There are 3 kinds of people; the ones above, the ones below, and the ones who fall.
এমন অনেক মানুষই আছে যাদের রাত ৩টা থেকে ৪টার মধ্যে ঘুম ভেঙ্গে যায়। আবার অনেকেই এমন আছেন যে, মধ্যরাতে ঘুম ভেঙে জেগে উঠে দেখেন ঠিক ৩টা বেজে ৩৩ মিনিট। এমনটা কেন হয়? এর কারণ কি? এটা কেবলই একটা কাকতালীয় ব্যাপার? নাকি কোন বার্তা লুকিয়ে থাকে এই বর্ধিত বেজোড় সংখ্যার আড়ালে?
৩ একটি মৌলিক এবং সৃজনশীল সংখ্যা; আর আধ্যাত্নিক দিক থেকেও তিন একটি বহুল প্রচলিত সংখ্যা। আবার কথায় আছে, আধ্যত্মিক ক্ষেত্র থেকেই সৃজনশীলতার উদ্ভব। বিশ্বজুড়ে ধর্মীয় এবং আধ্যাত্মিক বিশ্বাসে তাই ৩ সংখ্যাটির আলাদা একটা গুরুত্ব আছে। আর এই ৩ সংখ্যাটাই যখন বেজোড় সংখ্যায় পরিণত হয়ে কারো দৃষ্টিতে ধরা দেয় – তখন সেটা গার্ডিয়ান এঞ্জেল বা স্বর্গদূত থেকে প্রাপ্ত ভালোবাসার নিদর্শন কিংবা ইশ্বর থেকে প্রাপ্ত কোন বার্তার সংকেতকেই বুঝায়। বিভিন্ন রীতিনীতিতে বিভিন্নভাবে এই বেজোড় সংখ্যা ৩৩৩ এর ব্যবহার হয়ে থাকে।
এমনই একটা প্রতীকী ম্যাসেজ বা বার্তা দিয়ে গেছে নেটফ্লিক্সের মুভি দ্য প্ল্যাটফর্ম। বন জুন হুয়ের দ্য স্নোপিয়ার্সার সিনেমার কথা মনে আছে? পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার কঠিন সত্যে আবর্ত ছিল যে সিনেমার মূল গল্প। দ্য প্ল্যাটফর্ম দেখা শেষেও একইরকম অনুভূতি হয়েছে যেমনটা বন জুন হুয়ের সিনেমা দেখার পর হয়েছিল। স্প্যানিশ এই সিনেমাটি অত্যন্ত রূপকধর্মী একটি গল্পের উপর ভিত্তি করে নির্মাণ করা হয়েছে।

একদিন সকালে ঘুম থেকে জেগে উঠেই গোরেং নিজেকে এক অদ্ভুত জায়গায় আবিষ্কার করে। বদ্ধ এক ঘরের মধ্যে দুটি বিছানা দুই প্রান্তে। এক পাশে পুরনো ভেসিন আর হাই-কমোড; সাথে একটা জীর্ণ আয়নার ফ্রেম। আয়নার ঠিক উল্টোপাশের দেয়ালে খোঁদাই করে লেখা – ৪৮। তবে ঘরটার সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে- এর মাঝখানে নিখুঁতভাবে কাঁটা চারকোনা একটা গর্ত আছে। নিজের বিছানাতে ভালোমতো উঠে বসতেই অপর প্রান্তের বিছানায় বসা বৃদ্ধের দিকে নজর যায় গোরেং এর।
বৃদ্ধের সাথে কথা প্রসঙ্গে গোরেং জানতে পারে- এটা আসলে একটা কারাগারের মতো জায়গা। কেউ হয়তো এসেছে কোন অপরাধ থেকে নিজেকে শুধরে নিতে; কেউবা হয়তো স্বেচ্ছায় নিঃসঙ্গতাকে বেছে নিতে; কেউবা হয়তো কোন ডিগ্রী অর্জন করতে। প্রতি সেলে দুইজন করে মানুষ থাকে আর তাদের দুজনের সেল নাম্বার হচ্ছে ৪৮। বৃদ্ধ একবার ১৩২ নং সেলেও ছিল; কিন্তু আদতে কতগুলো সেল আছে তা জানা নেই। মাঝের ঐ গর্তটা দিয়ে একটা প্ল্যাটফর্মে করে খাবার আসে প্রতিদিন। মাত্র দুই মিনিট সময় পাওয়া যায় খাওয়ার জন্য; এরপরই প্ল্যাটফর্ম নীচে নেমে যেতে শুরু করে। যদি কেউ খাবার রেখে দেয় তাহলে ঘরের তাপমাত্রা হয় ঠান্ডা বা উষ্ণ হতে শুরু করে। খাবার সংরক্ষণেরও তাই কোন উপায় নেই।

এই দুঃস্বপ্নের জায়গাটাতে বিভিন্ন জন বিভিন্ন অস্ত্র সঙ্গে নিয়ে আসে। কিন্তু গোরেং আসে একটা বই নিয়ে। প্রতি রাতে বৃদ্ধকে বই পড়ে শোনায়। একদিন প্ল্যাটফর্মে করে উপরের তলা থেকে একটা মেয়ে আসে। মেয়েটার নাম মিহারু। সে তার বাচ্চাকে খুঁজতেই প্রতিদিন নেমে আসে উপরের তলা থেকে। কিন্তু কর্তৃপক্ষ বলে এখানে ১৬ বছরের নীচে কেউ আসতে পারে না। আরেকদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে নিজেকে বিছানার সঙ্গে শক্ত করে বাঁধা অবস্থায় আবিষ্কার করে গোরেং। কেননা, তাদের সেল পরিবর্তন হয়েছে- ১৭১ নাম্বার সেলে এখন তারা। উপরের তলা থেকে শুরু করে নীচতলায় যেতে যেতে খাবার ফুরিয়ে যায়। তাই, নীচতলার লোকজন হয় অনাহারে মারা যায় আর নয়তো নিজের সেলের অপরজনকে মেরে ক্ষুধা নিবারণ করে। বৃদ্ধ তাই গোরেংকে মারার পূর্বপ্রস্তুতি নেয়।
গোরেং বেঁচে যায় মিহারুর কল্যাণে। কিন্তু একটা ব্যাপার গোরেংয়ের বেশ অবাক লাগে। যারাই সেল পরিবর্তন করে উপরের তলার বাসিন্দা হয়; তারাই তাদের নীচতলার মানুষদের প্রবলভাবে ঘৃণা করে আর উপরের তলার মানুষদের শ্রদ্ধা করে। অথচ উপরের তলার বাসিন্দারা যদি শুধুমাত্র নিজেদের খাবারটুকু খায় তাহলে অনায়াসেই একদম নীচতলার মানুষটিও কিছু হলেও অবশিষ্ট খাবার পায়। কিন্তু কেউই এই চেইন বা সিস্টেম ভাঙতে রাজি হয় না। তাই, গোরেং তৈরি হয় সিস্টেমকে ভাঙতে। হয়তো নীচতলার মানুষটি পর্যন্ত খাবার পৌঁছালেই ভেঙে পড়বে এই পুঁজিবাদী শাসনব্যবস্থা। আসলেও কি তাই? গোরেং কি পারে? নাকি গল্পের আরও গভীর সত্য লুকানো আছে এখনো? সময় নষ্ট না করে দেখেন ফেলুন মাত্র দেড় ঘণ্টার এই সিনেমাটি।
এই সিনেমার গল্পটি আবর্তিত হয়েছে সমাজের শ্রেণী বৈষম্যকে কেন্দ্র করে। সিনেমাতে যে যত উপরের তলায় থাকবে সে তত উঁচু শ্রেণীর মানুষ বলে গণ্য হবে। আর যারা যত নীচু শ্রেণীর বাসিন্দা তারা তত নীচু শ্রেণীর মানুষ। উপরের তলার বাসিন্দা খেয়েদেয়ে বেঁচে থাকলেই নিজেকে সুখী মনে করে। আর নীচতলার বাসিন্দারা যদি অনাহারে কিংবা সমগোত্রীয় মাংস ভক্ষণ করেও টিকে থাকে। তাতেও যেন উপরতলা বাসিন্দার বিন্দুমাত্র বিচলিত বোধ করে না। অথচ উপরের তলার বাসিন্দা যদি কেবল নিজের ক্ষুধা নিবারণ করতে যতটুকু পরিমাণ খাওয়া দরকার ততটুকুই খায়; তাহলেই কিন্তু নীচতলার বাসিন্দার জন্য খাবার বেঁচে যায়। পুরো ভবনে মোট ৬৬৬ জন বাসিন্দা অথচ সংখ্যাতত্ত্বের বিচারে ৬৬৬ নাকি শয়তানের সংখ্যা। এই ভবনের মতোই পুরো পৃথিবী জুড়েই দৃশ্য বা অদৃশ্য শয়তানেরা আমাদের প্ররোচনা দেয় না? বাস্তবেও কি ব্যাপারটা এমন নয়?

পৃথিবীতে লক্ষ কোটি মানুষ আছে যারা প্রয়োজনের অতিরিক্ত ভোগ করতেই পছন্দ করে; আবার একই সাথে পৃথিবীতে লক্ষ কোটি মানুষ আছে যারা দিন পার করে অনাহারে কিংবা অর্ধহারে। অথচ প্রয়োজন মাফিক খাবার যদি সকলেই ভোগ করতো তাহলে কিন্তু এই শ্রেণী বৈষম্য আর থাকতো না। কিন্তু পুঁজিবাদের এই শেকল ভাঙবে কে? সবাই যে নিজেকে উঁচু শ্রেণীর ভাবতেই পছন্দ করে। এই তো মহামারীর এমন সময়েও, প্যানিক বায়িং করে একদল ঘরভর্তি খাবার মজুদ করলো আর অন্যদল কি খাবে তাতে ভ্রক্ষেপই করলো না। সিনেমাটা কি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দেয় না এই সবকিছুর মানে?
সিনেমাটি একটি ভবনকে কেন্দ্র করে যেটা আসলে পৃথিবীর প্রতীকী রূপ। পৃথিবীর সমাজব্যবস্থার মতোই এখানেও উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত আর নিম্নবিত্তের স্তরগুলো বিদ্যমান। একদম শূন্যতে যে বা যারা আছে তারা আসলে সৃষ্টিকর্তার প্রতিরূপ। সৃষ্টিকর্তা সমানভাবে সকলের জন্য পৃথিবীতে খাবার বন্টন করে। কিন্তু উচ্চ শ্রেণীর লোকেরা তা নিজেদের ভোগবিলাসেই ব্যয় করে অপরের কথা চিন্তা না করেই। ফলে নীচতলার বাসিন্দাদের বা নীচুশ্রেণীর মানুষ নিরুপায় হয়ে এমনকি মানব মাংস ভক্ষণ করতেই বাধ্য হয়। কিন্তু যখন সময়ের পরিবর্তনে অনাহারে থাকা নীচুতলার মানুষটাই উপরের তলার বাসিন্দায় পরিণত হয় তখনও কিন্তু সেই একই কাজ করে- খাবার অপচয় করে নীচুতলার বাসিন্দার কথা চিন্তা না করেই। এই পুঁজিবাদী সমাজও কি আমাদের একই শিক্ষা দেয় না?
পৃথিবীতে একমাত্র একজনই আছে যে কিনা উঁচু, মধ্য আর নিচু কোন কিছুরই বাঁধা মানে না। আর সে হচ্ছে মা। নিজের সন্তানের জন্য সব করতে পারে মা। মিহারু চরিত্রটি জন্য এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। প্রতিদিন সেই প্ল্যাটফর্মে করে নীচে নেমে আসে মিহারু। যে কোনো একতলার কাউকে না কাউকে খুন করতে বাধ্য হয় মিহারু। যাতে করে খুন হওয়া ঐ ব্যক্তির খাবারের অংশটা যেন তার সন্তান পায়। পুঁজিবাদী এই সমাজ যে নিদ্বির্ধায় একজন মানুষকে সন্ত্রাসবাদের দিকে ঠেলে দেয় পেটের দোহাই দিয়ে- এই বিষয়টাও যেন ফুটে উঠেছে মিহারুর চরিত্রের মাধ্যমে।

কিন্তু এই সমাজব্যবস্থাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কোন এক তরুণ আসে পরিবর্তন নিয়ে। যে কিনা প্রচলিত ধারণায় বিশ্বাসী নয়; যে কিনা শেকলে আবদ্ধ জীবন পছন্দ করে না; যে কিনা জ্ঞানের মধ্যে জীবনের অর্থ খুঁজে; যে কিনা শেকল ভাঙার গান গায়; যে কিনা নতুন এক পৃথিবী গড়ার প্রত্যয়ে মত্ত। কিন্তু এমন একজনকে সবার প্রথমেই হোঁচট খেতে নিজের আপনজনের কাছেই। যেমনটা- হোঁচট খায় গোরেং বুড়ো ট্রিমাগাসির কাছে।
তবুও গোরেং ছুটে চলে ভারাত নামের আরেক সঙ্গীকে নিয়ে। কিন্তু সেখানেও যেন পরিচালক অপেক্ষা করছিলেন আরেকটা দৃশ্যে বাস্তবিক চিত্র ফুটিয়ে তুলে ধাক্কা দিতে দর্শককে। এক দৃশ্যে দেখা যায়, গোরেং আর ভারাত প্ল্যাটফর্মে চড়ে সবাইকে বুঝায় নীচতলার জন্য খাবার সংরক্ষণ করতে। কিন্তু একজন কথা না শোনায় গোরেং-এর হাতে তার মৃত্যু হয় আর তখন ভারাতের মুখ দিয়ে পরিচালক বলেন-
The Important Thing is the Massage.
এল হোয়ো শিরোনামের স্প্যানিশ এই সিনেমাটি ইংরেজি সংস্করণে দ্য প্ল্যাটফর্ম নাম পেয়েছে। সিনেমাটির পরিচালক হিসেবে ছিলেন গাল্ডার গাজতেলু-উরুতিয়া। চিত্রনাট্য লিখেছেন পেড্রো রিভেরো এবং ডেভিড ডেসোলা। গোরেং চরিত্রে অভিনয় করেছেন ইভান ম্যাসাগুয়ে। বৃদ্ধ ত্রিমাগাসি চরিত্রে ছিলেন জোরিয়ান ইগাইলোর আর মিহারু চরিত্রে ছিলেন আলেকজান্দ্রা মাস্যাংকায়। স্পেনের বিখ্যাত ফিল্ম প্রোডাকশন কোম্পানি বাস্কুই ফিল্ম প্রোডাকশনে থাকলেও বিশ্বব্যাপী সিনেমাটির পরিবেশক ছিল নেটফ্লিক্স।

সিনেমাটির ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে স্পেন এবং তার আশেপাশের দেশগুলোতে মুক্তি পেলেও, ২০২০ সালেই মূলত বিশ্বব্যাপী মুক্তি এবং প্রচার লাভ করে। সিনেমাটি ইতিমধ্যেই সেরা স্প্যানিশ ফিল্ম হিসেবে আসিকান (স্পেনের মর্যার্দাপূর্ণ পুরষ্কার মিডিয়ার জন্য) ২০২০ ফেস্টিভ্যালে মনোনীত হয়েছে। পরিচালক উরুতিয়া স্পেনের সিনেমা রাইটার্স সার্কেল অ্যাওয়ার্ডে সেরা নতুন পরিচালক হিসেবে মনোনীত হয়েছে। সোমোস সিনে অ্যাওয়ার্ড এবং ফেরোজ অ্যাওয়ার্ডে ৬টি ক্যাটাগরিতে পুরষ্কার পেয়েছে। গোদি অ্যাওয়ার্ড, গয়া অ্যাওয়ার্ড, কাতালোনিয়ান আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল, টরিনো ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল এবং টরেন্টো আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের মতো বিখ্যাত পুরষ্কারগুলোও বাগিয়ে নিয়েছে সিনেমাটি।
সিনেমাটিকে যদিও হরর জনরার বলে আখ্যা দেয়া হয়েছে তবে তেমন কোন ভীতিকর দৃশ্য নেই এতে। তবে হ্যাঁ, কিছু আছে যেগুলো আসলে দুর্বলচিত্তের মানুষদের জন্য নয়। ‘ডিস্টার্বিং’ বা ‘অস্বস্তিকর’ কিছু দৃশ্য আছে। কাটাকাটির দৃশ্যগুলো মূলত অনেকে সহ্য করতে পারবে না হয়তো। তাই, অনেকের ক্ষেত্রে সেই ‘ডিস্টার্বিং’ বা ‘অস্বস্তিকর’ দৃশ্যগুলোই অনেক ভীতিকর হতে পারে। তবে থ্রিলার আর সাই-ফাই জনরা হিসেবে এটি একদম উপযুক্ত একটি সিনেমা। সিনেমার দুনিয়ার সঙ্গে বাস্তব দুনিয়ার প্রতীকী মিলটা গল্পের শেষে যেন একদম পরিষ্কার আকাশের মতো স্বচ্ছ হয়ে ওঠে। নীচতলার বাসিন্দাদের আকুতি যেন দর্শককে ভাবিয়ে তোলে।
Feature Image: imdb.com
