Crafting Ideas Into Impactful Content

ছায়া সময়: বিষণ্ণতায় মাখা এক সামাজিক থ্রিলার

যাক অবহেলে দূরে সে যখন চায়
যাক নিরাবেগ নিষ্ঠুর
আমি সমর্পণ করলাম আমার প্রেম, কাম আর দ্রোহ
আমি এখন আর কিছু নই
হাওয়ার সাথে মিশে যাওয়া রোদ্দুর।

– শরীফুল হাসান

বাড়িতে নাড়ির টান থাকে। আর তাই হয়তো বাড়ি প্রতিশোধও নেয়। কথাটা কতটুকু সত্যি আর কতটুকুই বা মিথ্যা? নাকি কেবল কুসংস্কার, তা নিয়ে বিস্তর আলোচনা করেও বিশেষ কোন লাভ নেই। কেননা, পৃথিবীটা একটা ঘূর্ণায়মান চাকার মতোই। আপনি যেমনটা করবেন একটা নির্দিষ্ট সময় পর ঠিক তেমনটাই ফেরত পাবেন। আর সেরকমই জোয়ার ভাটার গতির মতোই একটা গল্পের একটি বাড়ির নাম শ্রীলেখা ভবন। মায়ের দরবারে ভোগ দিয়ে তবেই এই বাড়ির ভিত গেড়েছিল চক্রবর্তী পরিবার।

নতুন দেশ, নতুন শহর, নতুন মানুষ – সবকিছুকেই আপন করে নিয়েছিল পরিবারটা। কিন্তু তারপর একদিন সেই মায়ের মতো শ্রীলেখা ভবন ছেড়ে নীরবে নিভৃতে চলে যায় পরিবারটা। সন্ধ্যায় মঙ্গলের জন্য উলুধ্বনি আর কেউ বাজায় না; উঠোনের তুলসী গাছটা জল আর যত্নের অভাবে খসে পড়ে; শ্রীলেখা ভবন হু হু করে কেঁদে ওঠে।

এক সন্ধ্যায় শ্রীলেখা ভবনে অন্য কারো পায়ের ছাপ পড়ে। শ্রীলেখা ভবন বুঝে নেয় এখন থেকে এই পায়ের ছাপটাই তার বুকে দীর্ঘ সময় জুড়ে রাজত্ব করবে। সেই লোকটার পরিবার ধীরে ধীরে বড় হয়; আর শ্রীলেখা ভবনের চোখের সামনেই বাড়িটা আকন্দ বাড়িতে পরিণত হয়। তবে শ্রীলেখা ভবনের উত্তরসূরিরা বাড়িটার এক কোণে বসে তখনো প্রার্থণায় রত।

একদিন সেই প্রার্থণার উত্তর দেয় শ্রীলেখা ভবন। আকন্দ পরিবারে ধ্বস নামতে শুরু করে। ভোরে ফজরের আজান শুনে গেট খুলে আর কেউ আকন্দ বাড়ির বুকটাতে দাঁড়ায় না; সারারাতের পিপাসার্ত উঠানটাকে আর কেউ ওজুর পানি দিয়ে তেষ্টা মেটায় না; আকন্দ বাড়িটাও শ্রীলেখা ভবনের মতোই প্রতিদিন নিত্যনতুন হাহাকারে হু হু করে কেঁদে ওঠে। কে জয়ী হয় এ খেলায়? শ্রীলেখা ভবন নাকি আকন্দ বাড়ি? এক পাগল এই বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে তাই ভাবে – বাড়িতে নাড়ির টান থাকে। আর তাই হয়তো বাড়ি প্রতিশোধও নেয়।

জীবনে স্বার্থ ছাড়া চলা মুশকিল, আবার অতিরিক্ত স্বার্থপরতা নিজের ভেতরটাকে কেমন শুষ্ক, জলহীন মরুভূমি করে তোলে।

– শরীফুল হাসান

© Wazedur Rahman Wazed

কথা বলছিলাম শরীফুল হাসানের সামাজিকতার মোড়কে গাঁথা থ্রিলার উপন্যাস ছায়া সময় বইটি নিয়ে। অমর একুশে বইমেলা ২০১৯ এ বাতিঘর থেকে প্রকাশিত বইটি ইতিমধ্যেই পাঠকদের মন জয় করতে সক্ষম হয়েছে। বইটির প্রচ্ছদ শিল্পী হিসেবে কাজ করেছেন জিয়াউদ্দিন বাবু। সাদামাটা একটা প্রচ্ছদও কি করে আকর্ষণীয় করা যায়; হয়তো এমনটা ভাবনা ছিল প্রচ্ছদ শিল্পীর। ধন্যবাদ তার অবশ্যই প্রাপ্য। বাতিঘর প্রকাশনীর বইয়ের পাতা, বাঁধাই এসব নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই; কেননা কমবেশি সবারই তা জানা।

সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ। স্বাধীনতা অর্জন করেছে এক দশকও হয়নি দেশটার। এরিমধ্যে দুর্নীতি, দুর্ভিক্ষ, রাষ্ট্রপতিকে স্বপরিবারে হত্যা, স্বৈরাচারী শাসন প্রতিষ্ঠা – এসবে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে দেশ আর দেশটার জনগণ। নতুন দেশে গড়ে উঠছে নতুন নতুন শহর; আর সেসব নতুন শহরে গড়ে উঠছে নতুন নতুন পারিবারিক বংশবিস্তার। সেরকমই একটা নতুন শহর ময়মনসিংহ আর সেরকমই একটা পরিবারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা গল্পের নাম ছায়া সময়

আর আশির দশকের সেই ছায়া সময়টাতেই আবার ওপাড় বাংলায় নকশালবাদী আন্দোলন মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। যার জন্য সাম্প্রদায়িকতার যে শক্তি স্বাধীনতার বীজ বুনেছিল; ঠিক ঐ একই শক্তিই কি করে যেন পালটে অসাম্প্রদায়িকতায় পর্যবসিত হয়েছে – তা কেউ বলতেও পারবে না। ঠিক তেমনি অনিমেষ চক্রবর্তী বলতে পারবে না, কি করে তাদের শ্রীলেখা ভবনের নামটা আকন্দ বাড়িতে পরিণত হলো; আর কি করেই বা চক্রবর্তী পরিবারের পরম বন্ধু করিম আকন্দ সেই চক্রবর্তীর পরিবারেরই চরম শত্রু হয়ে গেল? 

করিম আকন্দ হলো আকন্দ পরিবারের প্রধান। একান্নবর্তী পরিবারটার লাগাম টেনে রেখেছেন একা হাতে তিনি। তবে বয়সের ভারে নুব্জ্য হতে থাকা করিম আকন্দ এখন আর শহর জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ব্যবসার খোঁজ খবর নিতে পারেন না। তাই, তার ব্যবসার লাগামটা টেনে ধরেন তার বড় ছেলে কামরুল আকন্দ। কামরুল পালিত সন্তান হলেও করিম আকন্দ আর তার স্ত্রী জেবুন্নেসার কাছে আপন সন্তানের চাইতে কম কিছু নয়। বড় মেয়ে আমিনার জামাই ইউসুফ জালালও কামরুলের সাথে শহরের সবচাইতে বড় দোকানটাতেই বসে। 

আসলে স্থান, কাল আর বস্তুর সাথে আমরা মানুষকে মিলিয়ে ফেলি, ভিন্ন কোন জায়গায় তার অবস্থান মাঝে মাঝেই আমাদের মধ্যে অনাস্থা তৈরি করে, তখন চোখে দেখা জিনিসও বিশ্বাস হতে চায় না।

– শরীফুল হাসান

কলকাতার অভিযান পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত বইটির প্রচ্ছদ। Image Source: facebook.com/abhijanpublishers

একদিন সকালের রোদমাখা আবহাওয়ায় কে বা কারা এসে কামরুলকে গুলি করে ফেলে রেখে যায়। পুরো আকন্দ পরিবার কেঁপে উঠে রাগে, ক্ষোভে আর দুঃখে। কামরুলের চাচাতো ভাই আলম আকন্দ – যে কিনা নির্বাচনে দুই দুইবার ব্যর্থ হয়ে এবার কামরুলের সহায়তা নিয়েছিল; নির্দ্বিধায় প্রতিপক্ষ কাশেম আলীকে দোষারোপ করে এর জন্যে। অন্যদিকে, জলিল আর খলিল আকন্দ দুই ভাই এসে বড় ভাই করিম আকন্দের কানে কানে বলে যায়, অনিমেষ চক্রবর্তীর ভাস্তে তপন ওপাড় থেকে এসেছে এই ঘটনার ঠিক দুই দিন আগে – যে কিনা একজন নকশালবাদী; হয়তো নিজেদের ভিটেমাটি শ্রীলেখা ভবন ফেরত পাবার আশায়ই এই কাজ করেছে। 

শুধু তাই নয় একমাত্র চাক্ষুস সাক্ষী ইউসুফ জালালও নাকি খুনিকে দেখেনি আর তাই তার উপরও সন্দেহটা ন্যূনত্ব কম করে না কেউ। আবার করিম আকন্দের ছোট দুই ভাইয়ের ছেলে – সেলিম আর দুলাল, বখাটে হিসেবে যাদের শহর জুড়ে বেশ নাম – তাদেরকেও সন্দেহের বাইরে রাখে না কেউ। সর্বোপরি শহরের সবচাইতে বড় ব্যবসার হাল ধরা আর করিম আকন্দকে পঙ্গু করে দেয়ার জন্যই যে এমনটা করা তা বুঝতে খুব দেরি হয় না সকলের। এত দুঃখ-দুর্দশার মধ্যে ছোট ছেলে রহমান নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ে। 

অনিমেষ চক্রবর্তীর একমাত্র মেয়ে অনন্যা চক্রবর্তী; যারা কিনা আকন্দ বাড়ির পেছন দিকটাতে এখনো শ্রীলেখা ভবন মনে করে আঁকড়ে আছে। অসাম্প্রদায়িক সেই উত্তাল সময়টাতে সনাতন ধর্ম্বালম্বী এই মেয়েটা ভালোবেসে ফেলে আকন্দ পরিবারের কামরুলকে। অথচ সহদেব সাহার ছেলে, তার ছোটকালের বন্ধু অর্ণব সাহার ভালোবাসাটাকে ঠুনকো মনে হয় অনন্যার কাছে। একদিকে অর্ণবের ঠুনকো ভালোবাসা, অন্যদিকে কামরুলের সাথে ধর্মের বিশাল ফারাক আর পারিবারিক শত্রুতার জের; অনন্যা নিজেকে যেন হারিয়ে ফেলে সেই ছায়া সময়ে। 

কামরুল আকন্দকে গুলি করলো কে? আর যেই গুলি করুক না কেন এর পেছনে কার হাত আছে? মেয়ের জামাই ইউসুফকেই বা কতটুকু বিশ্বাস করা যার – যে কিনা চাক্ষসু সাক্ষী হয়েও খুনির কোন বিবরণই দিতে পারে না? আর করিম আকন্দের ভাই এবং ভাস্তেরা যারা কিনা করিম আকন্দের চাইতে তার সম্পত্তিকেই বড় বেশি ভালোবাসে? অনন্যা কিংবা অর্ণব এর গল্পের শেষটাই বা কি হয়? এসবই কি কারো চাল নাকি বাড়ির অভিশাপ? শ্রীলেখা ভবনই কি তবে আকন্দ বাড়ির উপর প্রতিশোধ নিচ্ছে? 

বেশিরভাগ মানুষই তাই, প্রয়োজনে চেহারায় অভিব্যক্তি বদলায়। সময়ে পা ধরে, অসময়ে লাথি ঝাড়ে।

– শরীফুল হাসান

Image Source: facebook.com/sharifulhasan

লেখক শরীফুল হাসানের নিজের শহরই ময়মনসিংহ। পড়াশুনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগ থেকে। বর্তমানে বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত। লেখালেখির জগতে পদার্পনটা অনুবাদ সাহিত্য দিয়ে। মেইজ অব বোনস, ডার্কলি ড্রিমিং ডেক্সটার এবং কন্ট্রাক্ট উইথ গড ছিল তার প্রথম দিককার অনুবাদ সাহিত্য। কিন্তু শরীফুল হাসানকে মৌলিক সাহিত্য যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছিল প্রতিনিয়ত। আর সেই সুবাদেই প্রথম উপন্যাস সাম্ভালা প্রকাশ।

প্রথম উপন্যাসের পাঠকপ্রিয়তাই তাকে বাধ্য করে সাম্ভালা ট্রিলজি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে। এমনকি সাম্ভালার জনপ্রিয়তা দেশের গণ্ডি পেড়িয়ে ভারতের কলকাতার অভিযান পাবলিশার্স থেকেও প্রকাশ পায়। এছাড়া ঋভু, আঁধারের যাত্রী, মেঘ বিষাদের গল্প, রাত্রি শেষের গান, জনারণ্যে কয়েকজন একা – তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহের নাম। ২০১৬ সালে শিশু ও কিশোর সাহিত্য পুরষ্কার পেয়েছেন অদ্ভুতুড়ে বইঘর বইটি রচনা করে।

কবিতা লেখা আসলে একটা অঙ্কন প্রক্রিয়া। বুকের গভীরতম প্রদেশের অনুভব লেখায় আসে না। আঁকায় আসে। গদ্যে এই ভাব লিখে প্রকাশ করতে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা যায়, কিন্তু কবিতার কয়েক লাইনই আঁকা যায় মনের গভীরতম ইচ্ছা, আবেগ আর ভালোবাসার জটিল কুটিল পথ।

– শরীফুল হাসান

© Wasee Ahmed Rafi

যারা আশি-নব্বই দশকের প্রজন্ম; তাদের কাছে সেই সময়টার চাইতে সুখের আর স্মৃতিময় সময় আর দ্বিতীয়টা নেই। সত্যিকার অর্থেই সে সময়টা আমাদের কাছে এখনো এক ছায়া সময়। এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা কখনোই সেই সময়টার অনুভূতিটাকে ঠিক বুঝে উঠতে পারবে না। শরীফুল হাসানের ছায়া সময়ে সেই আশি-নব্বইয়ের দশকের অনুভূতিটা ফুটে উঠেছে। আমি বেড়ে উঠেছি পুরান ঢাকা আর নতুন ঢাকার মিরপুরে। মিরপুরটাকে বলতে গেলে নিজের চোখে গড়ে উঠতে দেখেছি। নির্জন এলাকা থেকে জনারণ্য হতে দেখেছি। কিন্তু কখনো মফস্বল বা গ্রামের বাড়ির স্বাদ আমার তেমন আপন করে পাওয়া হয়নি। 

তবে ছায়া সময়ের বর্ণনায় নিজেকে ময়মনসিংহে নিয়ে দাঁড়া করাতে সক্ষম হয়েছি। অর্ণবের সাথে চায়ের দোকানের আড্ডায় কিংবা অনন্যার কলেজের সামনে অপেক্ষায়; বড় বাজারের আকন্দ ট্রেডার্সে বসে এক কাপ চা খাওয়াতে কিংবা রাস্তায় দাঁড়িয়ে করিম আকন্দকে সালাম দেয়াতে; ব্রহ্মপুত্রের পাড় ঘেরা পার্কের বেঞ্চে বসে কাশেম আলীর বাঁশির সুরে কিংবা সন্ধ্যা নামলে রহমানের সাথে গাঞ্জার সুখটানে; কোহিনূর ডাকাতের সাথে কইতরির রঙ্গলীলা দর্শনে কিংবা ওসি আমিনউদ্দিনের সাথে অপারেশনে গিয়ে মশার কামড় খাওয়াতে; অনিমেষ চক্রবর্তীর সাথে তপনের গোপন ষড়যন্ত্রে কিংবা সহদেব সাহার সাথে অর্ণবের ঠোঁটকাঁটা স্বভাবে। প্রত্যেকটা জায়গায় নিজেকে খুঁজে পেয়েছি। বইটা পড়িনি বরংচ কোন এক উপায়ের বইটার ভিতরে ঢুকে স্বচক্ষে পুরো গল্প দেখে এসেছি আমি। আর এখানেই লেখক শরীফুল হাসানের সার্থকতা। 

তবে এই ঘুরে বেড়ানোর সময় বেশ কিছু বাঁধা পেয়েছি আমি। প্রথমত, গল্পের শুরুতে ডুবে যেতে আমার খানিকটা ইতস্তত বোধ হয়েছে। লেখকের লেখার সাথে প্রথম পরিচয় বলে নাকি আসলেই অন্য কিছু, তা আর খুঁজে বের করিনি। দ্বিতীয়ত, বানান ভুলে খুব বেশি বাঁধা দেয়। চলতি পথে ইটের খোয়াতে যেমন হোঁচট খেতে হয় ঠিক তেমনি কোন উপন্যাস বা গল্পে বানান ভুল হলেও পাঠক হোঁচট খায়। তৃতীয়ত, শুধুমাত্র বানান ভুল নয় বরংচ ভুলের বশে চরিত্রের নামে ভুল হলে কিন্তু পাঠক খেই হারিয়ে ফেলে। আর ছায়া সময়ে এই খেই হারানোর জায়গা তৈরি হয়েছে সম্পাদনার যত্নের অভাবে। গল্পের চরাই-উতরাই বাদে পাঠকের কাছে এসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বাঁধা বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। 

© Wazedur Rahman Wazed

এসবকিছু ছাপিয়ে শরীফুল হাসান আমাদের একটা গল্প বলেন যার নাম ছায়া সময়। যে গল্পটা কামরুল আকন্দ নামক করিম আকন্দের পালিত সন্তানের, যে কিনা গুলি খেয়ে কোমায় আছে। যে গল্পটা কামরুলের বোন জামাই ইউসুফ জালালের, যে কিনা শ্বশুরের দোকানের কর্মচারী আর বউয়ের মুখের ঝামটায় দিন পার করে। যে গল্পটা অনিমেষ চক্রবর্তীর মেয়ে অনন্যার, যে কিনা অর্ণবের কাছ থেকে অজান্তেই প্রত্যাখাত হয়ে ভালোবেসে ফেলেছে মুসলমান ছেলে কামরুলকে। যে গল্পটা সহদেব সাহার পুত্র অর্ণবের, যে কিনা অনন্যা আর এই ময়মনসিংহ দুইকেই প্রবলভাবে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকতে চায়।

যে গল্পটা আলাল মিয়ার, যে কিনা অন্যের বুদ্ধিতে অন্যের জন্যেই কুয়া খুঁড়তে গিয়ে নিজেই সে কুয়ায় পড়ে যায়। যে গল্পটা অনিমেষ চক্রবর্তীর, যে কিনা আকন্দ বাড়িকে ফের শ্রীলেখা ভবন বানাতে নাছোড়বান্দা। যে গল্পটা জলিল আর খলিল নামক করিম আকন্দের দুই ভাইয়ের, যারা বড় ভাই-ভাবীকে বাবা-মা মানলেও তাদের সম্পত্তিতে কুনজর দিতে বাঁধ সাধে না। যে গল্পটা করিম আকন্দের বখে যাওয়া ছোট ছেলে রহমানের, যার সাথে বাড়ির কাজের লোকের সম্পর্ক আছে। যে গল্পটা তপন চক্রবর্তীর, যে সাহিত্যচর্চায় বুদ্ব থাকলেই মনের গহীন কোনে ক্ষোভ পুষে রাখে। 

এমনই এক ছায়াসময়ের আড়ালে থাকা সামাজিকতার বেড়াজালে পাঠককে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখেন শরীফুল হাসান। নিজের বলা গল্পটুকু শোনানোর জন্য পাঠককে আটকে রাখেন তিনি। তারপর পাঠককে আচমকা ছেড়ে দেন এক ঘোরলাগা পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। জীবনের প্রয়োজনে হয়তো নানান ব্যস্ততায় ছায়াসময় গুলিয়ে যাবে; তবে যতদিন নস্টালজিয়া শব্দটা অভিধানে টিকে থাকবে, ততদিন যেন ছায়াসময় বইটাও পাঠকের মনে আশ্রিত থাকবে। পাঠক তখন বলবে –

আমাদের সেই আধো-আলো সময়টাকে কেন্দ্র করে একটা বই পড়েছিলাম অনেক আগে,
বইটার নাম ছিল ছায়াসময়।

বইয়ের কিছু উক্তি যা ভালো লেগেছে:

উচিত কাজ সবসময় না করলেও চলে। – শরীফুল হাসান
সাধারণ জনগনকে উসকে দেয়ার মতো সহজ কাজ আর নেই। – শরীফুল হাসান
বাঁচলে ভালো, মরলে আরো ভালো। রাজনীতিতে মরার দাম বেশী। – শরীফুল হাসান
সবসময় ধনীরাই জেতে। টাকা থাকলে ক্ষমতা আসে, ক্ষমতা আসলে অন্য কাউকে দাবিয়ে রাখা যায় কিংবা দুর্বলরা তখন সামান্য সুযোগের আশায় নিজেরাই দেবে থাকে। – শরীফুল হাসান

বই: ছায়াসময় ।। লেখক: শরীফুল হাসান ।। প্রচ্ছদ: জিয়াউদ্দিন বাবু ।। প্রকাশনী: বাতিঘর ।। প্রকাশকাল: অমর একুশে বইমেলা ২০১৯ ।। পৃষ্ঠা: ২৮৬ ।। মলাট মূল্য: ৩০০ /- টাকা

বিশেষ দ্রষ্টব্য: রিভিউটা একান্তই আমার ব্যক্তিগত অভিমতের বা ভালোলাগার বহিঃপ্রকাশ মাত্র। আমার ভালোলাগার সঙ্গে আপনার ভালোলাগা তফাত হতেই পারে। ব্যাপারটা একেবারেই স্বাভাবিক। আর, বইটা গতবছর পড়া। কোনো এক অদ্ভুত কারণে অথবা আলসেমির বশে, গতবছর পড়া বেশীরভাগ বইয়েরই রিভিউ আমার গুগল ডকে ধুলোয় মাখামাখি করে দিন কাটাচ্ছে। আশা করি সেগুলো এই সাইটে ধীরে ধীরে নিজেদের নতুন রূপে দেখতে পাবে।

Share this
Facebook
Twitter
LinkedIn

Related Posts

রিভিউ

পনম্যান: সামাজিক রীতিনীতির যাঁতাকলে পিষ্ট এক থ্রিলার গল্প

গল্পের ভাঁজে একেকটা কর্মকান্ডে উঠে এসেছে কখনো সমাজব্যবস্থার নড়বড়ে কাঠামো, কখনো সমাজের নৈতিকতার যাতাকলে পিষ্ট মানুষদের অসহায়ত্ব, কখনো ব্যক্তিত্বের নৈতিকতার সীমাবদ্ধতা, অথবা কখনো অর্থনৈতিক অসাম্যের মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে যে বিষ ছড়ায় তার বাস্তব দৃশ্যময়তা।

দ্য ফ্রগ: হয়েও হলো না একটি পারফেক্ট ক্রাইম থ্রিলার

নেটফ্লিক্সের নতুন কোরিয়ান থ্রিলার সিরিজ দ্য ফ্রগের প্রত্যেকটা এপিসোডের শুরুতে এই ডায়ালগটা শুনতে পাবেন। কোরিয়ান ভাষায় সিরিজটার নাম অনেকটা এমন – In the forest where no one’s around. কিন্তু তাহলে নামটা ফ্রগ হলো কেন?