২০১১ সাল। ওয়েলসের উপকূলবর্তী অঞ্চল পেমব্রোকশায়ার। এখানকারই এক জেলখানা থেকে মুক্তি পায় উইলিয়াম জন কুপার নামের এক ব্যক্তি। যে কিনা ১৯৯৮ সালে গ্রেফতার হয়েছিল ডাকাতি এবং রাহাজানির কেসে। ১৪ বছরের শাস্তি কয়েক মাস মওকুফ হয়, কুপারের জেলে থাকাকালীন আচার-আচরণের উপর ভিত্তি করে। মুক্তি পাবার মাত্র মাসখানেক বাদেই ওয়েলসের গোয়েন্দা সংস্থা একদিন কুপারকে গ্রেফতার করে পুনরায়। আদালতে তাকে অভিযুক্ত করা হয় তিন দশক আগে ঘটে যাওয়া দুটি জোড়া খুন এবং কয়েকজন নারীকে ধর্ষণের অভিযোগে।
আদালতের সকল কার্যক্রম শেষে ২৬ মে ২০১১ সালে জন কুপার একজন সিরিয়াল কিলার হিসেবে দোষী সাব্যস্ত হয় এবং তাকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেয়া হয়। ওয়েলসের স্থানীয় পত্র-পত্রিকাগুলো এই তদন্তকে “দ্য পেমব্রোকশায়ার মার্ডারস” বা “দ্য বুলসআই কিলার” নামে অভিহিত করে। ওয়েলসের ইতিহাসে এটি ছিল জঘন্যতম একটি তদন্ত; যা সমাধানে ডিটেকটিভদের লেগেছিল টানা ছয় বছর। ঠিক দশ বছর পর প্রথমবারের মতো ফিকশন হিসেবে টিভি পর্দায় উঠে আসে কুপারের কাহিনী। দ্য পেমব্রোকশায়ার মার্ডারস নামে ৩ পর্বের মিনি সিরিজ নির্মাণ করা হয় প্রথমবারের মতো।
সিরিজের গল্পটা শুরু হয় টিভিতে একটি রিপোর্ট প্রকাশের মধ্য দিয়ে। ওয়েলসের প্রথম সারির একটি টিভিতে প্রতিবেদন হিসেবে তিন দশক আগে ঘটে যাওয়া জোড়া খুনের অসমাপ্ত কেস নিয়ে কথা উঠে। সেই কেসের প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে দায়ের করা হয়েছিল জন উইলিয়াম কুপারকে। যে কিনা মাত্র কয়েকদিন পরই জেলখানা থেকে মুক্তি পাবে; ডাকাতির জন্য ১৪ বছরের সাজা কাটিয়ে। কিন্তু উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে সেই তদন্তের কাজ অসমাপ্তই রয়ে যায়।

এমতাবস্থায় ওয়েলশ গোয়েন্দা সংস্থার ডিটেকটিভ চিফ সুপারিটেনডেন্ট স্টিভ উইলকিন্স পুনরায় কেসটি তদন্তের জন্য অনুমতি চায় উর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে। একে তো কোন প্রমাণ নেই; কোন চাক্ষুস সাক্ষী নেই; এমনকি নেই কোন ক্লু। উপরন্তু, তিন দশক আগে ঘটে যাওয়া ঘটনার ডিএনএ বা ফরেনসিক রিপোর্ট সঠিক পাওয়া যাবে কিনা – তা নিয়েও সন্দেহ রয়েই যায়। আবার, ভিকটিম এবং তাদের পরিবারকে এতগুলো বছর পর পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদ করাটাও বেশ মুশকিলের কাজ। তাই কেসটা পুনরায় খোলার বিষয়ে দ্বিমত থাকলেও অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার জন্য অনুমতি দেয়া হয় স্টিভকে।
খড়ের গাঁদায় সুঁই খোঁজার মতোই পুরনো তদন্তের ফাইল আর ফটো নিয়েই ঘাটাঘাটি করতে থাকে স্টিভ। কিন্তু বেশ কয়েকদিন একটানা গবেষণা করেও তেমন কিছুই খুঁজে পায় না। ভিকটিমদের পরিবার বা পরিচিত কেউই আর এই বিষয়ে কথা বলতে রাজি নয়। তিন দশক পর অবশ্য ঘটনাস্থলেও তেমন কিছু খোঁজার মতো অবশিষ্ট কোন ক্লু থাকার কথা না। ওদিকে, পুরো কেসের যা বাজেট তা দিয়ে হাতেগোনা ২/৩টা ফরেনসিক রিপোর্ট বের করা সম্ভব। ওদিকে কুপারের সাজা মওকুফের সময়ও ঘনিয়ে আসছে। এতকিছুর পর নিজের সাংসারিক টানাপোড়নের জীবন নিয়ে স্টিভস দারুণ রকমের বিপর্যস্ত হয়ে যায়।
এমনই সাজানো-গোছানো আর পরিপাটি এক চিত্রনাট্য রচিত হয়েছে বাস্তব আর সত্য এই ঘটনা অবলম্বনে। বিশেষ করে এই ধরনের ঘটনায় দর্শককে গল্পে ধরে রাখাটাই অনেক কষ্টকর। কেননা, দর্শক ইতিপূর্বেই গল্পের শেষটা জানে। তাই, উত্তেজনা বা ইনটেন্স নিয়ে দর্শককে গল্পের মধ্যে ডুবিয়ে দেয়াটাই থাকে সবচাইতে বড় চ্যালেঞ্জ। আর সেই চ্যালেঞ্জ বেশ ভালোভাবেই উতরে গেছেন এই সিরিজের নির্মাতাগণ। শুরু থেকেই খড়ের গাঁদায় সুঁই খোঁজা দিয়ে দর্শককে আটকে রাখা; আর পরবর্তীতে সুঁইটা যে কার তা প্রমাণ করার মধ্য দিয়ে পুরো গল্পে বেশ ভালোভাবেই দর্শককে ডুবিয়ে দিতে পেরেছেন তারা।

সিরিজের চিত্রনাট্য মূল গল্প থেকে খানিকটা ভিন্ন আর ব্যতিক্রমভাবে সাজানো হয়েছে। যদিও সম্পূর্ণটাই করা হয়েছে ফিকশনের সুবিধার্থে। অর্থাৎ, পুরো সিরিজ জুড়ে যেই ইনটেন্স বা উত্তেজনা কাজ করে তার পেছনে চিত্রনাট্যের অবদান অনেক বেশি। একদম শেষ অবধি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বাধ্য করা হয়েছে দর্শকদের। আর শেষে যে তৃপ্তির রেশ সেটাও যেন সত্যিকার অর্থেই অনুভব করাতে চেয়েছেন নির্মাতাগণ।
ব্রিটিশ টিভি সিরিজের মেকিং নিয়ে আর নতুন করে কি বলার আছে! এটা সকলেরই জানা। সিরিজের ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরিংই মূলত গল্পে অনেকটা ডুবে থাকতে সাহায্য করবে দর্শকদের। একদমই সাদামাটা ধরনের মিউজিক হলেও, গল্পের আবহে যেন তা পরিপূর্ণতা লাভ করেছে। ঢিমাতালের সেই মিউজিকে যেন ঝুলে থাকে দর্শকের দীর্ঘনিঃশ্বাস। পাশাপাশি এডিটিং, কালার গ্রেডিং এবং সর্বোপরি প্রোডাকশন ডিজাইন ছিল চমৎকার।
ওয়েলসের উপকূলবর্তী হওয়াতে একদিকে যেমন – সমুদ্রের গর্জন, সমুদ্রের বিশালতা, পাথুরে সমুদ্রের সৌন্দর্য নজরে পড়ে; অন্যদিকে তেমনই বিস্তীর্ণ তৃণভূমি, সাজানো-গোছানো পেমব্রোকশায়ার শহরের সৌন্দর্যও একদম চোখে লেগে থাকে। মূলত সিনেমাটোগ্রাফির অনেকটা অংশই প্রকৃতি নিজে থেকেই যেন সাজিয়ে দিয়েছে। তাই, লং বা ড্রোন শটগুলো যেন ওয়েলসের সৌন্দর্যের পাশাপাশি সিরিজের গভীরতাকেও ইঙ্গিত দেয়।
সিরিজে ডিটেকটিভ চিফ সুপারিটেনডেন্ট স্টিভ উইলকিন্সের চরিত্রে অভিনয় করেছেন ওয়েলসের অভিনেতা লুক ইভান্স। ফাস্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াস ৬ এর ভিলেন ওয়েন শ, বিউটি অ্যান্ড দ্য বিস্টের গ্যাস্টন এবং দ্য অ্যালাইনিস্ট সিরিজে জন মুর চরিত্রে অভিনয় করে নিজের দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন লুক ইভান্স। তাই, বলার অপেক্ষা রাখে না যে স্টিভ উইলকিন্সের চরিত্রে একদম পরিপূর্ণভাবেই ডুবে গিয়ে অভিনয়টা করেছেন লুক। শান্তশিষ্ট আর ভদ্র-বিনয়ী এই ডিটেকটিভের চরিত্রটা দর্শকদের বেশ ভালো লাগবে।

তবে সিরিজের পুরো আকর্ষণ এবং এমনকি পুরো সিরিজটাকে নিজের অভিনয় দিয়ে আগলে ধরে রেখেছিলেন জন কুপার চরিত্রে থাকা কিথ অ্যালেন। ঠাণ্ডা মাথার ভয়ংকর এক সিরিয়াল কিলারের চরিত্রে কিথ এতটাই স্বতঃস্ফূর্ত এবং প্রাণবন্ত ছিলেন যে, সত্যিকারের জন কুপারের বদলে কিথকেই বেশি ভয়ংকর আর দুর্ধর্ষ লাগে পর্দায়। এমনকি তার এমন শীতল ভাব দর্শকের মনেও হিম ধরাবে নিশ্চিত। পুলিশি জেরার সময় তার অঙ্গভঙ্গি কিংবা মুক্ত হবার পরের সময়টুকুতে তার প্রতিক্রিয়া – সত্যিকার অর্থেই জন কুপারকে তুলে ধরেছে পর্দায়।
এছাড়া, আরো যাদের কথা বলতে হয় তারা হচ্ছেন – অ্যান্ড্রু কুপার চরিত্রে থাকা অলিভার রায়ান, ডিটেকটিভ এলা রিচার্ডের চরিত্রে থাকা অ্যালেকজান্দ্রিয়া রাইলি এবং প্যাট কুপারের চরিত্রে থাকা ক্যারোলাইন ব্যারি। পার্শ্ব চরিত্র হিসেবে সিরিজটাকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রেও এদের অভিনয়ও বেশ সাহায্য করেছে।
মোটকথা, অভিনয়, মেকিং, গল্প এবং চিত্রনাট্য মিলিয়ে এই মিনি সিরিজ একদম পারফেক্ট একটা কাজ ছিল বলা চলে। অহেতুক বা অপ্রাসঙ্গিক কোন কিছুই ছিল না পুরো সিরিজ জুড়ে। অতিরিক্ত টেনে লম্বা করা অথবা তাড়াহুড়ায় গল্প ছোট করে বলার মতো কোন প্রবণতা ছিল না। তাই, সবদিক থেকেই পারফেক্ট এই সিরিজটা চাইলেই দেখে নিতে পারেন মাত্র ৩ ঘণ্টারও কম সময় ব্যয় করে।

বাস্তবের স্টিভ উইলকিন্স পরবর্তীতে তার এই তদন্তের গল্প গ্রন্থাকারে প্রকাশ করেছিলেন। বইটার নাম – দ্য পেমব্রোকশায়ার মার্ডারস – ক্যাচিং দ্য বুলস আই কিলার। লিখেছেন স্টিভ উইলকিন্স এবং জোনাথন হিল। সিরিজেও জোনাথন হিলের একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা রয়েছে। জোনাথন হিল মূলত সেই সময় ওয়েলসের প্রথম সারির টিভি রিপোর্টার ছিলেন। তার রিপোর্ট এবং তার সাহায্যেই স্টিভ উইলকিন্স এই কেস সমাধান করতে পেরেছিলেন। সিরিজের গল্পটা মূলত এই বইকে কেন্দ্র করেই লেখা হয়েছে।
১৯৮৫ সালে জন উইলিয়াম কুপার ডাকাতির করার উদ্দেশ্যে হত্যা করে রিচার্ড এবং হেলেন নামে ধনশালী দুই ভাইবোনকে। আর তাদের লাশসহ পুরো বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়। পরে ১৯৮৯ সালে পিটার এবং গুয়েন্ডা ডিক্সন নামে এক দম্পতিকেও খুন করে কুপার। এই দম্পতিকে হত্যার আগে তাদের ব্যাংক ডিটেইলস নিয়ে টাকা আত্মসাৎ করে সে। ১৯৯৬ সালে একদল তরুণ-তরুণীকে জিম্মি করে ডাকাতি করে কুপার। আবার, এদের মধ্যে এক মেয়েকে ধর্ষণও করে সে।
পরের বছরই আরেক নারীকে বন্দুকের মুখে জিম্মি করে যৌন নির্যাতন চালায়। যদিও সেই নারী পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। আর এতেই বেরিয়ে আসে জন কুপারের আসল পরিচয়। বেরিয়ে এসেছিল জন কুপারের কাছে নির্যাতনের শিকার হওয়া আরো নারীর কথা। ১৯৮৯ সালে বুলসআই নামে একটি টিভি শোতে অংশগ্রহণ করেছিল কুপার।যেজন্য এটিকে বুলসআই মার্ডারস নামেও অভিহিত করা হয়।
Feature Image: imdb.com
Reference link: independant.co.uk
