Crafting Ideas Into Impactful Content

গোরস্থানের পিশাচ – হরর কাহিনীর সংকলন

ওঁম নমঃ পিশাচেশ্বর পিশাচ সঙ্গন দেহিমায়
মম পূজা ত্বাং গ্রহনা দেহী নমঃ নমহ

আপনি যে না জেনেই উপরের বাক্য দুটি হুট করে পড়ে ফেললেন তা কি উচিত হলো? কারণ বাক্য দুটি অমাবস্যার রাতে ব্যবহৃত হয় পিশাচ সাধনার কাজে। জ্বি, এই আপনার মন আর শরীর জুড়ে যে অনুভূতিটা বিরাজ করছে সেইটাই মূলত ভয়। ভয় হচ্ছে মানুষের আদিমতম একটা প্রবৃত্তি। সভ্যতার শুরুর দিকে  মানুষগুলোর কাছে ভয় ছিল একরকম আর সভ্যতার এই সময়টাতে এসে মানুষের ভয় অন্যরকম।

তবে, বিজ্ঞানবিহীন যুগেও ভয়ের অস্তিত্ব যেমন ছিল ঠিক তেমনি আধুনিক বিজ্ঞানের যুগেও ভয়ের অস্তিত্ব সর্বত্রই বিরাজমান। আর এই ভয়ের সাথেই সর্বক্ষেত্রে জড়িয়ে থাকে- ভূত, প্রেত, প্রেতাত্মা, ডাইনী, পেত্নী এবং পিশাচসহ অসংখ্য নাম। আর পিশাচ নিয়ে এই গবেষণার কারণ হচ্ছে, তানভীর মৌসুম অনূদিত সেবা প্রকাশনী কর্তৃক প্রকাশিত গোরস্থানের পিশাচ নামক বইটির আলোচনা থাকছে আজ। তবে, আগে পিশাচ সম্পর্কে খানিকটা ধারণা নেয়া যাক।

পিশাচ হচ্ছে এমন একটা সত্ত্বা যেটা মৃত নয় আবার জীবিতও নয়। এর কারণটা হচ্ছে, সমাজের চোখে এরা মৃত হলেও সাধনার দৃষ্টিকোণ থেকে এরা জীবিত। মৃতের সঙ্গে সঙ্গম করে মৃতের যৌবন শুষে নেয়া, মৃতের কলজে/বিশেষ অঙ্গের মাংস ভক্ষণ করে তান্ত্রিক শক্তি বৃদ্ধি করা, অপদেবতা বা শয়তানের উপাসনা করা, রূপ বদল করে মানুষদেরকে বিপথে নিয়ে এসে মেরে ফেলাই মূলত পিশাচদের কর্মকান্ড।

পিশাচের সমার্থক ইংরেজি হচ্ছে Ghoul; ঘৌল বা ঘোউল অথবা ঘুল। এটা হচ্ছে আরব্য রূপকথা বা উপকথার এক বিশেষ জ্বীন জাতি যারা রক্ত এবং মাংস ভক্ষণ করে থাকে। এবং যাদের রক্ত আর মাংসের স্বাদ ঘুলের মুখে লাগবে তারই রূপ ধারণ করার ক্ষমতা এদের আছে। পিশাচশ্রেণির এই জ্বিনকে ইবলিশ শয়তানের শিষ্য মানা হয় আরবী লোঁকগাথা মতে। একই শিরোনামে নেটফ্লিক্সে একটা সিরিজও রয়েছে। যাই হোক, প্রাচীন সাহিত্য বলে পিশাচ এক হাজার এক রাত্রি পর্যন্ত বাঁচে।

© Wazedur Rahman Wazed

সত্যিই শক্তি আর আত্মা হচ্ছে শক্তির উৎস। – এডওয়ার্ড লি 

জো. আর. ল্যান্সডেলের ক্ষুরদেবতা, আলাপন, আঁস্তাকুড়, মৎস্য রজনী, গোরস্থানের পিশাচ, মরণকামড় এবং ছায়ামানব; দীপা আগারওয়াল এর নূপুর, লেফক্যাডিয়ো হার্ন এর গবলিন, স্টিফেন গ্রেগোরি এর অপ্রকৃতিস্থ, গ্যারি ক্রু এর প্রিয় বান্ধবী, ডিন কুন্টয এর মার্নি আর বিড়ালছানা, রবার্ট ব্লক এর ডাইনী, আজরাইলের প্রতিনিধি, গেরি আর্মস্ট্রং এর মৃত ব্যাগপাইপ; এডওয়ার্ড লি এর লকেট, কেলি ম্যারিনো এর সিরিয়াল কিলার, জে. বি. স্ট্যাম্পার এর কালো রিবন, গ্যারি বুশেল এর সাইকোপ্যাথ মিলিয়ে মোট ১২ জন লেখকের সর্বমোট ১৯টা গল্প পাবেন গোরস্থানের পিশাচ নামক অনুবাদ গল্প সংকলনটিতে। সেবা প্রকাশনীর পেইজ, বাইন্ডিং নিয়ে কথা বলার কোন দরকার বোধ করছি না কারণ তা সবারই জানা। 

১৯ টা গল্পের প্রসঙ্গ লিখতে গেলে আমার বিকাল থেকে রাত পার আর সেটা পড়তে আপনার রাত থেকে দুপুর পার হবার কথা। যাই হোক, সব গল্পই যে ভালো লেগেছে এমন নয়; তাই সবগুলো গল্প থেকে দুই/তিনটা গল্পের খানিকটা তুলে ধরলাম।

ডাইনী – রবার্ট ব্লক

গল্পকথক আদমশুমারির কাজ করে। সারাদিন একটানা হেঁটে চলা, বাসায়-বাসায় যেয়ে বেল বাজানো, এবং পোর্টফোলিও বের করে অর্থহীন সব প্রশ্ন করা। ঘুরতে ঘুরতে গল্পকথক এক পুরোনো দিনের বাড়ির ভেতর প্রবেশ করে। এক মহিলা ভেতরে নিয়ে তাকে বসায়। কথার প্রসঙ্গে গল্পকথক জানতে পারে মহিলার নাম- লিসা লরেনি, বয়স- চারশো সাত এবং পেশায়- ডাইনী। বাইরে বের হওয়ার চেষ্টাটা বিফল হয় গল্পকথকের; কেননা, একটু আগেই যেই দরজা দিয়ে বাসার মধ্যে প্রবেশ করেছে সেই দরজাটা একেবারে উধাও। বের হওয়ার কোন পথ নেই। গল্প এগিয়ে চলে। 

গোরস্থানের পিশাচ – জো আর. ল্যান্সডেল

মিস্টার টেলর একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভ। এক রাতে ক্যাথি নামক এক সুন্দর আর অভিজাত মহিলা তার চেম্বারে আসেন। ক্যাথি জানায়, সুজান নামক আঠারো বছরের সুন্দরী যুবতী; যে কিনা ওর আপন ছোট বোন, তার আকস্মিক মৃত্যু হয়েছে। শোক কাঁটাতে প্রায় প্রতিদিনই সকাল বেলা বোনের কবরে ফুল দিতে যায় ক্যাথি। উদ্ভট বিষয়টা হচ্ছে, প্রতিদিন কবরের মাটির উপরিভাগে পরিবর্তন পায় ক্যাথি। ওর ধারণা কেউ একজন লাশ চুরির পায়তারা করছে। পুলিশ পাহারা দিয়েছে দুই রাত কিন্তু কোন কাজ হয়নি তাতে। আর তাই মিস্টার টেলরের কাছে আগমন।

টেলর কাজটা বুঝে নিয়ে সেদিন রাতেই গোরস্থানে যায় ঘটনাটা সম্পূর্ণ তদন্ত করার জন্য। কোন এক বিশাল গাছের ডালে আশ্রয় নিয়ে টেলর উপর থেকে দেখতে পায় জন্তু সদৃশ কিছু একটা কবরটা খুঁড়ছে। গাছ থেকে নেমে দেখে আসলে জন্তু নয় একজন মানুষ সেটা; যার কাঁধে বর্তমানে ক্যাথির বোন সুজানের লাশটা দুলছে। ধাওয়া করে টেলর কিন্তু গোরস্থানের ছয়ফিট উঁচু কাঁটাতারের বেড়াও নিমিষে টপকে পার করে সুজানের লাশ নিয়ে ছোটা লোকটা। গল্প এগিয়ে চলে। 

© Wazedur Rahman Wazed

মরণ কামড় – জো আর. ল্যান্সডেল

মড নামক এক ফোকলা বুড়ির থাকার কোন জায়গা যেমন নেই তেমনি খাবারের জন্য কোনো অর্থ নেই। তাই রাস্তার আবর্জনায় খাবার খোঁজাটাই ওর একমাত্র কাজ। তবে খাবার পেলেও বিশেষ একটা লাভ হয় না কারণ দাঁত না থাকায় সব ধরণের খাবার ও খেতে পারে না। একদিন খাবার খুঁজতে গিয়ে একটা দাঁতের সেট কুড়িয়ে পায় বুড়ি মড। উঠিয়ে পরিষ্কার করে নিজের দাঁতে খাজে বসায় সেটটা। আর আশ্চর্যজনকভাবে সেটা বুড়ির মুখের ভেতর শক্ত হয়ে এঁটে যায়। কিচ্ছুক্ষণ পরই বুড়ির প্রচণ্ড ক্ষিধে পায় অথচ খানিক আগে যা খেয়েছে তা দিয়ে রাত পেরিয়ে যাওয়ার কথা। ব্যাগে থাকা সমস্ত কিছু খেয়েও ক্ষিধে মেটাতে পারেনা বুড়ি। রাস্তায় হাঁটতে থাকা পরিচিত এক পুলিশকে আস্ত গিলে গেলে বুড়িটা কিন্তু তাতেও খিদে মেটে না মডের। গল্প এগিয়ে চলে। 

ছায়ামানব – জো আর. ল্যান্সডেল 

রাস্তায় সন্দেহভাজনভাবে গাড়িতে বসে থাকা লোকটাকে স্টেশনে ধরে নিয়ে আসে কর্তব্যরত পুলিশ অফিসার। লাইসেন্স ঘাটতে যেয়ে দেখা যায় লোকটা আসলে মৃত কোন এক লোকের লাইসেন্স নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। লোকটাকে হাজতে পুরতে বাধ্য হয় অফিসার। কিন্তু লোকটা শুধু বলে, বিশাল কোন ঝামেলা জড়িয়ে পড়েছে অফিসার। কিন্তু অফিসার তেমন কোন পাত্তা দেয় না তাতে। খানিক বাদেই অফিসার হাজতের মধ্যে লোকটার বদলে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখতে পায়। অফিসার ঘাবড়ে যায় এবং লোকটা আবার ভিন্ন রূপ ধারণ করে। অফিসার লোকটার অতীত ইতিহাস জানতে চেয়ে লাইটের আলোয় খেয়াল করে লোকটার কোন ছায়া নেই। ছায়াবিহীন একজন মানুষ সে। গল্প এগিয়ে চলে। 

১২ জন লেখকের লেখক প্রসঙ্গ তুলে ধরা সম্ভব নয়। অনুবাদক তানভীর মৌসুম। দ্য টেরাটোলজিস্ট দিয়ে যেই ভদ্রলোক একইসাথে আলোচিত এবং সমালোচিত হয়েছে। যাই হোক, টেরাটোলজিস্ট আমিও পড়েছিলাম তবে সেটার অনুবাদ নিয়ে খানিক কথাও তুলেছিলাম। তবে গোরস্থানের পিশাচ বইটার অনুবাদ নিয়ে কথা বলার জায়গা রাখেননি তানভীর।

বেশ সাবলীল আর ঝরঝরে অনুবাদ। খটকা লাগে বা দ্বিতীয়বার পড়ে বুঝতে হয় কিংবা অনুবাদের প্রাঞ্জলতা হারায়নি বিন্দুমাত্র। তবে ইংলিশ শব্দের অতিরিক্ত ব্যবহার চোখে লাগে। এছাড়া, উনার জায়গায় ওর কথাটা ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে বাজে লাগে; যদিও যতদূর জানি সেবা প্রকাশনী বলেই এমনটা লিখতে হয়। এই বইটি বাদেও তানভীরের আরো কয়েকটা অনুবাদ সংকলন আছে পড়ে দেখতে পারেন। 

© Wazedur Rahman Wazed

এক অর্থে আমরা সবাই টাইম ট্রাভেলার। জন্ম আর মৃত্যুর মাঝখানে আমরা বিভিন্নভাবে সময়কে অতিক্রম করি। ব্যাপারটা অস্বাভাবিক কিছু না। আমরা সময়ের চারপাশে ঘুরঘুর করিনা বরংচ এর ভিতরে প্রবেশ করি। – জো আর. ল্যান্সডেল 

যারা নিয়মিত রহস্যপত্রিকা পড়েন তাদের কাছে বেশীরভাগ গল্পই পরিচিত হবার কথা। কারণ, তানভীর নিজেও রহস্যপত্রিকার নিয়মিত অনুবাদক এবং এই গল্পগুলোও রহস্যপত্রিকার বিভিন্ন সংখ্যায় ছাপানো হয়েছিল। যাই হোক, গল্পপ্রসঙ্গে বর্ণিত চারটা গল্পই মূলত সবচাইতে বেশী ভালো লেগেছে। খুব অদ্ভুত ধরণের গল্প। প্রচলিত ধারার হরর না আবার অপ্রচলিতও নয়।

এছাড়া, আঁস্তাকুড়, মৎস্য রজনী, মার্নি এবং বিড়ালছানা এই গল্পগুলোও মোটামুটি ধরণের ভালোই লেগেছে। আর বাকিগুলো যে খারাপ লেগেছে তা নয়; তবে কিছু গল্প আমার নিজের কাছেও গাঁজাখুরি বা কেবল লেখার জন্য গল্প লেখা ধরণের মনে হয়েছে। তবে অবশ্যই পড়ে দেখবেন কেননা দেখা গেল আপনার ভালো লাগতেও পারে। 

বই: গোরস্থানের পিশাচ
রূপান্তর: তানভীর মৌসুম
প্রকাশক: সেবা প্রকাশনী
প্রচ্ছদ: রনবীর আহমেদ বিপ্লব
পৃষ্ঠা: ২৬৪
মুদ্রিত মূল্য: ১০২/- টাকা মাত্র

Share this
Facebook
Twitter
LinkedIn

Related Posts

রিভিউ

পনম্যান: সামাজিক রীতিনীতির যাঁতাকলে পিষ্ট এক থ্রিলার গল্প

গল্পের ভাঁজে একেকটা কর্মকান্ডে উঠে এসেছে কখনো সমাজব্যবস্থার নড়বড়ে কাঠামো, কখনো সমাজের নৈতিকতার যাতাকলে পিষ্ট মানুষদের অসহায়ত্ব, কখনো ব্যক্তিত্বের নৈতিকতার সীমাবদ্ধতা, অথবা কখনো অর্থনৈতিক অসাম্যের মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে যে বিষ ছড়ায় তার বাস্তব দৃশ্যময়তা।

দ্য ফ্রগ: হয়েও হলো না একটি পারফেক্ট ক্রাইম থ্রিলার

নেটফ্লিক্সের নতুন কোরিয়ান থ্রিলার সিরিজ দ্য ফ্রগের প্রত্যেকটা এপিসোডের শুরুতে এই ডায়ালগটা শুনতে পাবেন। কোরিয়ান ভাষায় সিরিজটার নাম অনেকটা এমন – In the forest where no one’s around. কিন্তু তাহলে নামটা ফ্রগ হলো কেন?