Crafting Ideas Into Impactful Content

অ্যাওয়ে: পরাবাস্তব গল্পে নিরীক্ষাধর্মী এক অ্যানিমেশন সিনেমা

একটা ছেলে চোখ খুলেই নিজেকে আবিষ্কার করে গাছের ডালে ঝুলন্ত অবস্থায়। প্যারাশুটের কারণে তার এমন পরিণতি। তবে কিভাবে সে এখানে এসে এই গাছে ঝুলছে সেই সম্পর্কে তার কোন ধারণা নেই। ছেলেটা উত্তরের আশায় আশেপাশে চোখ বুলায়। বিশালাকারের নিরাকার দানবের মতো কিছু একটা ভীতি তৈরি করে তার দিকে এগিয়ে আসছে।

Image Source: imdb.com

সহজাত প্রবৃত্তি বলে ব্যাপারটা তার জন্যে মোটেও ভালো কিছু নয়। প্যারাশুটের স্ট্র্যাপ থেকে তাড়াহুড়ো করে নিজেকে মুক্ত করে একটা অর্ধবৃত্তাকার রিংয়ের মধ্য দিয়ে একটা জায়গায় এসে ঢুকে পড়ে ছেলেটা। দানবটা সেই অর্ধবৃত্তাকার রিংটার কাছে এসে আটকে যায়। ভেতরে আর ঢুকতে পারে না।

সবুজে ঘেরা সেই জায়গা পুরোটা ঘুরে দেখে ছেলেটা। গাছ থেকে ফল আর নদী থেকে জল খেয়ে ক্ষুধা নিবারণ করে। একটা পাখির ছানা এসে বসে তার পাশে। খেতে দেয় ছেলেটা। এই বিরান অঞ্চলে একটা সঙ্গী জুটে যায় ছেলেটার অথবা পাখিটার। ছেলেটা আবারও সবুজে ঘেরা জায়গাটায় বিচরণ করতে শুরু করে। একটা মোটরসাইকেল পায় ছেলেটা। আরও খুঁজতে গিয়ে একটা ব্যাকপ্যাক পায়। ব্যাকপ্যাকের মধ্যে বাইকের চাবি, একটা পানির বোতল, একটা কম্পাস, একটা কাপড় এবং একটা ম্যাপ।

Image Source: imdb.com

ম্যাপটাতে দেখা যায় নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর সেই অর্ধবৃত্তাকারের রিং পেড়োলেই দ্বীপের সমাপ্তি। এরিমধ্যে ছেলেটা চিন্তায় পড়ে যায়। চিন্তায় চিন্তায় ঘুরতে থাকে দ্বীপটাতে। আর তখনই চিন্তারত একটা কঙ্কাল আবিষ্কার করে ছেলেটা। তখনই ছেলেটা বুঝতে পারে বাঁচতে হলে এই দ্বীপ থেকেই বের হতেই হবে তাকে। সেই বিশালাকার নিরাকার দানবটার মুখোমুখি হতেই হবে। নয়তো নিজেও কোনোদিন একইরকম কঙ্কাল হয়ে যাবে।

ছেলেটা প্রথমেই সময় নিয়ে বাইক চালানো শেখে। ব্যাকপ্যাকের মধ্যে অনেকগুলো ফল আর বোতলে পানি ভরে সঙ্গে পাখিটাকে নিয়ে রওয়ানা দেয় ছেলেটা। কিন্তু সেই দানবটা ছেলেটার পিছু ছাড়ে না কোনো ভাবেই। সেই একই ধীর গতিতে দানবটা ক্ষণে ক্ষণে এগিয়ে আসছে ছেলেটার দিকে। একটা কাঠের ব্রীজ পার হয়ে যাবার পর ছেলেটা সর্বোচ্চ পাহাড়ে চড়ে দেখতে পায় সেই দানবটা এখনো পিছু পিছু আসছে। ছেলেটা চায় পাথর ফেলে ব্রীজটা ভেঙ্গে দিতে কিন্তু অন্যদিকে একটা শেয়াল সেই ছোট্ট পাখিটার লোভে তার ব্যাকপ্যাকের দিকে এগিয়ে আসছে। ছেলেটা কি করবে? নিজে বাঁচবে নাকি পাখিটাকে বাঁচাবে?

Image Source: imdb.com

এমনই অদ্ভুত এক পরাবাস্তব গল্প নিয়েই অ্যাওয়ে অ্যানিমেশন ফিল্মটা তৈরি হয়েছে। ৭৫ মিনিটের এই অ্যানিমেশনটা একদমই নির্বাক একটা চলচ্চিত্র। আর এক চরিত্র কেন্দ্রিক সিনেমা। আর সিনেমাটা একটু ভিন্ন ধাঁচের অ্যানিমেশন ফ্লেভারে তৈরি। হ্যাঁ, এটা একটা নিরীক্ষামূলক বা এক্সপেরিমেন্টাল ওয়ার্ক। অন্তত দেখেই বলে দেয়া যায়। কিন্তু এক্সপেরিমেন্টাল ওয়ার্ক হওয়া সত্ত্বেও কাজটা দারুণ ছিল। উপভোগ্য তো বটেই পাশাপাশি ভাবনার খোরাক যোগানের মতোই।

গল্পে আবহ তৈরির জন্য এই অ্যানিমেশনে মিউজিকের আশ্রয় নেয়া হয়েছে। ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরিং বেশ ভালো ছিল। এমনকি ফলি সাউন্ডগুলোও দুর্দান্ত ছিল- যেমন শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়ার শব্দ, এমনকি সেগুলোর ভারী আর কোমলতাকে বজায় রাখা ইত্যাদি। সিনেমাতে কোন সংলাপ না থাকলেও ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরিংয়ের কারণে ক্লাইমেক্স ভালো ছিল। সিনেমাটোগ্রাফি দারুণ লেগেছে। মূলত সিনেমাটোগ্রাফির জন্যই মুভিটার পরাবাস্তব দিকটা খুব বেশি ফুটে উঠেছে।

Image Source: imdb.com

অ্যানিমেশন নিয়ে অনেকেরই সমস্যা হবার কথা। কারণ এটা ঠিক থ্রিডি অ্যানিমেশন না আবার টুডিও না। আবার অনেকটা জাপানিজ অ্যানিমেশনের ছোঁয়া টের পাওয়া যায়। আবার স্টপ মোশনের ব্লেন্ডও লক্ষ্য করা যায়। আর সেইজন্যই সিনেমার শুরুতেই মনে হয়েছে এটি এক্সপেরিমেন্টাল ওয়ার্কস। তবে এই এক্সপেরিমেন্টের মধ্যে খেয়াল করলে দেখতে পাবেন যে, অ্যানিমেশনে কালারের তারতম্য বেশ ভালো ভাবেই লক্ষ্যণীয়। আর ব্যাপারটা যে প্রতীকী অর্থে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

২০২০ সালের অ্যান্নি অ্যাওয়ার্ডে অ্যানিমেশন ফিচারের আউটস্ট্যান্ডিং ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরিংয়ের জন্য নমিনেশন, লাটভিয়ান ন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল এবং স্ট্রার্সবার্গ ইউরোপিয়ান ফ্যান্টাস্টিক ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে বেস্ট অ্যানিমেশন অ্যাওয়ার্ড এবং ভিলনিয়াস আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে সেরা ফিল্মের অ্যাওয়ার্ড।

Image Source: imdb.com

আর হ্যাঁ, রটেন টমেটোসে ১০০%, কমন সেন্স মিডিয়াতে ৫/৫ এবং আইএমডিবিতে ৬.৭/১০ রেটিং পেয়েছে। এবং গুগলের সার্চ ইঞ্জিনে প্রতি ১০০ জনে ৮০ জন মানুষই সিনেমাটিকে পছন্দ করেছে। লাটভিয়ার এই ফ্যান্টাসী অ্যানিমেশন ফিল্মটির নির্মাতা গিন্ট জিলব্লোডিস। আশা করি, ভবিষ্যতে এই পরিচালকের কাছ থেকে দারুণ কিছু অ্যানিমেশন সিনেমা উপহার পাব। নীচে আরও কিছু ফটো দিলাম।

Share this
Facebook
Twitter
LinkedIn

Related Posts

রিভিউ

পনম্যান: সামাজিক রীতিনীতির যাঁতাকলে পিষ্ট এক থ্রিলার গল্প

গল্পের ভাঁজে একেকটা কর্মকান্ডে উঠে এসেছে কখনো সমাজব্যবস্থার নড়বড়ে কাঠামো, কখনো সমাজের নৈতিকতার যাতাকলে পিষ্ট মানুষদের অসহায়ত্ব, কখনো ব্যক্তিত্বের নৈতিকতার সীমাবদ্ধতা, অথবা কখনো অর্থনৈতিক অসাম্যের মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে যে বিষ ছড়ায় তার বাস্তব দৃশ্যময়তা।

দ্য ফ্রগ: হয়েও হলো না একটি পারফেক্ট ক্রাইম থ্রিলার

নেটফ্লিক্সের নতুন কোরিয়ান থ্রিলার সিরিজ দ্য ফ্রগের প্রত্যেকটা এপিসোডের শুরুতে এই ডায়ালগটা শুনতে পাবেন। কোরিয়ান ভাষায় সিরিজটার নাম অনেকটা এমন – In the forest where no one’s around. কিন্তু তাহলে নামটা ফ্রগ হলো কেন?