স্পাই শব্দটির বাংলা অর্থ গুপ্তচর বা গোয়েন্দা। আরো সহজ করে বললে বলতে হয় যে ব্যক্তি গোপন সংবাদ সংগ্রহ করে। ইতিহাস ঘেঁটে এতটুকু নিশ্চিত করে বলা যায় যে, গুপ্তচরবৃত্তি করা হয়ে থাকে রাজনৈতিক, সামরিক এবং অর্থনৈতিক সুবিধা লাভের আশায়। আর গুপ্তচরবৃত্তির কথা বললেই চলে আসে এসপিওনাজের কথা। এসপিওনাজ শব্দটির বাংলা অর্থ দাঁড়ায় গোয়েন্দাগিরি বা গুপ্তচরবৃত্তি। সেই প্রাচীন কাল থেকেই এসপিওনাজ বহমান নদীর মতোই রাষ্ট্র এবং জনগণের সঙ্গে সহাবস্থানে টিকে আছে।
হিব্রু বাইবেলের বুক অফ জোশুয়াতে রাহাবের গল্পেও উঠে এসেছে এসপিওনাজের কথা। রাহাব ছিলেন একজন পতিতা নারী, যিনি কিনা দুজন ইসরায়েলি স্পাইকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। প্রাচীন মিশরীয় হায়রোগ্লিফ এবং প্যাপিরাসে কোর্ট স্পাই বা আদালতে গুপ্তচরবৃত্তির উদাহরণ পাওয়া গেছে। এমনকি তা গ্রীক এবং রোমান সাম্রাজ্যে প্রচলিত ছিল। এশিয়াতে খ্রিষ্টপূর্ব ৫০০ অব্দে তো চীনা যুদ্ধকৌশলবিদ সান জু তাঁর আর্ট অফ ওয়ার বইতেই এসব সামরিক কৌশল নিয়ে আলোচনা করে গেছেন। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র তো গুপ্তচরবৃত্তি ব্যবহারের জন্য সরকারি একটি সুপরিচিত গ্রন্থ বলে প্রসিদ্ধ। সামন্ততান্ত্রিক জাপানে নিনজারা গুপ্তচর হিসেবে নিযুক্ত হতো এবং শত্রুর দুর্বলতা খুঁজে বের করে সেখানেই আঘাত করার জন্য খ্যাত ছিল।
মধ্যযুগে ইউরোপে ক্রুসেড এবং ইনকুইজিশন চলাকালীন সময়ে গুপ্তচরবৃত্তি দারুণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। রেনেসাঁর সময় রাজনৈতিক দার্শনিক নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি গুপ্তচরবৃত্তির জন্য শাসক শ্রেণীদের জোরালো সমর্থন দিয়েছিলেন। আঠারো শতক থেকে এসপিওনাজ আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে শুরু করে। শিল্পায়ন, উপনিবেশবাদ এবং বিশ্ব রাজনীতির সঙ্গে একদম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যায় শব্দটা। ফরাসী বিপ্লবের সময়ে এমন মানুষদেরকে ধরে বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি দেয়া হতো শিরশ্ছেদ। উপনিবেশিক সরকাররা গুপ্তচরবৃত্তির মাধ্যমে বিদ্রোহ দমন করতো।
কিন্তু, উনিশ শতকে প্রযুক্তি আর তথ্য ব্যবস্থা সমৃদ্ধি পেলে এসপিওনাজ শিল্পের পর্যায়ে রূপ নিল। এক্ষেত্রে ক্যামেরা আর টেলিগ্রাফের আবিষ্কার, এসপিওনাজের জন্য একদম বিপ্লব ছিল বলা চলে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন এসপিওনাজ চলে গেল সফলতার চূড়ান্ত পর্যায়ে। তবে এসপিওনাজের আরো সর্বোৎকৃষ্ট প্রমাণ মেলে স্নায়ু যুদ্ধ বা কোল্ড ওয়ারের মাধ্যমে। পুরো বিশ্ব যেন জড়িয়ে গেল অদৃশ্য এক এসপিওনাজের জালে।

আচমকাই স্পাই আর এসপিওনাজ নিয়ে এত আলাপ আলোচনার কারণ কি? কারণ হচ্ছে, স্পাই স্টোরিজ। হ্যাঁ, বহুল আলোচিত এবং রকমারি বেস্ট সেলার মোজাম্মেল হোসেন ত্বোহার বই স্পাই স্টোরিজ আজকের আলোচনার বিষয়বস্তু। ২০২০ সালের বইমেলায় স্বরে অ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত বইটি ইতিমধ্যেই বেশ পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করেছে।
প্রচ্ছদে একজন সত্যিকারের স্পাইয়ের ভাইব আর সঙ্গে রিভলবারের ছাপ, অনেকটাই গুপ্তচরবৃত্তির থ্রিলটাকে আটকাতে সক্ষম হয়েছে। বইয়ের বাঁধাই, কাগজ, সর্বোপরি আউটলুক দারুণ হলেও বইতে অদ্ভুত এক গন্ধ পাঠককে বিরক্ত করে তুলে। খুব সম্ভবত বইয়ের বাঁধাই করার আঠার সঙ্গে লেপ্টে গিয়েছিল পচনশীল কিছু। এত সুন্দর একটা গেটআপের বইটা খুলামাত্রই এমন গন্ধ ধক করে আহত করবে পাঠককে। এই বিষয়ে প্রকাশকের বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টাই থাকবে।
বইয়ের পাতার কিংবা সিনেমার পর্দার গোয়েন্দা গল্পকেও হার মানাবে বাস্তবের গুপ্তচরবৃত্তির সত্য ঘটনাগুলো। যে চরিত্রগুলো কেবলই কাল্পনিক নয়; বরং একটা সময়ে হেঁটে বেরিয়েছে পৃথিবীর বুক জুড়ে; রাজত্ব করেছে এসপিওনাজের জগত জুড়ে। বাস্তব জীবনের এমনই রহস্যময় আর দুর্দান্ত সব গোয়েন্দাদের গল্প নিয়ে হাজির হয়েছেন লেখক ত্বোহা সাহেব। তুলে ধরেছেন সেইসেব গোয়েন্দাদের কথা যারা সংবাদপত্রে নিয়মিত আলোচনার অংশ না হলেও, যাদের গুপ্তচরবৃত্তির প্রভাবের কারণে বিশ্বটা আজ এই অবস্থানে।

অ্যাডলফ তোলকাচভ। সোভিয়েত ইউনিয়নের এই ইলেকট্রিক ইঞ্জিনিয়ার টানা ছয় বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআই (সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি) এর হয়ে কাজ করেছেন। এসব গোপন তথ্যে যে কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই লাভবান হয়েছিল তা কিন্তু নয়। বরং মার্কিনীদের মিত্র রাষ্ট্রগুলোও ব্যাপক লাভবান হয়েছিল। যেমন বলা চলে, ইসরায়েল আরবদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিল এই গোপন তথ্যের সূত্র ধরেই। এই অর্ধ যুগেই তোলকাচভ সোভিয়েত ইউনিয়নের যে পরিমাণ গোপন তথ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দিয়েছেন তা অর্থের পরিমাপে ১০ বিলিয়ন ডলার ধরাটাও অবিশ্বাস্য কিছুই নয়। তাই তো, লেখক অধ্যায়ের নামকরনও করেছেন বিলিয়ন ডলার স্পাই নামে।
বিলিয়ন ডলার স্পাইয়ের মতোই ধাপে ধাপে প্রতি অধ্যায়ে লেখক তুলে এনেছেন একেকজন গুপ্তচরকে, যার অবদান ইতিহাসে ব্যাপক। ১১২ পৃষ্ঠার বইটিতে উঠে এসেছে ছয়জন গুপ্তচরের বাস্তব জীবনের গল্প। আছে ব্রায়ান রিগ্যান; যার ছিল বানান ভুল করার এক বিরল বাতিক; আছে এজেন্ট স্টর্ম, যে কিনা শীর্ষ এক সন্ত্রাসীকে ধরিয়ে দিয়েছিল; আছে বৈরুতে ইসরায়েলি মাতাহারি শুলা কোহেন; আছে ডাবল এজেন্ট আশরাফ মারোয়ানের গল্প; আর সবশেষে আছে আনা মন্টেজের গল্প, যে নারী কিউবাকে ভালোবেসেছিল নিজের অজান্তেই।
মোজাম্মেল হোসেন ত্বোহা। জন্মসূত্রে বাংলাদেশি হলেও বর্তমানে থাকেন লিবিয়ার বেনগাজিতে। পেশাগত জীবনে সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। তবে শখের দিক থেকে নিজেকে লেখক হিসেবে ভাবতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি ও ইতিহাস নিয়ে রয়েছে তার ব্যাপক জ্ঞান ও আগ্রহ। কেননা, ইতিমধ্যেই নিজের চোখে দেখেছেন লিবিয়ার গৃহযুদ্ধ; এমনকি হয়েছেন ভয়াবহতার শিকারও। দেশের শীর্ষস্থানীয় পত্রপত্রিকাসহ অনলাইন মিডিয়ায় রয়েছে তার অবাধ বিচরন। অনলাইন কন্টেন্ট প্ল্যাটফর্ম রোর বাংলার জনপ্রিয় একজন ফিচার রাইটার হিসেবে নিজেকে এরিমধ্যে প্রতিষ্ঠা করে নিয়েছেন। পাশাপাশি নিয়মিত লিখেন নিজের ওয়েবসাইট এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে।

সাধারণত, লেখক যখন স্বদেশি হয়েও প্রবাসী হয় তখন পাঠকের মনে শব্দচয়ন আর বাক্যগঠন নিয়ে সন্দেহ থাকাটাই স্বাভাবিক। উপরন্তু, লেখক ত্বোহা জন্মসূত্রে বাংলাদেশি হলেও তার জীবনের পুরোটাই কেটেছে লিবিয়াতে। তাই এখানে পাঠকের মনে সন্দেহ ঘনীভূত হওয়াটা মোটেও অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু এই ব্যাপারটিই যেন পূর্বাশঙ্কার মতোই আঁচ করতে পেরেছিলেন লেখক। পাঠককে বেশ ভালোই চমকে দিয়েছেন লেখক, নিজের শব্দচয়ন আর সেই শব্দের জালে বুনে বাক্যগঠনের তালে।
সহজ, সাবলীলতা আর প্রাঞ্জলতা যথেষ্ট পরিমাণে ছিল লেখকের লেখনশৈলীতে। বিন্দুমাত্র ভিন্নতার চিন্তা না করেই একদম চিরাচরিত আর প্রচলিত সাধারণ বয়ানেই গল্প বলে গেছেন তিনি। চেষ্টা করেছেন অতি সহজে যেন গুপ্তচরবৃত্তির জগত থেকে পাঠকদেরকে ঘুরিয়ে আনতে পারেন। অবশ্য এক্ষেত্রে বলতেই হয় যে, বাজিমাত করেছেন তিনি। লেখকের বর্ণনাভঙ্গির প্রাঞ্জলতা যে কোনো পাঠককে নিয়ে দাঁড় করাবে স্নায়ু যুদ্ধের প্রাক্কালে অথবা মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের সেই গুপ্তচরবৃত্তির মায়াজালে।
গুপ্তচরবৃত্তির জন্য ছক কাটতে হলে এমন নিখুঁতভাবে করতে হয় যেন কোনো ফাঁকফোকর না থাকে। লেখক তেমনই চেষ্টা করেছেন যেন পাঠক বই নিয়ে দ্বিতীয় কিছু ভাবার বা বলার সুযোগ না পায়। তবুও চাহিদার তো আর শেষ নাই। তাই পাঠকও জানাবেই লেখকের ফাঁকফোকরের কথা। শুরুতেই বলতে হয় ছবি প্রসঙ্গ। কেননা, ননফিকশন বই সত্যতার উপর নির্ভরশীল বিধায় এতে প্রাসঙ্গিক ছবি যুক্ত হবে এটাই স্বাভাবিক; হোক তা সাদা-কালো বা রঙিন। কেননা, সত্যতার মাঝে তো আর কল্পনার সুযোগ নেই। তাই, ছবির আবশ্যিকতা লেখকের লেখনশৈলীর মুগ্ধতাকেও ছাপিয়ে চোখে লেগেছে।
লেখক অনেক জায়গা প্রসঙ্গক্রমেই হোক আর পাঠকের সুবিধার জন্যেই হোক, বিভিন্ন সংস্থা বা অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের নামের পাশে সেগুলোর কার্যক্রমের ধরন লিখে দিয়েছেন। তবে অনেক ক্ষেত্রেই তা হয়তো ভুলে গেছেন কিংবা পাঠকের উপর ছেড়ে দিয়েছেন। তবে এই ক্ষেত্রটা ছিল একদমই সীমিত, উল্লেখ করে না বললেও চলে এমন। তাছাড়া, লেখক সরাসরি ব্যাখ্যা না দিলেও বিকল্প ব্যবস্থায় উত্তর দিয়ে রেখেছেন নিজেই। তা সত্ত্বেও, যদি প্রতি অধ্যায়ের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক কিছু টীকা জুড়ে যেত, বিশেষ কোড নেম, বিশেষ ঘটনা, অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের নাম বা কার্যক্রম অথবা সেই গল্পটার সঙ্গে জড়িত টীকাবিশেষ ইত্যাদি; তাহলে হয়তো পাঠক পরিপূর্ণতা অনুভব করতো। তবে এও সত্যি যে, চাহিদা আর পূর্ণতার কোনো শেষ নেই আসলে।

তবে লেখক যে প্রতি অধ্যায় শেষে নিজেকে ভারমুক্ত করেছেন পাঠকের কাছে তা স্পষ্টতই লক্ষ্যনীয়। প্রতি অধ্যায় শেষেই পাঠক পূর্ণাঙ্গ গল্পের তথ্যসূত্র পাবে। যার মাধ্যমে চাইলেই যাচাই করে নেওয়া যাবে গল্পের সত্যতা। এখানেও লেখক পাঠককে দ্বিতীয় কিছু ভাবার সুযোগ দেননি। বরং নিজস্ব পরিকল্পনার ছকের ফাঁদে ফেলেছেন পাঠককে। এমনকি বাংলা শব্দ থাকা সত্ত্বেও লেখকের কিছু ইংরেজি শব্দের ব্যবহারটাকেই বেশি মানানসই মনে হয়েছে; তা গল্পের প্রেক্ষাপটের কারনেই হোক কিংবা হোক লেখকের প্রচলিত শব্দের ব্যবহারজনিত অভ্যাসেই।
ননফিকশন গল্পটাকেই সেমিননফিকশনে রূপান্তরিত করতে পুরোপুরি সফল হয়েছেন লেখক। তাই মনে হয় না পাঠকের বিন্দুমাত্র দ্বিধা হবে ননফিকশনের এই উত্তেজনায় পূর্ণ রোলার কোস্টারে চড়ে গুপ্তচরবৃত্তির দুনিয়া থেকে ঘুরে আসতে। প্রতিটা গল্পের শুরুতেই লেখক যে গল্পের ফাঁদ পেতেছেন পাঠকদের উদ্দেশ্য – তা একইসঙ্গে প্রশংসার দাবীদার এবং সফলও বটে। পাঠকদেরকে “তারপর কি হলো?” সূচক প্রশ্নে আঁটকে রেখে পুরো গল্পটা শুনিয়ে দেয়ার দারুণ ছক কেটেছেন লেখক। গুপ্তচরদের নিয়ে লিখতে গিয়েই এমন গুপ্ত কৌশল কিনা তা লেখকই ভালো জানেন!
উপরে উল্লেখিত আছে যে, উনবিংশ শতাব্দীর প্রাক্কাল থেকেই গুপ্তচরবৃত্তি শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। বর্তমানে গুপ্তচরবৃত্তি এমন এক শিল্পে রূপান্তর লাভ করেছে যে, তা ধরাছোঁয়ার বাইরে। লেখক মোজাম্মেল হোসেন ত্বোহা রচিত স্পাই স্টোরিজ সেই শৈল্পিক গুপ্তচরবৃত্তিকে সাহিত্যে রূপদান করেছে, একইসঙ্গে গ্রন্থটিও রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। আপনি কোনোভাবেই শত চেষ্টা করেও এই গ্রন্থের প্রশংসা ব্যতীত সমালোচনার সুযোগ পাবেন না। বইটা খোলা মাত্রই লেখকের পূর্ব পরিকল্পিত ছকে আটকে পড়বে যে কোনো পাঠক। লেখককে অসংখ্য ধন্যবাদ গুপ্তচরদের নিয়ে লিখতে গিয়ে পাঠকদের উপর এমন গোয়েন্দাগিরি করার জন্য।
বই: স্পাই স্টোরিজ
লেখক: মোজাম্মেল হোসেন ত্বোহা
প্রচ্ছদ: তন্ময় ইরতিজা আঞ্জুম
প্রকাশনী: স্বরে অ
মলাট মূল্য: ২৭০/- টাকা
