ডিটেকটিভ নামটা শুনেই পাঠক বলবে সূর্যদীঘল বাড়ির লেখক গোয়েন্দা কাহিনী লিখেছেন? কিন্তু তার পেশা সম্পর্কে অবগত হয়ে পাঠক বলবে সূর্যদীঘল বাড়ি উপন্যাসটা কি এই লেখকেরই সৃষ্টি?
আবু ইসহাক। আগাগোড়া একজন ঔপন্যাসিক তাও আবার সামাজিক ঘরানার। বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত উপন্যাস সূর্যদীঘল বাড়ি তারই সৃষ্টি। ১৯৪৮ সালের অগাস্ট মাসে উক্ত উপন্যাসের পাণ্ডুলিপির কাজ শেষ করেন তিনি। কিন্তু দীর্ঘ চার বছর ধরে ঢাকা এবং কলকাতা ঘুরেও কোনো প্রকাশককেই বইটি প্রকাশে রাজি করাতে পারেননি। হতাশ হয়ে ভাবলেন হয়তো ডিটেকটিভ উপন্যাস লিখলে প্রকাশকের দৃষ্টি আকর্ষণ করা সম্ভব। কিন্তু বিদেশী গল্পের ছায়া অবলম্বনে কিংবা বিদেশী গল্প নকল করে লেখার মতো রুচি লেখকের হলো না।
লেখক আবু ইসহাক পেশায় ছিলেন একজন ডিটেকটিভ। পেশাগত প্রশিক্ষণ, পড়াশুনা এবং অপরাধ তদন্তের বাস্তব অভিজ্ঞতা যার আছে তার পক্ষে একটা দুর্দান্ত ডিটেকটিভ উপন্যাস লেখা মোটেই অকল্পনীয় কিছু নয়। ১৯৫০ সালে জাল নোটের মামলা সংক্রান্ত কয়েকটা কেসের তদন্তের ভার পড়েছিল তার পেশাগত জীবনে। সেই তদন্তের অভিজ্ঞতাকেই কাজে লাগিয়ে লিখে ফেললেন আস্ত এক ডিটেকটিভ উপন্যাস। লেখার কাজ শেষ হলো ৫৪ সালে; অথচ ৫৫ সালেই এক প্রকাশক রাজি হয়ে গেলেন সূর্যদীঘল বাড়ি উপন্যাসটি প্রকাশ করতে।
সূর্যদীঘল বাড়ির সুনাম অক্ষুণ্ণ রাখতেই সুদীর্ঘ ৩৪ বছর বাক্সবন্দী করে রাখেন ডিটেকটিভ উপন্যাসটি। নয়তো তৎক্ষনাৎ এই উপন্যাস প্রকাশ পেলে হয়তো বাংলা সাহিত্যের রহস্যোপন্যাস জগতে তা একটি মাইলফলক বলেই বিবেচিত হতো। অবশেষে ১৯৮৮ সালে ভিন্ন স্বাদের এই উপন্যাসটি প্রকাশ পায়। গতানুগতিক ডিটেকটিভ উপন্যাস নয় এটি; বরং অপরাধ তদন্তের ক্ষেত্রে লেখকের নিজস্ব উদ্ভাবিত মৌলিক পদ্ধতির ব্যবহার করা হয়েছে এখানে। থাক সেসব কথা মূল প্রসঙ্গে ফিরি।

সদ্য দেশবিভাগ হয়েছে। বর্তমান বাংলাদেশ অর্থাৎ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ঘটনা। প্রতিদিনই ওপাড় বাংলা থেকে শয়ে শয়ে পরিবার বাঁচার তাগিদে নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে ভিড় করছে পূর্ব পাকিস্তানে। সেই অস্থির সময়টাকেই সুযোগ হিসেবে বেছে নেয় একদল জাল নোট পাচারকারী চক্র। প্রায় প্রতিদিন প্রদেশের প্রতিটা থানা থেকেই জাল নোটের প্রকোপ বৃদ্ধির কথা শুনতে শুনতে ত্যক্ত হয়ে উঠেছে প্রশাসন। জাল নোটের মাধ্যমে যে দেশের অর্থনীতিকে কব্জা করা সম্ভব; এবং এমনকি পুরো দেশকেই করায়ত্ত করা সম্ভব; তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
তাই এই চক্রের তৎপরতা ঠেকাতে মাঠে নামে পূর্ব পাকিস্তানের গোয়েন্দা বিভাগ। এই গোয়েন্দা বিভাগেরই স্পেশাল অফিসার আলী রেজা। আলী রেজার অধীনে থাকা এক অফিসারের নাম হচ্ছে ইলিয়াস। চৌকষ বুদ্ধিসম্পন্ন এই অফিসারের কল্যাণেই জাল নোট পাচারকারীদের একটা চিঠি হাতে পায় গোয়েন্দা বিভাগ। কিন্তু বিধিবাম! চিঠিটা লেখা দুর্বোধ্য এক ভাষায় কিংবা বলা যায় সাংকেতিক কোনো গুপ্ত ভাষায়।
এই চিঠির পাঠোদ্ধার সময় সাপেক্ষ ব্যাপার তো বটেই সঙ্গে আবার পাঠোদ্ধার যে সঠিকই হবে তার নিশ্চয়তাও নেই। উপরন্তু চিঠির প্রাপক আর প্রেরককে খুঁজে বের করাও এই অস্থির সময়ে বেশ কষ্টসাধ্য কাজ। আর খুঁজে পেলেও প্রমাণাদি কই? কিন্তু গোয়েন্দা অফিসার ইলিয়াস যে নাছোড়বান্দা। খড়ের গাঁদায় সুঁই খোঁজার ব্রত নিয়েই নেমে পড়ে ইলিয়াস। সঙ্গী হয় কিংবা বলা যায় সঙ্গিনী হয় উদ্বাস্তু পরিবারের এক মেয়ে রোকসানা। যার বাবা নির্দোষ হয়েও জেল খাটছে জাল নোট পাচারকারী চক্রের কারণে। তাদের এই ছুটে চলার সঙ্গী হয় পাঠক, লেখকের প্রাঞ্জল বর্ণনা আর উপস্থাপনে।
অর্থনৈতিক সাফল্যের উপর নির্ভর করে রাজনৈতিক সাফল্য।
আবু ইসহাক
এই উপন্যাস পড়ে যে কারোরই পাঠ প্রতিক্রিয়ার মূল বক্তব্য হবে অবাক হয়েছি খুব। গত শতকের মাঝামাঝিতে বসে এমন দুর্দান্ত ডিটেকটিভ উপন্যাস লেখা সত্যিই যে কাউকে অবাক করবে। তদন্তের শুরু থেকে একদম শেষ পর্যন্ত পাঠককে আষ্ঠেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখবে বাস্তবমুখী, প্রাঞ্জল আর সাবলীল বর্ণনাভঙ্গি।
একই তদন্তের জালে আটকে পাঠক যেন বিরক্ত না হয়ে সেজন্য সাবপ্লট হিসেবে লেখক এক তোতলা দরবেশকে টেনে এনেছেন গল্পে। লেখক যেন এখানে মজার ছলেই মনে করিয়ে দিলেন সেই সময়ের দুর্ধর্ষ সব অপরাধীরা নিজেদের পরিচয় গোপন করতে দরবেশ বা ভণ্ড পীরের ছদ্মবেশ নিতো। এখনকার সময়েও যে অপরাধীরা ধর্মের লেবাস গাঁয়ে জড়ায়; তা আর হলফ করে বলার দরকার নেই।
লেখকের উদ্ভাবিত তদন্তের পদ্ধতিতে একইসঙ্গে মুগ্ধ এবং বিরক্তও হয়েছি বটে। বিরক্ত হবার কারণ হচ্ছে লেখক এত ডিটেইলিং করেছে যে মনে হচ্ছিল ক্রিপ্টোগ্রামের ক্লাস করছি। তবে তা যে গল্পের স্বার্থেই করা, তা গল্প খানিকটা আগালেই টের পাওয়া যায়। এছাড়া ইলিয়াস আর রোকসানাকে প্রেমটাকে কেমন যেন জোর করে চাপিয়ে দেয়া ধরণের মনে হতে পারে। যদিও তদন্তের বিচারে তাই যুক্তিযুক্ত ছিল।

তবে গত শতকের ডিটেকটিভ উপন্যাস; কথাটা শুনতেই আধুনিক কালের পাঠকের মনে যে ব্যাকডেটেড কাহিনীচিত্র ফুটে ওঠে; তার ছিটেফোঁটাও ছিল না এই উপন্যাসে। বরং অনেক বেশী সমসাময়িক মনে হয় কাহিনীর প্রেক্ষাপটে। আর লেখকের যে পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনাভঙ্গি; সত্যিই টাসকি খাবার দশা। পারফেক্ট না বললেও সময়কাল ও অন্যান্য ব্যাপারগুলোকে বিবেচনায় নিলে দুর্দান্ত বলতেই হয়।
বাস্তবধর্মী তদন্ত, মৌলিক তদন্ত পদ্ধতি, ক্রিপ্টোগ্রাম, ছদ্মবেশ, অদৃশ্য কালির ব্যবহার, প্রেম, সাবপ্লট বর্ণনা এবং টান টান উত্তেজনা – পুরো বইটাতে একজন রহস্য প্রেমী উক্ত ব্যাপারগুলো দারুণভাবে উপভোগ করবে। ৮৪ পৃষ্ঠার এই বইটি পড়তে খুব বেশী একটা সময় লাগবে না। বরং এক বসাতেই পড়ে ফেলা সম্ভব। তাহলে নিজেই জেনে নিন না ৩৪ বছর বাক্সবন্দী থাকা উপন্যাসটি সম্পর্কে। যদিও পিডিএফ পড়েছি তবুও বইটির প্রিন্টেড কপি কেনার আগ্রহ প্রকাশ করছি সংরক্ষণের জন্য। বইটির পিডিএফ লিংক এখানে।
বই: জাল
লেখক: আবু ইসহাক
ধরন: ডিটেকটিভ উপন্যাস
প্রকাশনী: প্রান্তিকা
প্রকাশকাল: ১৯৮৯
Feature Image: roar.media
