Crafting Ideas Into Impactful Content

আপন খেয়াল: শব্দের তুলিতে আঁকা অনন্য কবিতাচিত্র

সবার তৃষ্ণার্ত হৃদয়ে একটাই আকুতি
কখন আসবে তুমি?
মনে আছে.. আজ জোছনায় তোমার নিমন্ত্রণ
কখন আসছ তুমি?
– সুপ্রিয় কুমার চক্রবর্তী

কবিতা হচ্ছে ছন্দ, দোলা এবং স্পন্দন নিয়ে রচিত একগুচ্ছ শব্দমালা। অথবা, কবিতা বা পদ্য শব্দের ছন্দোময় বিন্যাস যা একজন কবির আবেগ, অনুভূতি, উপলব্ধি চিন্তাকে সংক্ষেপে এবং উপমা-উৎপ্রেক্ষা-চিত্রকল্পের সাহায্যে উদ্ভাসিত করে আর তা শব্দের ছন্দায়িত ব্যবহারে সুমধুর শ্রুতিযোগ্যতা যুক্ত করে।

সদ্য স্নান করা কালো রাজপথের লাজুক মুখ,
আমাকে ভালোবাসতে শেখায়।
– সুপ্রিয় কুমার চক্রবর্তী

কবিতা। তিনটি অক্ষরের ছোট্ট একটি শব্দ অথচ এর বিশালতা আর গভীরতা অকল্পনীয়। হ্যা সত্যিকার অর্থেই অকল্পনীয়। জীবনের প্রত্যেকটি উপাদান আর উপাত্ত নিয়েই কবিতা। একটি জীবনের আলোকে সামগ্রিক জীবন নিয়ে লেখা হয় কবিতা। কবিতা হাসায়, কবিতা কাদায়। কবিতা আনন্দ দেয়, কবিতা বেদনা শেখায়। তাই একজন কবির কাছে তার কবিতা নিজের সন্তানের মতো, নিজের সহধর্মিণীর মতো যে তাকে ভালোবেসে পাশে থাকে দুঃখের সময়েও।

নিস্তব্ধ শহরে কিছু শালিকের অলস সময়
আমাকে ভিজতে শেখায়, ভালোবাসতে শেখায়।
– সুপ্রিয় কুমার চক্রবর্তী

আপন খেয়াল একটি কার্ড-কবিতার কাব্যগ্রন্থ। একটা সময়ে কার্ড-কবিতার প্রচুর সুনাম ছিল। দারুণ প্রচ্ছদে করা খামের ভেতরে থাকতো ১০টি কি ১২টি কার্ড। একেকটা কার্ডে শিল্পীদের আঁকা ছবির পাশে কবিতা ছাপা হত। সময়ের বিবর্তনে সেই কার্ড-কবিতার চল শেষ হয়ে এসেছিল।

তবে আপন খেয়াল দিয়ে সেই কার্ড-কবিতার চলটাকে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে কবি সুপ্রিয় কুমার চক্রবর্তী। ধ্রুব এষের প্রচ্ছদ আর এম শিপনের অলংকরণে বইটি প্রকাশ করেছে আবিষ্কার প্রকাশনী। প্রচ্ছদ এবং কার্ডগুলোর অলংকরনে নান্দনিকতা আর শৈল্পিকতার ছাপ স্পষ্ট। কবিতা পড়ার সময় অলংকরণগুলো আপনাকে কবিতার ভেতরে নিমজ্জিত হওয়ার আলাদা করে সুযোগ করে দিবে।

এখনো ভালোবাসতে শিখেনি নিজেকে
ভালোবাসেনি এই সুন্দর পৃথিবীকে।
– সুপ্রিয় কুমার চক্রবর্তী

দুই বাংলার সবচেয়ে সমৃদ্ধ বিশাল কলেবরে সাজানো কবি ও কবিতার ওয়েবসাইট “বাংলা কবিতা”-য় বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত বেশ কিছু কবিতা থেকে বাছাই করে ১২টি কবিতা নিয়ে এই কার্ড-কাব্যগ্রন্থ আপন খেয়াল। কবিতাগুলো হলো- জীবন সূচীপত্র, তুমি আসবে বলে, বিনম্র ভালবাসা, অপরাজিত এই আমি, একজন নিঃস্ব নারীর উপাখ্যান, অভিমানী মা, ভালবাসার আমি, বোশেখের ভালবাসা, ভ্যান, উৎসব, আমার স্বপ্নকাহন, একজন অভিবাসীর ডায়েরী।

পিছন ফিরে দেখি ভালোবাসার সেই আমি
পঞ্চাশের কাঁটা ছুঁই ছুঁই ঘড়ির কাঁটায়।
– সুপ্রিয় কুমার চক্রবর্তী

কাব্যগ্রন্থের শুরুতেই একটা চমকপ্রদ কবিতা আপনাকে চমকানোর জন্যে অপেক্ষা করছে। আমি নিজেও বেশ চমকে গিয়েছিলাম। ফ্ল্যাপে লেখা ১২টা কবিতা কিন্তু ভেতরে দেখি ১১টা কবিতা আরেকটা সূচীপত্র। সচরাচর সূচীপত্র না পড়ার বদঅভ্যাস আমার আছে। কিন্তু এবার পড়লাম। আর পড়ে বেশ অবাক হলাম। এটা আসলে কোন সূচীপত্র না। এটা আসলে “জীবন সূচীপত্র” নামক কবিতা। জীবনটাকে একটা বইয়ের পাতায় আবদ্ধ করে ১০টা ভাগে বিভক্ত করে দেখিয়েছেন কবি।

এই জীবন বইয়ের পাতা ১-৭ এ আছে মায়ের কোলে হীরের দিনগুলো, একটি শিশুর বেড়ে উঠার গল্প যা রচনা করেছেন প্রখ্যাত শিশু সাহিত্যিক নির্মলেন্দু বিকাশ চৌধুরী। এরপরে কৈশোর, যৌবন পেড়িয়ে এসে বার্ধক্যে এসে থামে জীবন আর কবিতা দুইই। কবিতার প্রেক্ষাপটে অলংকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে শিশু থেকে বৃদ্ধ হওয়ার পরিক্রমা। এরপরেই আছে ভালবেসে অপেক্ষার কবিতা। যে অপেক্ষা কবির একার নয়। সে আসবে বলে পূর্ণিমা স্নিগ্ধ শুভ্র আলো ছড়ায়, ঝিঁঝিঁপোকা আর জোনাকি গুনগুন করে সুর বাঁধে, নির্ঘুম লক্ষ্মীপেঁচা গান গায়, ফুলেরা স্বেচ্ছায় তোড়া বাঁধে উপহারের আশায়। সকল কিছুর অপেক্ষার আকুতি কবির ভেতরে দোলা দেয় তাই কবি শুধান,

সবার তৃষ্ণার্ত হৃদয়ের একটাই আকুতি
কখন আসবে তুমি?
– সুপ্রিয় কুমার চক্রবর্তী

তুমি আসবে বলে কবিতাটা পড়ার সময় এর কার্ডের অলংকরণটা এক ভাবনার জগতে নিয়ে যায়। বিনম্র ভালবাসা কবিতাটিতে কবি প্রকৃতির প্রতি ভালবাসা, শহরের নিস্তব্ধতা, অলস সময় সহ খুঁটিনাটি বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন যা প্রতিনিয়ত আমাদের ভাবনার খোরাক জোগায়। আমাদের ভালবাসতে শেখায়। আমাদের বাঁচতে শেখায়। অপরাজিত এই আমি কবিতাটা মূলত প্রবল চিত্তে ভালবাসার আক্ষেপ। ভালবাসাটা তখনই তীব্রতা পায় যখন স্রোতের বিপরীতে হাটা যায়। এই কবিতায় কবি অসম্ভব ব্যাপার গুলোকে ভালবেসে সম্ভব করার ইচ্ছাটাকেই প্রকাশ করেছেন এইভাবে,

এক চুমুকে চেখে নেই
পূর্ণিমার আলোর স্বাদ।
– সুপ্রিয় কুমার চক্রবর্তী

একজন নিঃস্ব নারীর উপাখ্যান। কবিতাটার নাম পড়েই বুঝা যায় নারীত্বের গভীরের কথাগুলো নিয়ে লেখা হয়েছে কবিতাটা। জন্মের পর বাবার বাড়ি, বিয়ের পর শ্বশ্বরবাড়ি, বৃদ্ধা হলে ছেলের বাড়ি নয়তো বৃদ্ধাশ্রম। আদতে নারীর কোন ঠিকানা নেই। তেমনি নারীর যাবতীয় ইচ্ছে বলতেও কিছু নেই। নারীর সম্পূর্ণটাই অন্যের ইচ্ছে। কবির আক্ষেপটা ফুটে উঠেছে এইভাবে,

আমি শুধু একটা রক্ত-পিন্ড মাংসের দলা,
দোকানে সাজানো ড্রেসিং ডল।
– সুপ্রিয় কুমার চক্রবর্তী

মা। একটা ভালবাসার নাম। কিন্তু মা’রা কখনোই সন্তানের কাছে স্বীকার করে না তার কি মন চায়। শরীর খারাপ লাগছে তবুও বলবে না পাছে কাড়াকাড়ি অর্থ নষ্ট হয়, কিছু খেতে ইচ্ছে করছে কিন্তু বলবে খিদে নেই। মায়েরা যা জানে তা হলো শুধু সন্তানকে ভালবাসতে। কিন্তু সন্তানের ভালবাসার বেলায় মায়ের মিথ্যে বলে। আর একদিন দুম করে চলে যায় দূরে। এই মা-সন্তানের মান-অভিমানগুলো নিয়েই সুন্দর কবিতা অভিমানী মা।

কৈশোরকাল কিংবা যৌবনের প্রারম্ভকালীন প্রেম গুলো আমাদের সবসময়ই ভাবায়। তখন কতকিছুই না করতে মন চায়। আকাশচিরে চাঁদটাকে নিতে আসতে ইচ্ছে করে, শিল্পীর আঁকা ছবিতে নিজের নাম দিয়ে বাহবা নিতে ইচ্ছে করে, বিখ্যাত কারো গল্প বা উপন্যাস নিজের বলে চালিয়ে নিতে ইচ্ছে করে, কিন্তু একটা সময় এইসব শুধু স্মৃতিতেই রয়ে যায় যখন ব্যস্ততা যান্ত্রিকতায় পিষে ফেলে। যখন মনটা যুবক বয়সে ফিরে গেলেও শরীরটা বয়সের ভারে ন্যুয়ে পড়ে। এমনটাই কবি লিখেছেন ভালবাসার আমি কবিতায়।

বোশেখের ভালবাসা কবিতায় আপনি সেকালের শিশুকাল থেকে একালের বয়ঃসন্ধিকাল অবধি নির্দ্বিধায় ঘুরে বেড়াতে পারবেন। আর তারপরের কবিতায় পাবেন বাস্তবতা। ভ্যান নামক কবিতাটাতে দেখানো হয়েছে যেই ভ্যানে শাকসবজি উঠে সেই একই ভ্যানে স্কুলের বই খাতা কিভাবে উঠে। বাস্তবতাগুলো ভ্যানে করে ছুটে চলতে চলতে এসে থামে উৎসব নামক কবিতায়। উৎসবগুলো যাদের জন্য এত সুন্দর হয় তাদের উৎসব গুলো আদতে কেমন হয়? এমন গভীরের কথাগুলোই খুব সহজ ভাষায় লিখেছেন কবি।

এরপরের কবিতাটা আমার স্বপ্নকাহন। কবিতাটা পড়ার পর এক ধরনের বিষণ্ণতা কাজ করে। গভীরে ভাবায়। আর সবশেষে আছে নষ্টালজিয়া এক কবিতা। একজন অভিবাসীর ডায়েরী। মনে অনেক জল্পনাকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাওয়া ছেলেটাও একটা সময় এসে কর্পোরেটের জগতে নিজেকে বিলিয়ে দেয়। ভুলে যায় সেইসব দিনগুলো সেইসব স্মৃতিগুলো। শুধু মাঝেমধ্যে নষ্টালজিয়ার মতো মানসপটে ভেসে উঠে স্বেচ্ছায় নির্বাসনের গল্পগুলো।

সুপ্রিয় কুমার চক্রবর্তীর প্রথম কাব্যগ্রন্থ “আপন খেয়াল।” ঢাকাস্থ রুশ দূতাবাসের প্রাক্তন চিফ এডুকেশন অফিসার সুপ্রিয় কুমার চক্রবর্তীর ছোটবেলা থেকেই লেখালেখির প্রতি ঝোঁক এবং বাবার চাকুরীর সুবাদে দেশের বিভিন্ন পত্রিকায় তাঁর অসংখ্য গল্প, নিবন্ধ ও কবিতা প্রকাশ হয়। তারপর নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান “শা এসোসিয়েটস” এ অনেক ব্যস্ততার মাঝেও প্রকাশ করেন প্রথম বই “আপন আলয়” ২০১৬ সালের একুশে বইমেলায়।

Image Source: Author Facebook Profile

শিক্ষা, ভ্ৰমণ ও ক্যারিয়ার নির্ভর নানান বিষয়ে গঠনমূলক আলোচনা ও পরামর্শ বিষয়ক উক্ত বই সুধীমহলে ব্যাপক সুনাম লাভ করে। রকমারি.ডট কমের অনলাইন সার্ভে বেস্ট সেলার বই হিসেবে স্বীকৃতিও লাভ করে আপন আলয়। তারপর দুই বছর বিরতি দিয়ে  একদম নতুন আঙ্গিকে বারোটি কবিতা নিয়ে এবারের বইমেলায় প্রকাশিত হলো আপন খেয়াল। কবি নির্মলেন্দু গুনের শুভেচ্ছা বাণীতে সমৃদ্ধ এই কবিতার বই বাংলা একাডেমির সকল কবিতাপ্রেমীদের মন জুগিয়েছে। ব্যক্তি জীবনে সুপ্রিয় চক্রবর্তী বিবাহিত এবং দুই সন্তানের জনক।

সমস্ত কিছুর ভারে চাপা পড়ে যায় আমার বাঙালী সত্তা
মাকড়সার জালে বন্দী আমার প্রিয় নষ্টালজিয়া।
– সুপ্রিয় কুমার চক্রবর্তী

সমসাময়িক প্রেম-ভালোবাসা, বাস্তবতা, ক্ষোভ-আক্ষেপ, সুখ-দুঃখ এসব নিয়েই আলোচিত হয়েছে ১২টি কবিতার বিষয়বস্তু। তবে এর আগে কবির বই পড়া হয়নি বিধায় কবিতাগুলো ভালো লাগলেও অন্তর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি হয়তো। তবে ২/১ টা শব্দগত ভুল চোখে পড়েছে যেটা অন্তত কবিতার বইতে আশাকরি না। একটা কবিতার এক জায়গায় ‘পংতি’ ব্যবহার করা হয়েছে তবে আমার জানামতে ‘পঙক্তি’ হবার কথা।

আরেক কবিতায় ‘তোমার বরনের জন্য প্রস্তুত’ কথাটা চোখে লেগেছে কেননা হয় ‘তোমায় বরনের জন্য প্রস্তুত’ অথবা ‘তোমাকে বরনের জন্য প্রস্তুত’ এমন হলে হয়তো ভালো লাগতো। তবে কি, কবিই ভালো জানেন কোথায় কোন শব্দ তথা অক্ষর ব্যবহার করা উচিত। অবশ্য আমিও পাঠক বলতেই পারি নিজের মত-অমত। সে যাই হোক, কার্ড-কবিতার থিমটা নতুনরূপে ফিরে আসছে এটাই সবচাইতে বেশী ভালো লেগেছে। কবিকে শুভকামনা।

বইয়ের নাম : আপন খেয়াল (কার্ড-কাব্যগ্রন্থ)
কবি : সুপ্রিয় কুমার চক্রবর্তী
প্রকাশনী : আবিষ্কার
মূল্য : ১০০ টাকা

বিঃ দ্রঃ এই রিভিউটি জলধি সাহিত্য পত্রিকার জন্য লেখা হয়েছিল।
Feature Image: prothoma.com

Share this
Facebook
Twitter
LinkedIn

Related Posts

রিভিউ

পনম্যান: সামাজিক রীতিনীতির যাঁতাকলে পিষ্ট এক থ্রিলার গল্প

গল্পের ভাঁজে একেকটা কর্মকান্ডে উঠে এসেছে কখনো সমাজব্যবস্থার নড়বড়ে কাঠামো, কখনো সমাজের নৈতিকতার যাতাকলে পিষ্ট মানুষদের অসহায়ত্ব, কখনো ব্যক্তিত্বের নৈতিকতার সীমাবদ্ধতা, অথবা কখনো অর্থনৈতিক অসাম্যের মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে যে বিষ ছড়ায় তার বাস্তব দৃশ্যময়তা।

দ্য ফ্রগ: হয়েও হলো না একটি পারফেক্ট ক্রাইম থ্রিলার

নেটফ্লিক্সের নতুন কোরিয়ান থ্রিলার সিরিজ দ্য ফ্রগের প্রত্যেকটা এপিসোডের শুরুতে এই ডায়ালগটা শুনতে পাবেন। কোরিয়ান ভাষায় সিরিজটার নাম অনেকটা এমন – In the forest where no one’s around. কিন্তু তাহলে নামটা ফ্রগ হলো কেন?