বেশ্যাখানায় কোন হিন্দু-মুসলমান হয় না। বড় বড় পণ্ডিত আর মৌলভীও এখানে এসে ভদ্র হয়ে যায়।
– সাদাত হাসান মান্টো
পাঞ্জাবের এক মুসলিম পরিবারে জন্ম লোকটার। তবে জাতিগতভাবে কাশ্মিরী সে। গুরুজির পরামর্শে আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্য বিষয়ে ভর্তি হন। সে সময়ের সমসাময়িক পত্রিকাগুলোতে বেশ কিছু গল্প ছাপান। খানিকটা সুনাম হলে রেডিও নাটক লেখার বেশ কিছু প্রস্তাব পান লোকটা এবং লিখেও ফেলেন। মোটামুটি এরপর থেকেই পাকিস্তানে জন্ম নেয়া লোকটা ভারতের প্রভাবশালী একজন সাহিত্যিক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করে ফেলেন।
গল্পের ভাজে বাস্তবতাকে তুলে ধরা এবং ঘুনে ধরা সমাজের অবক্ষয়ের রূপ কতটা ভয়াবহ এসব নিয়ে লিখেই মূলত তিনি আলোচিত এবং সমালোচিত হয়েছিলেন। অথচ কেবল মুসলমান হওয়ার দোষে এবং নিজের পরিবারের নিরাপত্তার কথার চিন্তা করে এত প্রভাবশালী লেখক হয়েও স্থান নেন শরনার্থী শিবিরে। কেবল মুসলান হওয়ার জন্য নিজের চাকরি হারাতে হয়েছে, যেই বোম্বেতে তার সারাটাজীবন কেটেছে সেই বোম্বে কেমন হুট করেই অচেনা হয়ে গেল, তাড়িয়ে দিল তাকে মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে- এই ব্যাপারগুলো তাকে বেশ নাড়া দেয় যার ফলশ্রুতিতে তার সৃষ্ট সাহিত্যকর্মের বিচারে উর্দু সাহিত্যের ছোট গল্পের ঈশ্বর হিসেবে তাকে মানা হয়।
If you cannot bear these stories then the society is unbearable. Who am I to remove the clothes of this society, which itself is naked. I don’t even try to cover it, because it is not my job, that’s the job of dressmakers.
– সাদাত হাসান মান্টো
ঠান্ডা গোশত মূলত সাদাত হাসান মান্টোর লেখা জনপ্রিয় একটা গল্পের নাম। সেই গল্পের নামেই এই গল্পগ্রন্থটির নামকরণ করা হয়েছে। উক্ত গল্পটি ছাড়াও নির্বাচিত আরো সাতটি গল্প আছে বইটিতে৷ অনিক শাহরিয়ারের অনুবাদে বইটি প্রকাশ করেছে আনন্দম প্রকাশনী৷ অনেকেই হয়তো এই প্রথম এই প্রকাশনীর নাম শুনছেন, কেননা প্রকাশনীর বয়স খুব বেশী হলে দুই থেকে তিন বছর। আমি নিজেও এই প্রথম এই প্রকাশনীর কোন বই কিনলাম।
গাউন পেপারে ছাপানো এই গল্পগ্রন্থটার প্রচ্ছদ এভারেজ লাগলেও বইটার গেটআপ আর মেকআপ ভালো লেগেছে আমার কাছে। ইদানীংকালে গল্পগ্রন্থগুলো গাউন পেপারেই করা হচ্ছে দেখি৷ ইভেন আমার নিজের অনুবাদও গাউনেই করা। (ফ্রি তে একটু প্রচার করে নিলাম আর কি)। পাশাপাশি, বইটার বাইন্ডিংও খুবই ভালো তবে মূল সমস্যা এবং বিরক্তির বিষয় হচ্ছে বইটার ফন্ট। সাধারনের তুলনায় একটু কম হলে মানা যায় কিন্তু অতিরিক্ত ছোট ফন্ট হওয়াতে পড়তে খুব ঝামেলা হয়েছে। আর আমার মতো যাদের চোখে সমস্যা অথচ চশমা পড়েন না তাদের ক্ষেত্রে এই বিরক্তিটা একটু বেশীই হওয়ার কথা৷ আর শব্দগত ভুলও আছে বেশ কিছু কিন্তু সেগুলো নিয়ে পরে বলছি।

লোকেরা নিজেদের ভাগ্য ফেরানোর জন্য এমন এক ফকিরের কাছে ধর্না দেয় যার নিজের ভাগ্যই জং ধরা তালার মতো বন্ধ।
– সাদাত হাসান মান্টো
মোট আটটি গল্প আছে বইটিতে৷ গল্পগুলো হচ্ছে- খুলে দাও, কালো সালোয়ার, শাহদৌলার ইঁদুর, টোবা টেক সিং, লাইসেন্স, গুরুমুখ সিং এর উইল, খোদার কসম এবং ঠান্ডা গোশত। অবশ্য বইটির শুরুতেই সাদাত হোসেন মান্টো প্রসঙ্গে কিছু কথা এবং উনার একটা ছবি পাবেন। তো চলুন প্রতিটা গল্প থেকেই খানিকটা করে আলোচনা করি৷
খুলে দাও – বৃদ্ধ সিরাজউদ্দিন রিফিউজি ক্যাম্পের ঠান্ডা মাটিতে শুয়ে আছেন। চারিদিকে প্রচন্ড কোলাহল কিন্তু সিরাজউদ্দিন কিছুই শুনতে পাচ্ছেন না। বারবার তার চোখে ভাসছে একটা ভয়ংকর দৃশ্য। আগুন, লুটপাট, মানুষের ছোটাছুটি, একটা স্টেশনে প্রচন্ড গোলগুলি…তারপর রাত এবং সখিনা। ঐ সময়টাতেই সিরাজউদ্দিন বউ অর্থাৎ সখিনার মা নিজের প্রাণ দিয়ে সিরাজউদ্দিনকে বলেছিল সখিনাকে নিয়ে পালিয়ে যেতে। পালানোর সময় খেয়াল ছিল না কিন্তু যখন এই রিফিউজি ক্যাম্প এলো সিরাজউদ্দিন তখন কোথায় খুঁজে পেল না সখিনাকে৷
কালো সালোয়ার – খোদাবক্স একজন ফটোগ্রাফার৷ ইংরেজদের ছবি তুলেই আয় রোজগার করে৷ কোন একভাবে তার সুলতানার সাথে পরিচয় হয় এবং তারপর থেকে দুজনে একসাথেই থাকে। আম্বালায় দুজনেরই ব্যবসা বেশ ভালোই জমে উঠেছিল। সুলতানার দেহব্যবসায় খদ্দেরের অভাব পড়ে না আর ফটোগ্রাফিতে ইংরেজ বাবুদের কাছে খোদাবক্সের নামের জুড়ি মেলা। কিন্তু অজানা এক কারনে খোদাবক্স সুলতানাকে সাথে নিয়ে দিল্লী চলে আসে। কিন্তু দিন যায়, সপ্তাহ যায়, মাস যায় জমানো টাকা এমনকি সুলতানার গয়নাগুলো পর্যন্ত বিক্রি করে দিতে হয় কিন্তু তাদের ধান্ধা বা ব্যবসা আর জমে না। সামনেই মহরম তাই সুলতানা খোদাবক্সের কাছে অনুনয় করে একটা কালো সালোয়ারের জন্য৷ কিন্তু খোদাবক্সের কাছে কোন ফুটাকড়িও নেই।
শাহদৌলার ইঁদুর – সেলিমার বিয়ে হয়েছিল একুশ বছর বয়সে। কিন্তু বিয়ের পাঁচ বছর হয়ে যাওয়ার পরও সেলিমার কোন ছেলেপেলে হয়নি। এ নিয়ে সেলিমার দুঃখের কোন সীমা নেই। সেলিমার থেকে বয়সে পাঁচ বছরের ছোট ফাতেমার কোলেও একটা ফুটফুটে সন্তান আছে অথচ এই মেয়েকে সবাই বন্ধ্যা ডাকতো। ফাতেমা জানায়, গুজরাটে শাহদৌলার মাজারে প্রার্থনা করলে সন্তান হয় তবে প্রথম সন্তান শাহদৌলা সাহেবের জন্য কুরবান করতে হয় মানে সেখানে রেখে আসতে হয়। কথামতো কাজ করে সেলিমার সন্তান আসে তার কোলজুড়ে কিন্তু শর্ত মানতে নারাজ সেলিমা। নাড়ি ছেড়া সন্তানকে কোন মা পারবে এভাবে ফেলে রেখে আসতে? সেলিমা তাই ভাবে।
টোবা টেক সিং – দেশ বিভাগের ২/৩ বছর পর দুই দেশের সরকারেরই হঠাৎ করে মনে হলো দেশের নাগরিকদের সাথে পাগলদের ভাগ করা হয়নি। তাই সিদ্ধান্ত নেয়া হলো একটা নির্দিষ্ট দিনে হিন্দু পাগলদের হিন্দস্তানে আর মুসলিম পাগলদের পাকিস্তানে পাঠানো হবে। এই খবর শুনে পাগলরা আরো বেশী পাগলামী শুরু করলো। এদের মধ্যে একজন ছিলেন ভিসন সিং। তবে সবাই তাকে টোবা টেক সিং নামেই চিনে। কেননা কথিত আছে, টোবা টেক নামক জায়গার জমিদার ছিল সে। একদিন হঠাৎ করেই মাথায় গণ্ডগোল দেখা দেয়। তারপর থেকেই এই পাগলাগারদে পড়ে আছে। হিন্দুস্তান আর পাকিস্তান নামক এই দ্বন্দ্বে টোবা টেক সিং আরো অনেক বেশী চিন্তিত হয়ে পড়ে তার টোবা টেক নামক ঐ জায়গা নিয়ে। কিন্তু কেউ বলতে পারে টোবা টেক কোথায় পড়েছে।
লাইসেন্স – অব্বু একজন কোচোয়ান। ওর ঘোড়া আর টাঙ্গার খ্যাতি শহরজোড়া। একদিন নিতি নামক এক সুন্দরী অব্বুর টাঙ্গায় চড়ে বসে৷ আর ঠিক তখনি অব্বু ঠিক করে নেয় এই মেয়েকেই বিয়ে করবে৷ নিতিও মনে মনে রাজি হয়ে যায়। সুখেই কাটে দুজনের সংসার। কিন্তু হঠাৎ একদিন নিতির পরিবার মামলা ঠুকে দেয় অব্বুর নামে। অব্বুর জেল হয়ে যায়। অব্বুর টাঙ্গা চালিয়ে রোজ সন্ধায় এসে পয়সা দিয়ে যেত দীনা। কিন্তু অসুস্থতায় অব্বু যেদিন মারা গেল তারপর থেকেই দীনা নিতিকে বিবাহের প্রস্তাব দিতে লাগলো। নিতি একের পর এক কোচোয়ানের দ্বারস্থ হয় কিন্তু দিনশেষে সবাই নিতিকে বিবাহ নাহয় শরীর ভোগের প্রস্তাব দেয়।
গুরমুখ সিং এর উইল – মিয়া আব্দুল হাই অবসরপ্রাপ্ত সাব-জজ। এক ছেলে আর এক মেয়ে নিয়েই তার সংসার। আর আছে পরিবারের বেশ পুরানো এক বৃদ্ধ চাকর। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা চলছে, ক্ষণে খুন-খারাবী, রাহাজানি হচ্ছে। থেকে থেকে ভেসে আসে ‘হর হর মহাদেব’ কিংবা ‘আল্লাহু আকবার’ স্লোগান। এ এক ভয়ঙ্কর অবস্থা। মিয়া সাহেব ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়েন। পক্ষাঘাতগ্রস্থ হয়ে পড়েন, ওদিকে বাড়ির বৃদ্ধ চাকরটাও চলে যায় কোথাও, মেয়েটা বয়সে বড় তাই ছোট ভাই আর বাবাকে নিয়ে বেশ চিন্তায় ভুগছে ও। এমনি সময় দরজার কড়া নাড়ে কেউ।
খোদার কসম – সময়টা উনিশ’শ আটচল্লিশের শুরু। খুব সম্ভবত মার্চ মাসের ঘটনা। এক অফিসারের মুখে একটা গল্প শুনেছিলেন গল্পকথক। নতুন শহরে এসে সে এক বৃদ্ধা মুসলমানকে দেখেছিল। উদাস চোখ, ময়লায় জটপাকানো চুল, পরনে জোড়াতালি দেয়া কাপড়। না নিজের প্রতি, না জগত সংসারের প্রতি মহিলার কোন খেয়াল আছে। কিন্তু তার চোখ দেখেই বুঝা যায় সে কাউকে তন্ন তন্ন করে খুঁজছে।
ঠান্ডা গোশত – ঈশ্বর সিং এর সাথে কুলবন্ত করের একটা সম্পর্ক আছে। হোক তা দৈহিক হোক তা মনের দিক থেকে। তবে দেখতে বড়সড় কুলবন্তকে মাঝে মাঝে ভয় পায় ঈশ্বর সিং নামক শক্তপোক্ত ঐ পুরুষ মানুষটাও। রাত বাড়ে প্রেমের মাতালতা বৃদ্ধি পায়, কুলবন্তের দেহ নেশাচরের মতো পেতে চায় ঈশ্বর সিংয়ের স্পর্শ। কিন্তু শত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও ঈশ্বর সিং দৈহিক সুখ দিতে অপারগ হয় আর সেই রাগে ক্ষোভেই ঈশ্বরের গলায় কৃপাণটা চালিয়ে দেয় কুলবন্ত। ফিনকি দিয়ে ছোটে রক্ত।

সবার প্রথমে যে অজানা এক লোকের ইতিহাস পড়েছেন সেটা আর কেউ নয় উর্দু সাহিত্যের কালজয়ী ছোটগল্পকার সাদাত হাসান মান্টো। ১৯১২ সালের ১১ই মে তার জন্ম হয়েছিল। তার লেখা প্রতিটি গল্পেই উঠে এসেছে সমাজের অন্ধকার দিকগুলো। আর সেইসব গল্প লেখার জন্য তাকে বহুবার আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছিল। নিজের ওকালতি নিজেই করেছেন। তবুও তিনি অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি এবং বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে লিখে গেছেন একের পর এক বাস্তববাদী সত্য গল্প।
দেশ বিভাগের আগে তিনি বোম্বে শহরে বহুল পরিচিত এবং সম্মানিত স্ক্রিপ্ট রাইটার হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বহু বিখ্যাত সিনেমার স্ক্রিপ্ট তার লেখা। জানলে অবাক হতে পারেন যে, মান্টো প্রায় প্রায়ই পত্রিকা অফিসে এসে টাকা চাইতেন আর তখন সম্পাদক সাহেব তার কাছে নতুন কোন গল্প চাইতেন। অফিসে বসেই কিংবা অফিসের গেটের কাছে বসেই লিখে ফেলতেন অমর সাহিত্য।
জীবদ্দশায় তিনি কোন সম্মান পাননি কিন্তু তিনি বেঁচে থাকা অবস্থাতেই ভারত এবং পাকিস্তান উভয় দেশই তাকে নিজেদের বলে দাবী করতো এবং তার লেখা গল্পগুলোকে তাদের সাহিত্যের অমর সৃষ্টি বলে মান্য করতো। ১৯৫৫ সালে অতিরিক্ত মদ্যপানের জন্য মাত্র ৪৩ বছর বয়সেই ইহলোক ত্যাগ করেন উর্দু সাহিত্যের ছোট গল্পের ঈশ্বর খ্যাত সাদাত হাসান মান্টো।

অনুবাদক অনিক শাহরিয়ার। অনেকের কাছে নামটা পরিচিত হতে পারে আবার অনেকের কাছে নামটা অপরিচিতও হতে পারে। কেননা এই অনুবাদকের প্রকাশিত অনুবাদের সংখ্যা কেবল দুই। তবে বেশ কিছু ভালো গল্প সংকলনে কাজ করেছেন। আর তাছাড়া একাধিক সাহিত্য পত্র-পত্রিকায় তার লেখা ছাপানো হয়েছে। অনুবাদকের প্রথম অনুবাদ গ্রন্থ নিক পিরোগের এরাইভাল।
মূল প্রসঙ্গে আসি, অনুবাদ সাবলীল এবং প্রাঞ্জলময় ছিল। পড়তে খুব বেশী সমস্যা হয়নি। গল্পের সাথে অনুবাদের ধারাবাহিকতা বজায় ছিল বলতে গেলে। তাই, অনুবাদ নিয়ে কোন কথা বলছি না কিন্তু অন্য কিছু বিষয় নিয়ে না বলেও পারছি না। প্রথমত, কিছু বাক্য দেখে মনে হয়েছে বাক্যটা পরিপূর্ণ হয়নি। বাক্যে উপস্থিত শব্দগুলো এদিক-সেদিক করলে ভালো হতো। অবশ্য এখানে কথা থাকে যে, এটা অনুবাদকের একান্ত ব্যক্তিগত স্টাইল বলেও গন্য হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, গল্পে ২/৩ জায়গায় কিছু কঠিন শব্দের ব্যবহার। তৃতীয়ত, প্রুফ রিডিং না করার ফলাফল। যেমন, খোদাবক্স হয়ে গেছে খোদা বক্স, একবার সঙ্কর আরেকবার শঙ্কর, এরকম আরো কয়েকটা আছে কিন্তু এই মুহুর্তে আর মনে আসছে না। আর প্রধান সমস্যাটা হচ্ছে ঐ ফন্টের বিরক্তি। ঐ বিরক্তিটাই মূলত এই ছোটখাটো ভুলগুলোকে আরো বেশী ফুটিয়ে তুলেছে। তবুও এতকিছুর পরেও আবারো বলছি অনুবাদ সাবলীল এবং অনর্গলভাবে পড়ে যাওয়ার জন্য উপযুক্ত।

মান্টোর নাম অনেক শুনলেও এই প্রথম মান্টোর লেখা পড়া। মান্টোর লেখা আপনাকে একদম ভিতর থেকে নাড়িয়ে দিবে। আপনাকে নতুন করে ভাবতে শিখাবে। জীবনের অন্য রূপটাকে দেখতে শিখাবে। মান্টোর গল্পগুলো জীবনবোধের কথা বলে, মানুষের চরম অসহায়ত্বের কথা বলে, নারী সত্ত্বার বেঁচে থাকাটাই যে একটা অভিশাপ সেই ধরনের কথা বলে, সমাজের অন্ধকার দিকের কথা বলে, মানুষের ভেতরের রূপটাকে ফুটিয়ে তুলে এবং সাম্প্রদায়িকতার কথা বলে।
গল্পগুলো খুব বেশী বড় না যার ফলে প্রাসঙ্গিক আলোচনায় যেতে পারছি না স্পয়লারের ভয়ে। সবগুলো গল্পই ভালো লাগলেও সবচাইতে বেশী ভালো লেগেছে খুলে দাও, কালো সালোয়ার, লাইসেন্স এবং গুরুমুখ শিং এর উইল এই চারটা অদ্ভুত ভালো লেগেছে আমার। গল্পগুলা পড়ে থ হয়ে বসেছিলাম। একদম ভেতরে নাড়া দিয়েছিল গল্পগুলো।
আর হ্যাঁ, বলে নেয়া ভালো যে মান্টোর লেখা পড়া এবং ধারণ করার জন্য মানসিক শক্তির দরকার কেননা যেই গল্পই পড়েন না কেন পুরোটা গল্পই একদম সহজ-স্বাভাবিক মনে হলেও একটা লাইনে আপনি এমন ধাক্কা খাবেন যে থ হয়ে যাবেন। আবার অনেকের কাছে ভালো নাও লাগতে পারে। আসলে আপনি এই সময়ে বসে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাকালীন সময়ের অবস্থাটা বুঝবেন না তাই হয়তো গল্পগুলার গভীরতা আপনি মাপতে পারবেন না। তবে দেশভাগ সংক্রান্ত লেখা যদি আগে পড়ে থাকেন তাহলে অবশ্যই এই গল্পগুলো আপনাকে নতুন করে ভাবাতে বাধ্য করবে।
বইয়ের কিছু উক্তি যা ভালো লেগেছে:
Some people kiss as if they were eating watermelon. – সাদাত হাসান মান্টো
মেয়েরা তো হয়ই কিছুটা অন্ধবিশ্বাসী। – সাদাত হাসান মান্টো
দুনিয়াতে এমন কিছু কথা আছে যা জিজ্ঞেস করতে হয় না, বুঝে নিতে হয়। – সাদাত হাসান মান্টো
দুনিয়াতে এমন মা কি সত্যিই আছে যে নিজের বাচ্চাকে চিরদিনের জন্য আলাদা করে রাখতে পারে। – সাদাত হাসান মান্টোএমন অনেক মেয়েই আছে যারা পরাজয়ের কথা স্বীকার করবে। কিন্তু হাজারও লক্ষ মেয়ে আছে যারা মনে মনে এমন পরাজয় হাজার বার মেনে নিয়েছে। – সাদাত হাসান মান্টো
ভাগিয়ে নিয়ে যাওয়া শব্দটা তো রোমান্টিক একটা শব্দ। যেখানে নারী এবং পুরুষ দুই-এরই মতামত থাকে। ভেগে যাওয়া তো এমন এক খাদ, যেখানে ঝাপ দেয়ার আগে দুজনের সপ্তরিপু একবার ঝনঝন করে নেচে ওঠে৷ – সাদাত হাসান মান্টো
উর্দু সাহিত্যের ছোটগল্পের ঈশ্বর খ্যাত এই লেখকের জন্মদিন আজ। তাই পুরনো রিভিউটাকেই নতুন করে আবার দেয়া।
বই: ঠান্ডা গোশত ।। লেখক: সাদাত হাসান মান্টো ।। অনুবাদক: অনিক শাহরিয়ার ।। প্রকাশনী: আনন্দম ।। প্রকাশকাল: অমর একুশে বইমেলা ২০১৯ ।। পৃষ্ঠা: ৫৬ ।। মলাট মূল্য: ১৩৫ /- টাকা
