুটি একটা ধারণা দিয়েছি পূর্বেই। তাই আর বেশি কিছু লিখলাম না। অনুবাদকের ঘরে ফজল হাসান নামটা লেখা থাকলেও আসলে তার নাম ড. আফজল হোসেন। দুইটি মৌলিক ছোট গল্পগ্রন্থ এবং নয়টি অনুবাদকর্ম আছে তার লেখালেখির ঝুলিতে। খুবই ভালো ছিল তার অনুবাদকর্ম। পড়তে বিন্দুমাত্র সমস্যা হয়নি। কোন ধরণের কাটখোট্টা ভাব অনুভূত হয়নি। বরং বেশ সহজ, সাবলীল আর প্রাঞ্জল হয়েছে।
প্রথম গল্পটা খুব বেশি ধাক্কা দিয়েছে। পরপর দুবার পড়েছি এই গল্পটাই। অফিসে যাবার পথে বাসে বসে কানে হেডফোন দিয়ে বই পড়ার অভ্যাস হয়ে গেছে। প্রথমবার গল্পটা পড়ে ভাবলাম, হয়তো মনোযোগ ছিল না। কেমন যেন আচমকা একটা সূক্ষ্ম ধাক্কা ছিল। তাই আবার মনোযোগ দিয়ে ভালো করে পড়লাম। হ্যাঁ, বেশ ভালোভাবেই ধাক্কা খেলাম পরেরবারও। দ্বিতীয় গল্পটাও একই রকমের ধাক্কা নিয়ে অপেক্ষা করছিল। বুঝতে পারলাম, গল্পগ্রন্থটা বেশ ধাক্কা দেবে, ভাবনার নতুন খোরাক যোগাতে সাহায্য করবে।
আমরা সবাই কমরির মতো। কমরির অর্থ হলো মুরগি। এই শহর শস্য দানা ছিটায়। আমরা মুরগির মতো টুক-টুক শব্দ করে সেগুলো কুড়িয়ে খাই। সেই খাবার খেয়ে যখন মোটা তাজা এবং নাদুসনুদুস হবো, তখন ওরা আমাদের কতল করবে। কারা? অনুভূতিহীন মহারাজারা। – গুলজার

গুলজারের গল্প প্রতীকী। সাধারণ একটা গল্পের ছলে খুব ভারিক্কি চালের বড়সড় কোন প্রতীকী ঘটনার পরিস্ফুটনই মূলত তার গল্পের মূল লক্ষ্য। মানব মনের অন্ধকার দিক, সামাজিক অবক্ষয়ের রূপ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ভয়াবহতা, সমাজে নারীর অবস্থানসহ সামাজিক ইস্যুগুলোকে খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন নিজের লেখায়। শব্দচয়নের ক্ষেত্রে বেশ পারঙ্গম এই লিরিক জাদুকর। আর তাই জন্যই তাকে ‘মাস্টার ওফ ওয়ার্ডস্মীথ’ বা ‘শব্দের মোৎজার্ট’ ডাকা হয়তাকে। তবে হ্যাঁ পুরো গল্পটা একদমই সাধারণ মনে হলেও শেষের বা তার আগের একটা বাক্য যে আপনাকে ধাক্কা দেবে তা নিশ্চিত থাকুন।
আপনি কি ইশমত চুগতাই কিংবা সাদাত হোসেন মান্টো পড়েছেন এর আগে? যদি পড়ে থাকেন তাহলে অবশ্যই গুলজারের গল্পে ডুবে যেতে পারবেন। যদি না পড়ে থাকেন তাতেও আশা করি সমস্যা হবে না। প্রথম দুটো গল্পই বেশ হার্ডকোর ম্যাসেজ দিয়েছে বলে মনে হয়েছে। বাকিগুলাও ভালো; তবে এই দুইটার বিচারে এতটাও হার্ডকোর না। গল্পগুলো ভেতর থেকে নাড়া দেয়, নতুন করে ভাবতে শেখায়। তবে অনেকের কাছে ভালো নাও লাগতে পারে। পছন্দ আর রুচিতে ভিন্নতা থাকাটাই স্বাভাবিক। শেষ করছি গুলজারের একটা কবিতা দিয়ে –
সারাদিন আমি কাটিয়েছি
বন্ধুহীন, একাকী এবং দুঃখ নিয়ে,
নিজের কাছেই ছিলাম আমি অচেনা।
সৈকতে ডুবে গেলে দিন
আমি বিরান সড়ক পথে
ফিরে আসি হেঁটে
নিঃসঙ্গ নিবাসে।
যেই মুহূর্তে
দরোজার পাল্লা খুলি,
তখন আমার টেবিলের উপর বই
মৃদু শব্দে পৃষ্ঠা উল্টিয়ে শুধায়:
‘বন্ধু, কোথায় ছিলে তুমি
এই দীর্ঘ সময়?
বই: গুলজারের নির্বাচিত ছোটগল্প
লেখক: গুলজার
অনুবাদক: ফজল হাসান
প্রকাশনী: দিব্যপ্রকাশ
মূল্য: ১৮০ টাকা মাত্র
