ভারতের বিতর্কিত ধর্মগুরুদের মধ্যে গুরমিত রাম রহিম সিং ইনসান অন্যতম। হরিয়ানা আর পাঞ্জাব প্রদেশ মিলিয়ে প্রায় ৫ লক্ষ ভক্ত আছে রাম রহিমের। একইসঙ্গে এই ভক্তদের এও বিশ্বাস যে, পুরো পৃথিবী জুড়ে তাদের গুরুর প্রায় ছয় কোটি ভক্ত আছে। ডেরা সাচ্চা সৌদা নামক একটি সম্প্রদায়ের নেতা তিনি। এই ডেরা সাচ্চা সৌদার প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ১৯৪৮ সালে। প্রতিষ্ঠা করেছিলেন শা মস্তানা নামের এক ধর্মগুরু। গুরমিত সিং ১৯৯০ সালে এই সম্প্রদায়ের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন। তিনি যে কেবলই একজন ধর্মগুরু তা কিন্তু নয়। ধর্মপ্রচারক, সমাজ সংস্কারক, গায়ক, নায়ক এবং এমনকি পরিচালক ও প্রযোজকও বটে।
হরিয়ানার সিরসায় তার প্রকাণ্ড হাই-টেক আশ্রম রয়েছে। এই আশ্রমে যেমন সারাদিন ধর্মকর্ম চলে ঠিক তেমনি এই আশ্রম প্রাঙ্গনেই নিয়মিত বসে পপ কনসার্টের আসর। যেখানে ধর্মগুরু রাম রহিম নিজেই গান করেন। এমনকি চাকচিক্যময় পোশাক পড়ে গানের সঙ্গে নাচার জন্যে তাকে অনেকেই “রকস্টার বাবা” বলে অভিহিত করে থাকে।

তিনটি সিনেমা নির্মাণ করেছেন তিনি। যার মধ্যে তিনটিতেই নায়ক চরিত্রে অভিনয় করেছেন গুরমিত সিং। ১৯৯৮ সালে ডেরার এক জীপের নীচে পড়ে মারা যায় বেগু গ্রামের এক শিশু। ব্যাপারটা জোর করে ধামাচাপা দেয়া হয়। এরপর পরই আশ্রমের এক নারী সেবিকা গুরমিত সিং এর নামে যৌন নির্যাতনে অভিযোগ তুলে প্রধানমন্ত্রী বরাবর এক বেনামী চিঠি লিখেন।
এই চিঠির জন্য হাইকোর্ট সিবিআইকে তদন্ত করার নির্দেশ দেয়। এই তদন্তের নিয়মিত রিপোর্ট দেয়া এক সাংবাদিক খুন হলে ব্যাপারটা হটকেক এ পরিণত হয়। এসবের মধ্যে গুরমিত সিং এর ভক্তদের সঙ্গে শিখ সম্প্রদায়ের তুমুল বিরোধ শুরু হয়। সমগ্র ভারত জুড়ে শিখ সমর্থক আর ডেরার ভক্তদের মধ্যে তুমুল সংঘর্ষ হয়। শিখ সম্প্রদায়ের বিক্ষোভ চলাকালীন ডেরার সমর্থকদের গুলিতে এক শিখ নিহত হয়। এতদ্বসত্ত্বেও, আদালতে রাম রহিমকে দোষী সাব্যস্ত করা বিচারককে হত্যার হুমকি দিয়ে চিঠি পাঠানো হয়। তদন্ত কাজে ব্যঘাত ঘটাতে নিজের প্রাক্তন ম্যানেজারকে খুন করে লাশ গুম করে ফেলে রাম রহিম সিং। ডেরার ৪০০ জন সাধুকে নপুংসক করে দেয়ার অভিযোগও উঠে রাম রহিমের বিরুদ্ধে। এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে রাম রহিম সিং হরিয়ানার এক হাজতে বিশ বছরের সাজা কাটছেন।

গুরমিত রাম রহিম সিংকে নিয়ে এত আলোচনার মূল কারণটা কি? কারণটা হচ্ছে সম্প্রতি এমএক্স প্লেয়ার অরিজিনাল একটা সিরিজ নির্মাণ করেছে তাদের প্ল্যাটফর্মের জন্য। যেটার নাম হচ্ছে আশ্রম। আশ্রম সিরিজের পুরো গল্পটাই সাজানো হয়েছে এই ধর্মগুরুর জীবনীকে কেন্দ্র করে। রাম রহিমকে কেন্দ্র করে গল্পটা গড়ে উঠলেও মূলত ধর্মের নামে ব্যবসা আর অন্ধবিশ্বাসে নিজের সর্বস্ব উজাড় – এই ব্যাপারগুলোতেই বেশী প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। আরো মজার বিষয় হচ্ছে, সিরিজটির নির্মাতা হিসেবে ছিলেন ভারতের প্রখ্যাত পরিচালক প্রকাশ ঝা। যার হাত ধরে গঙ্গাজল, অপহরণ এবং রাজনীতির মতো জনপ্রিয় সিনেমা নির্মিত হয়েছে।
গল্পটা কাশীপুর নামক এক কাল্পনিক শহরের। এই শহরে এখনও জাত, বর্ণ আর গোত্রের মধ্যে প্রচুর বৈষম্য আছে। উঁচু জাতের লোকেরা নিচু জাতের লোকেদের ঘৃণা করে। নিচু জাতের লোকেরা যেন কোনোভাবেই উঁচু জাতের সঙ্গে টক্কর দিতে না পারে সেই ব্যবস্থাও করা হয় সর্বদা। যেমন – নিচু জাতের পাম্মি কুস্তীতে ভালো খেলে জেতার পরও হারিয়ে দেয় উঁচু জাতের বিচারকরা। আবার নিচু জাতের বরযাত্রী উঁচু জাতের মহল্লার মধ্য দিয়ে উৎসব করে যেতে নিলে মেরে মাথা ফাটিয়ে দেয় তারা। এমনকি হাসপাতাল কবজা করে রাখে উঁচু জাতের মহল্লার লোকজন।
ঠিক এমনই সময় নিচু জাতের মানুষের কাছে দেবদূতের মতো আবির্ভাব ঘটে কাশীপুর ওয়ালা বাবা নিরালার। নিরালা বাবার সশস্ত্র বাহিনীর সামনে উঁচু জাতের লোকেরা মাথা নত করতে বাধ্য হয়। বাবার কারণে সমাজে সম্মান পায় নিচু জাতের লোকেরা। বাবার ভক্ত না হয়ে উপায় কি? এরই সুবাদে কলেজ ফাঁকি দিয়ে বাবার আশ্রমে গিয়ে নিজেকে সুদ্ধ করতে থাকে পাম্মি। খবর পেয়ে একদিন ওর ভাই সাত্তি যায় ওর পেছন পেছন। বাবা-মা এই খবর জানতে পেরে ঘরে নিয়ে আটকে রাখে পাম্মিকে। এক ভোরে ঘর ছেড়ে পালিয়ে যায় পাম্মি। আশ্রমে গিয়ে উঠে।

মিশরা গ্লোবাল নামে এক ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি ভবন বানাতে গিয়ে জঙ্গলের মাটি খুঁড়লে বেরিয়ে আসে এক কঙ্কাল। স্থানীয় পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলে উর্ধ্বতন মহল থেকে ব্যাপারটা যাতে না ছড়ায় সেদিকে বেশী জোর দিতে বলা হয়। এমনকি এই ঘটনা মিডিয়াতেও যেন কোনোভাবেই না ছড়ায়; সেজন্য ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশও মোতায়ন করা হয়। নিরালা বাবার লোকজন উপরের মহলের সঙ্গে যোগাযোগ করে যেন কোনোভাবেই এই লাশের কোনো হদিস না পাওয়া যায়।
স্থানীয় থানার সাব ইন্সপেক্টর উজাগার সিং এর উপর দায়িত্ব আসে এই তদন্তের। তদন্তের স্বার্থে পরিচয় হয় ফরেনসিকের ডা. নাতাশার সঙ্গে। উজাগারা সিংকে উপর মহল থেকে বলা হয় ফরেনসিকের রিপোর্টটা যেন তাদের সুবিধামতোই বানান হয়। অথচ এদিকে ডা. নাতাশা তা করতে নারাজ এবং অস্বীকার করে। উপরন্তু, উজাগারকে লজ্জা দেয় সঠিকভাবে তদন্ত না করার জন্যে। উজাগার নামে ঠিকই তদন্তে কিন্তু একের পর এক বাঁধা আসতে থাকে। উজাগার সিংয়ের জেদ চেপে বসে। নিরালা বাবা কেন এই লাশটাকে গুম করে দিতে চায় তাকে তা জানতেই হবে।
গল্প তো জানাই। তবে চিত্রনাট্য ভালোভাবে গুছানো আর সাজানো। দেখতে খারাপ লাগেনি। আবার এতটাও ভালো লাগেনি। বলতে গেলে এভারেজ আর কি। যদিও প্রথম এপিসোডটা দেখে সন্দেহ হচ্ছিল আসলেই কি এটা প্রকাশ ঝা’র নির্মাণ? প্রথম এপিসোডটা তুলনামূলক দুর্বল লেগেছে। অন্তত প্রকাশ ঝা’র এর মতো পরিচালক হিসেবে। তবে পরে ব্যাপারটা আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে গেছে। খারাপ লাগেনি অন্তত। বিশাল সেট দেখে নিমেষেই টের পাওয়া যায় প্রকাশ ঝা’র উপস্থিতি। প্রোডাকশন ডিজাইন বেশ ভালো ছিল।

নির্মাণের কথা বলতে গেলে চলে আসে প্রকাশ ঝা’র কথা। মূলত প্রকাশ ঝা নামটা দেখেই আমার মতো অনেকেই এই সিরিজ দেখতে আগ্রহী হবে। যদিও এই সিরিজ দেখার আরেকটা কারণ হচ্ছে ববি দেওল। যাক, আগের কথা আগেই বলি। ঐ যে বললাম শুরুর দিকে, মূলত প্রথম পর্বটাই প্রকাশ ঝা হিসেবে নির্মাণ অত্যন্ত দুর্বল লেগেছে। পরবর্তীতে এই ব্যাপারটার ছিটেফোঁটাও ছিল না অবশ্য। আর প্রকাশ ঝা মানেই রাজনীতির চাল নিয়ে বিশ্লেষণ। এই সিরিজেও ব্যাপারটা ভালোভাবেই ফুটিয়ে তুলেছেন।
অভিনয় নিয়ে কিছু না বললেই নয়। বাবা নিরালা চরিত্রে ছিলেন ববি দেওল। নেটফ্লিক্সের মুভি ক্লাস অফ ৮৩ দেখে হতাশ হয়েছিলাম এই কারণে যে এত দুর্বল গল্প। তবে ববির অভিনয় দেখে মুগ্ধ হয়েছি। শেষ বয়সে এসে ববি দুর্দান্ত অভিনয় করছে। বাবা নিরালার চরিত্রে এত দারুণভাবে নিজেকে মানিয়ে নেবে ভাবতে পারিনি। ববিকে দারুণ লেগেছে।

সিরিজে নিরালা বাবার পরই যে চরিত্রটা সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ছিল সেটা হচ্ছে বাবার ডানহাত ভোপা স্বামীর চরিত্রটি। এই চরিত্রে ছিলেন চন্দন রয় স্যানাল। এটা বলতেই হয় যে, ভোপা না থাকলে বাবার প্রভাব একদমই শূন্য। একদিকে আশ্রম যেমন চালায় সাধুর রূপ নিয়ে অন্যদিকে তেমনি গোপনে ঠাণ্ডা মাথায় সব ধরণের কার্যকলাপও দেখাশুনা করে সে। এই চরিত্রের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ব্যাপারগুলোও খুব ভালোভাবেই ফুটিয়ে তুলেছেন চন্দন রয়।
উজাগার সিংয়ের চরিত্রে ছিলেন দর্শন কুমার। বেশ ভালোই অভিনয় করেছেন। তবে যার অভিনয়ে খামতি লক্ষ্য করেছি সেটা হচ্ছে পাম্মি চরিত্রে থাকা অদিতি সুধীর। কেন যেন মনে হয় আরো ভালো অভিনয় দরকার ছিল এই চরিত্রটার জন্য। এছাড়া, বাদবাকিদের অভিনয় নিয়ে তেমন কিছু বলার নেই। মোটামুটি ভালোই করেছে সবাই। শেষমেশ এটাই ভাষ্য যে, সিরিজটা বেশ ভালো হয়েছে। আর যে কেউই সিরিজটা দেখে উপভোগ করবে। আইএমডিবিতে এখন অবধি ৮/১০ রেটিংয়ে আছে সিরিজটি।

মোদ্ধা কথা, এমএক্স প্লেয়ারের অরিজিনাল সিরিজ “রক্তাঞ্চল” দেখে যতটা আশাহত হয়েছিলাম; আশ্রম দেখে তেমনটা মোটেও মনে হয়নি। বরং দারুণ একটা সিরিজ উপভোগ করলাম। খুব শীঘ্রই এটার দ্বিতীয় সিজনও চলে আসবে। সেটারই অপেক্ষায় আর কি। আর হ্যাঁ, টরেন্ট থেকে শুরু করে কোথায়ও যদি না পান তাহলে আপনার এন্ড্রয়েড ফোনে এমএক্স প্লেয়ার অ্যাপ্সটা নামিয়ে নিন। ফ্রিতেই দেখতে পারবেন তাও আবার বাংলা ডাবিংয়ে।
Feature Image: imdb.com
