Crafting Ideas Into Impactful Content

প্রজাপতি বসে আছে মাত্রায়: দারুণ এক সাই-ফাই থ্রিলার

সবকিছু মানুষের চাওয়া মাফিক হয় না। জীবনে বাধা আসে, আসতে হয়। বাধাগুলোই মানুষকে আরো পরিণত মানুষে রূপান্তর করে। – তানজিরুল ইসলাম 

গুহামানবেরা যেদিন আগুন আবিষ্কার করেছিল সেদিন থেকেই বিজ্ঞানের সঙ্গে কল্পবিজ্ঞান শব্দটিও জুড়ে গেল যেন। কে জানে হয়তোবা এরও আগে থেকেই কল্পবিজ্ঞানের চিন্তা করতো আদিম মানুষেরা। মানুষের চিন্তা-চেতনাকে ছাপিয়ে যুগে যুগে কল্পবিজ্ঞান বেশ সমৃদ্ধ হয়েছে। বিজ্ঞান হোক আর কল্পবিজ্ঞান – এই দুইয়েরই দারুণ একটি জনপ্রিয় বিষয় হচ্ছে টাইম ট্র্যাভেল বা সময় পরিভ্রমণ। অতীতে গিয়ে নিজের ভুল শুধরানো কিংবা ভবিষ্যত থেকে ঘুরে আসার আকাঙ্ক্ষা থেকেই মূলত এই তত্ত্বের জন্ম। কিন্তু সময় পরিভ্রমণ কি আসলেও সম্ভব? এর পক্ষে-বিপক্ষে অনেক বৈজ্ঞানিক যুক্তি রয়েছে। এমনকি যদি সময় পরিভ্রমণ সম্ভবপরও হয় তাতেও কিছু ব্যাপার রয়েই যায়। যেমন – বাটারফ্লাই ইফেক্ট কিংবা গ্র্যান্ডফাদার বা বুটস্ট্র্যাপ প্যারাডক্সের মতো বিষয়গুলো। 

বাটারফ্লাই ইফেক্ট – এই মতবাদের প্রবক্তা এডওয়ার্ড লরেঞ্জো এর মতে – পৃথিবীর কোথাও কোনো প্রজাপতির ডানা ঝাপটানোর কারণে অন্য জায়গায় ঘূর্ণিঝড়ের সৃষ্টি হতে পারে। মানে হচ্ছে সূক্ষ্ম কোনো পরিবর্তনের কারণে বিশাল কোনো পরিবর্তন ঘটে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। 

গ্র্যান্ডফাদার প্যারাডক্স – কেউ সময় পরিভ্রমণের মাধ্যমে অতীতে গিয়ে নিজের দাদাকে হত্যা করলো; তাতে করে তার বাবার জন্ম হবে না। ফলে তারও বর্তমানে কোনো অস্তিত্ব থাকার কথা না। অতীতে ফিরে গিয়ে কোনো পরিবর্তন যে বর্তমান পৃথিবীর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না এইটাই হচ্ছে এই মতবাদের মূল বিষয়বস্তু। 

বুটস্ট্র্যাপ প্যারাডক্স – এটা ঠিক গ্র্যান্ডফাদারের বিপরীত বলা চলে। অতীতে গিয়ে কোনো পরিবর্তন না করে তথ্য নিয়ে আসা হয়; সেই তথ্য বর্তমান এবং ভবিষ্যতে কাজে লাগানো হয়। কিন্তু তাহলে তথ্যটা আসলে কোথা থেকে? 

Image Source: Wazedur Rahman Wazed

এইরকমই প্রিডেস্টিনেশন প্যারাডক্স, বিলকার প্যারাডক্স, ইনফরমেশন প্যারাডক্সসহ অসংখ্য তত্ত্বের খোঁজ পাওয়া যায় সময় পরিভ্রমণের ক্ষেত্রে। কিন্তু বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী আর সময় পরিভ্রমণ নিয়ে এত আলোচনার কারণটা কি? কারণটা হচ্ছে – প্রজাপতি বসে আছে মাত্রায়। বাতিঘর প্রকাশনী থেকে ২০১৯ সালের বইমেলায় প্রকাশিত তানজিরুল ইসলামের সাই-ফাই থ্রিলার বই – প্রজাপতি বসে আছে মাত্রায়। ডিলানের করা প্রচ্ছদটাও গল্পের সঙ্গে বেশ সামঞ্জস্যপূর্ণ। বাতিঘর প্রকাশিত বইগুলোর কাগজ, বাঁধাই সম্পর্কে উল্লেখ করে বলার কিছু নেই; বরাবরের মতোই ছিল।

ভালোবাসা হয়তো সবার জীবনেই আসে, কিন্তু সবাই সেটাকে আপন করে পায় না। 
– তানজিরুল ইসলাম 

তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ের পৃথিবী। “এক দেশ এক পৃথিবী” এই নীতিতে চলছে গোটা দুনিয়া। হঠাৎ এক ভাইরাস মহামারী আকারে রূপ নিল; সরকার তটস্থ এই ভাইরাসের প্রতিষেধক আবিষ্কারে। খোঁজ নিয়ে যায় বর্তমানে এই ভাইরাসের প্রতিষেধক নেই তবে অতীতে এই ভাইরাসের প্রতিষেধক ছিল। তাহলে বর্তমানে কেন নেই এর প্রতিষেধক? কারণ ১৭ বছর আগেই এক ল্যাব বিস্ফোরণে সেই মহামারীর প্রতিষেধক, এমনকি এই ভাইরাস সম্পর্কিত সব তথ্য মুছে গেছে। 

ফারিহা রুদ্র, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ের সেরা বিজ্ঞানী। সরকার অন্য কোনো উপায় না পেয়ে তার কাছে ধর্ণা দেয়। সবার সম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হয় ফিরে যেতে হবে ১৭ বছর আগে। সেই ল্যাব বিস্ফোরণের পূর্বেই নিয়ে আসতে হবে প্রতিষেধক। কিন্তু সময় পরিভ্রমণের ক্ষেত্রে কিছু বিষয় মেনে চলতে হয় নয়তো পুরো টাইমলাইনের বর্তমান আর ভবিষ্যত বদলে যেতে পারে। তাই শেষমেশ এটাই সিদ্ধান্ত হয় যে তারই আবিষ্কৃত টাইম মেশিনে করে অতীতে ফিরে যাবে দেশের সেরা এজেন্ট এবং ফারিহার নিজের সন্তান রাদিদ রুদ্র। 

১৭ বছর পর এই ভাইরাসটা হঠাৎ কোথা থেকে উদয় হলো? ১৭ বছর আগে কেনই বা সেই ল্যাব বিস্ফোরিত হয়েছিল? সময় পরিভ্রমণের ক্ষেত্রে সকল নিয়ম-কানুন কি মেনে ফিরে আসতে পারবে রাদিদ? প্রতিষেধক কি আনতে পারবে সে?  এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে পড়তে হবে তানজিরুল ইসলামের সাই-ফাই থ্রিলার ঘরানার বই প্রজাপতি বসে আছে মাত্রায়। 

Image Source: Writer’s Facebook Profile.

তানজিরুল ইসলাম। অনুবাদ দিয়ে সাহিত্য জগতে পদার্পন করলেও বর্তমানে মৌলিক গ্রন্থের পেছনেই সময় অতিবাহিত করছেন। জন্ম লালমনিরহাটে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত আছেন। লেখালেখির শুরুটা কলেজ ম্যাগাজিন গল্প লেখার মধ্য দিয়েই। এরপর বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সংকলন আর ম্যাগাজিন লেখা ছাপা হয়েছে তার। বিখ্যাত লেখক হারলান কোবেনের টেল নো ওয়ান বইটি তার প্রথম অনুবাদগ্রন্থ। ভবিষ্যতে সায়েন্স ফিকশন এবং থ্রিলার সাহিত্য নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা তার।

জীবনে চলার সময় মাঝে মাঝে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যেগুলো মানুষের জীবনটাকেই পাল্টে দেয়। একেকজনের জন্য একেক রূপ ধরে আসে এই মুহূর্তগুলো, জীবনের মোড় বদলে দিয়ে মানুষগুলোকে নিয়ে যায় একেক দিকে। – তানজিরুল ইসলাম

সাধারণত বিজ্ঞান কল্পকাহিনী কিংবা সাইফাই যাই বলি না কেন, আমার পছন্দের হলেও কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে অপছন্দেরও বটে। অপছন্দের একমাত্র আর প্রধান কারণ হচ্ছে, বিজ্ঞানের দূর্বোধ্য সব সূত্রসমূহ যা মস্তিষ্কের নিউরনে অযথাই ভাবনার ঝড় তুলে। কিন্তু যদি সেসব সূত্রসমূহ খুব সহজভাবে পাঠককে গুলে খাইয়ে দিতে পারে লেখক- তাহলে সেটা আমার পছন্দের বইতে পরিণত হয়। প্রজাপতি বসে আছে মাত্রায় তেমনই একটা বই। যদিও এই প্যারাডক্সগুলো সম্পর্কে জানা ছিল আগে থেকেই।

বিশাল কলেবরে লেখা হার্ডকোর সাই-ফাই জনরাটা যেন আমাদের কাছে এখন দুর্লভ বস্তু। সেই ছোটবেলায় জাফর ইকবালের একটা সাই-ফাই পড়েছিলাম বেজিদের নিয়ে, বইটার নামও খুব সম্ভবত বেজি। হুমায়ূন আহমেদ এর তোমাদের জন্য ভালোবাসা কিংবা দ্বিতীয় মানব ছাড়াও হাসান খুরশীদ রুমির করা অনেক অনুবাদও পড়েছি। মাঝে দিয়ে যেন এই জনরাটা আচমকাই ডুবে গেল অন্যান্য জনরার ভিড়ে। খুঁজে পাওয়াই মুশকিল ছিল।

আর পাওয়া গেলেও সেই একই গতানুগতিক লেখা; ভিন্নতা বা ব্যতিক্রম কিছু পাওয়া যাচ্ছিল না। অথচ আমাদের দেশে এই জনরাটা অন্যান্য জনরার তুলনায় সবচাইতে বেশী জনপ্রিয় হওয়ার কথা ছিল। যদিও একদলের কাছে বিজ্ঞান মানেই ধর্মের বিপরীত কিছু। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সাই-ফাই জনরাটা আবারো ফুলে ফেঁপে উঠতে যাচ্ছে তা টের পাওয়া যাচ্ছে।

তানজিরুল ইসলাম প্রথম মৌলিক গ্রন্থ এটা৷ প্রথম বই হিসেবে বিষয়টা একটু জটিলই বলা চলে। কেননা, থিওরি অফ রিলেটিভিটি, স্পেস টাইম, টাইম লুপ, প্যারাডক্স এবং বাটারফ্লাই ইফেক্টের মতো ব্যাপারগুলোকে উপজীব্য করে লেখা গল্পটাকে এক সুতোয় গাঁথা বেশ কষ্টসাধ্যই বটে। সেই কষ্টসাধ্য ব্যাপারটাকেই বেশ দারুণভাবে সহজ করে ফেলেছেন তানজিরুল ইসলাম। টাইমলাইনের বর্ণনার সঙ্গে বিভিন্ন ডাইমেনশনের বিস্তারিত আলোচনা লেখকের বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেয়। পুরো উপন্যাসের লেখা সাবলীল, ভাষা প্রাঞ্জল আর বর্ণনাভঙ্গিও বেশ ভালো। একেবারে সাদামাটা না আবার খুব উচ্চমার্গীয়ও না। তবে কিছু জায়গায় বাক্য গঠনের ভিন্নতা বর্ণনাভঙ্গিকে যেন আরো বেশী প্রাণবন্ত করেছে। 

Image Source: Wazedur Rahman Wazed

লেখকের পরিপক্ব লেখায় কিঞ্চিৎ খেই হারানোর প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। অর্থাৎ হঠাৎ করেই কেমন যেন লেখাগুলো খুব বেশী সাদামাটা হয়ে যায়। অনেকটা উত্তাল নদীতে ঢেউয়ের তালে নৌকার উঠা আর নামার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। কিছু কিছু ক্ষেত্রে তা কিশোর বয়সের জন্য উপযুক্ত বলে চিন্তা করতে বাধ্য করেছে। বিশেষ করে রাদিদ আর কুরুর সম্পর্কটা; যদিও এটাকে অন্যদৃষ্টিতে দেখলে বলা যায়, লেখক এত বিশাল কলেবরের উপন্যাসে খানিকটা মজার খোরাক যুগিয়েছেন।

আর আরেকটা বিষয় না বললেই নয়, সেটা হচ্ছে রাদিদকে সেরা এজেন্ট বলার অন্তত একটা শক্তিশালী ব্যাকড্রপ (যেটা বলা হয়েছে গল্পে সেটা খুব শক্তিশালী মনে হয়নি) দরকার ছিল; যদিও এতে বিশেষ কোন প্রভাব পড়েনি গল্পে। আর রাদিদ অতীতে যাওয়ার পর সবকিছু কেমন যেন সহজলভ্য হয়ে গেল; বিশেষ করে একটা গোপন টিমের গোপন মিশনের কার্যক্রম সম্পর্কিত ব্যাপারগুলো। শুরু থেকে যেভাবে ব্যাপক বিস্তৃতি নিয়ে গল্প ছড়িয়েছে শেষের দিকে ততোটাই সংকুচিত হয়ে এসেছে গল্পের পরিধি। আরেকটু সময় দেয়া দরকার ছিল বলে মনে হয়।

লোভ বড় অদ্ভুত জিনিস; সবার সেটাকে বাধা দেওয়ার ক্ষমতা থাকে না।
– তানজিরুল ইসলাম

বইটা সিরিজ হিসেবে দুর্দান্ত কিন্তু একজন লেখকের একক লেখা হিসেবে খুব বেশী এনগেইজিং মনে হবে না। যদিও গল্পের শেষে পাঠককে কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ দেননি লেখক, সুবিন্যস্তভাবে গল্পের ইতি টেনে। কিন্তু তবুও মনে হয় আসলেই কি সবগুলো সুতো এক জায়গায় গিয়ে মিলেছে? এছাড়া বানান ভুল যেন বাতিঘরের ট্রেন্ড হয়ে যাচ্ছে। এইদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। 

তবে গল্পের পটভূমি, গতিধারা, টান টান উত্তেজনা, প্লট টুইস্টিং – এসব বিষয়ে বিন্দুমাত্র কার্পণ্যতা লক্ষ্য করা যায়নি লেখকের লেখায়। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বিজ্ঞানের সব দূর্বোধ্য সূত্র আর সমাধানসমূহ। কোনটা করলে কি হয় বা হবে কিংবা পরবর্তীতে কি প্রতিক্রিয়া হবে- লেখক বিভিন্ন সময়ে এই সূত্রগুলোকে আগেই ভেঙ্গে দিয়েছেন। বিশেষ করে বাটারফ্লাই ইফেক্ট আর টাইম ট্রাভেলের মতো এতো জটিল বিষয়টাকেও সহজ করে ফেলেছেন তানজিরুল ইসলাম। এত দারুণ একটা চেষ্টা করার জন্য তানজিরুল ইসলামের অবশ্যই ধন্যবাদটা প্রাপ্য।

আদতে গল্প পড়ার সময় আপনার মনে হবে লেখক হয়তো প্যারাডক্সগুলোর কথা ভুলে গেছে, কিন্তু গল্পের শেষের দিকে যখন এক এক করে সব সূত্রগুলোকে এক সুতোয় পেতে শুরু করবেন তখন মনে হবে পড়াটা সার্থক আপনার। শেষ করছি বইতে থাকা একটি গানের লিরিকসের কিছু উক্তি দিয়ে –

মর্টারের খোসায় পুড়ে যাওয়া বিকেল, 
নুয়ে পড়া গোধূলীর রক্ত, 
বিষাদের গাঢ় গহীন আর্তনাদ, 
তবু ভুল করে খোঁজা হয় যুদ্ধ…!! 

Feature Image: Wazedur Rahman Wazed

Share this
Facebook
Twitter
LinkedIn

Related Posts

রিভিউ

পনম্যান: সামাজিক রীতিনীতির যাঁতাকলে পিষ্ট এক থ্রিলার গল্প

গল্পের ভাঁজে একেকটা কর্মকান্ডে উঠে এসেছে কখনো সমাজব্যবস্থার নড়বড়ে কাঠামো, কখনো সমাজের নৈতিকতার যাতাকলে পিষ্ট মানুষদের অসহায়ত্ব, কখনো ব্যক্তিত্বের নৈতিকতার সীমাবদ্ধতা, অথবা কখনো অর্থনৈতিক অসাম্যের মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে যে বিষ ছড়ায় তার বাস্তব দৃশ্যময়তা।

দ্য ফ্রগ: হয়েও হলো না একটি পারফেক্ট ক্রাইম থ্রিলার

নেটফ্লিক্সের নতুন কোরিয়ান থ্রিলার সিরিজ দ্য ফ্রগের প্রত্যেকটা এপিসোডের শুরুতে এই ডায়ালগটা শুনতে পাবেন। কোরিয়ান ভাষায় সিরিজটার নাম অনেকটা এমন – In the forest where no one’s around. কিন্তু তাহলে নামটা ফ্রগ হলো কেন?